বার্তাবাংলা ডেস্ক »

প্রায় সাত বছর আগের কথা। ২০১০ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজারের উখিয়াতে একটি রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্যাম্প পরিদর্শনের সুযোগ ঘটেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের প্রফেশনাল মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের নিয়ে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনফপিএ)এর সহযোগিতায় এক শিক্ষা সফরে কক্সবাজারের চকরিয়ায় আইসিডিডিআরবি এবং সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা-সংক্রান্ত মাঠ-পর্যায়ের কার্যক্রম দেখতে গিয়েছিলাম। সে কার্যক্রমের পাশাপাশি, একদিন উখিয়ায় আমাদের দলটির ওই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাওয়া হয়। সেখানে মূলত শরণার্থী হিসেবে রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, প্রজননস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য বিষয়াদি সম্পর্কে জানা ছিল লক্ষ্য।

জনসংখ্যা পাঠে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ ডেমোগ্রাফিক প্রক্রিয়া হলেও, মাইগ্রেন্ট ও রিফিউজি যে এক জিনিস নয় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের মাধ্যমে আমাদের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা সেদিন মাঠ-পর্যায়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। সেই সঙ্গে তারা দেখতে পেয়েছিল শরণার্থী ক্যাম্পবাসীদের জীবনধারা, তাদের সমস্যা ও ক্যাম্পজীবনের বাস্তব চিত্র। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ওই সফরে না গেলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনপ্রবাহ আমার পক্ষেও স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হত না।

পরে, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ও ২০১৬এর মার্চে অবশ্য আমি আরও দুবার কক্সবাজার যাই বিভাগীয় গবেষণাকাজে। তখন আবারও জানতে পারি রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে, যদিও আমার গবেষণার বিষয় তাদের নিয়ে ছিল না– ছিল বাংলাদেশে শিশু-বিবাহের প্রেক্ষাপট ও তার প্রভাব নিয়ে। আমার বিভাগের ওই গবেষণা দলের সদস্য হিসেবেই কক্সবাজার সদর ঊপজেলা ও টেকনাফে গিয়েছিলাম। গ্রাম ও শহর দুধরনের এলাকাতে ছিল আমার বিচরণ।

মনে আছে একদিন এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের একান্ত সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম শিশু-বিবাহ ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে। হঠাৎ তার অফিসে এসে হাজির হন এক বৃদ্ধা রোহিঙ্গা। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে অনবরত কাঁদছিলেন। কয়েকদিন আগেই নাকি তিনি মিয়ানমার বাহিনীর আক্রমণে হারিয়েছেন স্বামীসহ দুসন্তান। জীবন বাঁচানোর তাগিদে ভাগ্যপরিক্রমায় তিনি এখন বাংলাদেশে। আশ্রয় ও সহযোগিতা খুঁজছেন। অর্থ নেই তার হাতে।

তার চেহারার দিকে তাকালাম। বিষাদ, ক্লান্তি আর কষ্টের ছাপ সে মুখে। চেয়ারম্যানকে দেখলাম তড়িঘড়ি পাঞ্জাবির পকেট থেকে ২০ কী ৩০ টাকার মতো কিছু অর্থ দিয়ে তাকে দ্রুত বিদায় করে দিলেন। চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎকার তখন ছিল প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাই রোহিঙ্গা নারীটিকে একটু অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেছিলাম।

আমার কথা তিনি বুঝতে পরেছিলেন কি না জানি না। তবে তিনি চলে গেলে উপস্থিত স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি, রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ এভাবে এসে সাহায্য চান। এটি বুঝতে কারও অসুবিধা হবার কথা নয় যে, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের রয়েছে সরব উপস্থিতি। ইদানিং ওরা বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও কাজ নিচ্ছে। তাদের সস্তা শ্রমের জন্য স্থানীয় এলাকায় রয়েছে তাদের বেশ চাহিদা। একদিকে মানবিকতা আরেকদিকে সস্তাশ্রমের চাহিদা– এ দুয়ে মিলে রোহিঙ্গারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সে সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সঙ্গেও।

লেখার শুরুতেই ২০১০ সালে কক্সবাজারে রিফিউজি ক্যাম্প পরিদর্শনের কথা বলছিলাম। একদিনের ওই পরিদর্শনে আমার মনে হয়েছে, সে সময় বাংলাদেশ সরকার ও স্থানীয় জনগণ রোহিঙ্গাদের প্রতি ছিল বেশ মানবিক ও আন্তরিক। সম্পদের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তখন ক্যাম্পে দেখতে পেয়েছি সরকারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাসমূহের সহযোগিতায় বিভিন্ন ধরনের সেবা-কার্যক্রম। বিশেষ করে বেসরকারি অলাভজনক সংস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের বিষয়টি নজরে পড়েছে। লক্ষ্য করেছি, রোহিঙ্গাদের জন্য ছিল কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও।

মঈনুল ইসলাম

অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »

%d bloggers like this: