অপহরণ নাটকে বেকায়দায় পুলিশ

বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: সারাদেশে যখন অপহরণ আতঙ্ক তখন চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে সাজানো অপহরণ! কেউ স্বামী বা অভিভাবককে শায়েস্তা করার জন্য কেউ বাবার কাছ থেকে হাতখরচ বা বিদেশ যাওয়ার টাকা খসানোর জন্যও অপহরণ নাটক করছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা নিয়ে প্রশাসনও বেশ বেকায়দায় পড়েছে। কোনটা আসল আর কোনটা সাজানো  বুঝা মুশকিল।

এমনি একটি নাটক করে ধরা খেয়েছেন হালিশহেরর বাসিন্দা গৃহবধূ আয়েশা আক্তার (৩০)। একটি সিমেন্ট কারখানার কর্মকর্তা স্বামী আবু নাসের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই তার মান অভিমান চলছিল। গতকাল শনিবারও সাংসারিক বিষয়ে তাদের ঝামেলা হয়। এরপর নাসের অফিসে গেলে দুপুরে ওষুধ আনার নাম করে মেয়ে তাশরিফাকে সঙ্গে নিয়ে আত্মগোপন করেন তিনি। বিকেলের স্বামী বাসায় এসে তাদের না পেয়ে স্ত্রীর নম্বরে ফোন দেন। তখন অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে অচেনা এক পুরুষের কণ্ঠ। অপর প্রান্তের মানুষটি নিজেকে অপহরণকারী পরিচয় দিয়ে নাসেরের কাছে স্ত্রী ও মেয়ের বিনিময়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

বিষয়টি নিকটস্থ হালিশহর থানা পুলিশকে জানান নাসের। অভিযোগটি মামলা হিসেবে নিয়ে উদ্ধার অভিযানে নামে পুলিশ। অবশেষে মোবাইল ট্র্যাকিং করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, ‘অপহৃত’ নারী হালিশহর এইচ ব্লকেই অবস্থান করছেন। এরপর রাত আড়াইটার দিকে হালিশহরের একটি খালের পাড় থেকে মা-মেয়ে দু’জনকেই স্বাভাবিক অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহজাহান কবির  বলেন, ‘আয়েশা স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। কোনো নিকটাত্মীয় দিয়ে তিনি অপহরণ নাটক সাজিয়েছেন। ব্যস্ততার কারণে স্বামী তাকে ও তার মেয়েকে ঠিকমত সময় না দেয়ায় মানসিক অশান্তিতে ছিলেন আয়েশা। আর এ কারণেই অপহরণ নাটকের আশ্রয় নেন বলে স্বীকার করেছেন।’

এর আগে শুক্রবার নগরীর বায়েজিদ থানার অক্সিজেন এলাকার রাব্বি (১৭) ও হাসান (১৮) নামে দুই কিশোর চাকরির নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে দিনভর বাসায় না ফেরায় সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজ নেয় তাদের পরিবার। কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে শনিবার সকালে পৃথক দু’টি ‘অপহরণ’ জিডি করা হয়। সেখানে কক্সবাজার থেকে অপহরণকারী একটি নম্বর থেকে ফোন করে বিকাশের মাধ্যমে ৩৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়।

বিষয়টি নিয়ে নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরে প্রযুক্তি সহায়তায় ও কক্সবাজারে পুলিশের একটি টিম গিয়ে জানতে পারেন- পরিবারের দাবিকৃত অপহৃত দু’কিশোর শুক্রবার টেকনাফ হয়ে দালালের মাধ্যমে মালেয়শিয়া পাড়ি জমিয়েছে। আর পরিবারের মোবাইলে ৩৫ হাজার টাকা দাবি করে যে টাকা চাওয়া হলেছিল তা হচ্ছে, মালেয়শিয়া যাওয়ার সময় দালালের বাকি টাকা।

এরও আগে এনজিও ‘উদ্দীপন’ এর প্রায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার পর অপহরণের নাটক সাজান সংস্থাটির চন্দনাইশ শাখা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাগর খান (৩৫)। তিনি পটিয়ার শান্তিরহাট শাখার ব্যবস্থাপক থাকাকালীন ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ঘটনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে চন্দনাইশ শাখায় বদলি করা হয়। সেখান থেকে তিনি হঠাৎ করে গত ২৭ এপ্রিল আত্মগোপন করেন। পরে কয়েকটি অপরিচিত নম্বর থেকে উদ্দীপন কর্মকর্তাদের কাছে ফোন করে জানানো হয়, সাগর খানকে অপহরণ করা হয়েছে।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এ ব্যাপারে উদ্দীপনের পক্ষ থেকে চন্দনাইশ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হলে সেখান থেকে দেশের সব থানায় বেতার বার্তা প্রেরণ করা হয় এবং জোরালো পুলিশি অভিযান শুরু হয়। এ খবর সাগরের কানে গেল তিনি নিজেই ফোন করে জানান, অপহরণকারীরা তার টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে তাকে সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে ছেড়ে দিয়েছে। খবর পেয়ে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ গত ৩০ এপ্রিল রাতে ইকোপার্কে গিয়ে দেখতে পায় অক্ষত সাগর আর তার ভাই মেহেদী হাসান সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। পুলিশ সেখান থেকে সাগরকে আটক করে চন্দনাইশ থানায় পাঠিয়ে দেয়। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সাগর স্বীকার করেছেন টাকা আত্মসাতের জন্য তিনি এই অপহরণ নাটক সাজিয়েছিলেন।

এদিকে প্রকৃত অপহরণ ও খুনের ঘটনায় রীতিমত চাপে আছে পুলিশ প্রশাসন। ইতিমধ্যে অপহরণ ঠেকাতে সিএমপি নতুন করে পাঁচটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব থানা ও কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে অভিযান সম্পর্কে পুলিশকে সতর্ক করেছেন কমিশনার। ফলে দেশের এরকম পরিস্থিতিতে এই ধরনের ‘অপহরণ’ নাটক নিয়ে বেশ বেকাদায় পড়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
এ ব্যাপারে হালিশহর থানার ওসি শাহজাহান  কবির বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে অন্য কাজ ফেলে শুধু মা-মেয়েকে উদ্ধারে আমরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছি। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে হালিশহর থেকে তাদের উদ্ধারের পর জানতে পারি স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি এই অপহরণ নাটক সাজিয়েছেন। তখন কেমন লাগে বলুন?’

দেশের সাম্প্রতিক সর্বাধিক উদ্বেগের এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে বলে মনে করেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ। তিনি  বলেন, ‘এমনিতেই বিষয়টি নিয়ে বেশ চাপে আছি। এরমধ্যে কেউ কেউ হারানোকেও অপহরণ বলে মামলা করার জন্য থানায় ছুটে আসছে। এরফলে এসবের পেছনে ছুটতে গিয়ে প্রকৃত ঘটনার পেছনে সময় দেয়া যাচ্ছে না। এসব অপহরণ নাটক করা মানে পুলিশের সময় নষ্ট ও হয়রানি করা ছাড়া কিছুই না।’

এ প্রসঙ্গে সিএমপির মুখপাত্র ও এডিসি-ডিবি বাবুল আক্তার  বলেন, ‘অপহরণের বিষয়টি এখন খুবই স্পর্শকাতর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু কিছু মানুষ ব্যক্তিগত ঘটনাকে অপহরণ বলে চালিয়ে দিয়ে মাঝে মাঝে পুলিশকে অহেতুক ব্যস্ত করে রাখছে।’