বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Pumpkin Cultivation in Bangladeshইসলাম ফজলু, রংপুর থেকে ফিরে :: একটানা রোদ আর পানির অভাবে তিস্তা এখন শুধুই মরুময় বালিভুমি। তিস্তাকে কেন্দ্র করে সবুজ ধান আবাদের স্বপ্নের মাঝে এখন স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় দুলছে এখানকার মাধারণ মানুষ। সে আশাহতের মাঝেও এক চিলতে আশার আলো জ্বেলেছেন কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের কর্পুরা গ্রামের বাসিন্দারা। সমস্ত প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ওই গ্রামের বালুচর এখন কাঁচা-পাকা কুমড়া চাষে ছেয়ে গেছে। আর এতে কৃষকদের মন আনন্দে নেচে উঠেছে। কুমড়া বিক্রি করে লাভের টাকায় খুঁজে নিচ্ছেন অন্য জীবিকা। ফলে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এ এলাকার অনেক কৃষক।

সম্প্রতি জেলার উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের কর্পুরা গ্রামের তিস্তার বালুচর ঘুরে এমন দৃশ্যই চোখে পড়েছে। রংপুর শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার অদূরে গ্রামটির তিস্তার বালুচরে ১৭.২৫ একর জুড়ে এখন শুধু সারি সারি কুমড়া। এ শুষ্ক মৌসুমেও তিস্তার বালিভূমিতে পানি সেচের মাধ্যমে কুমড়া চাষাবাদ করেছেন কৃষকরা। ডিএফআইডির ইইপি-সিঁড়ি কর্মসূচি, বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন-বাংলাদেশ যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে। স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

পিএফপি-সিঁড়ি প্রকল্পের ম্যানেজার নির্মল চন্দ্র বেপারি এ কাজ বাস্তবায়নে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০০৫ সালে গাইবান্ধায় আমরা প্রথম এই কাজ শুরু করি। প্রথম দিকে তিস্তার বালুচরে কুমড়া চাষের উদ্যোগ নিতে গিয়ে দেখলাম, কৃষকদের মাঝে তেমন উৎসাহ নেই। কারণ, বালিতে আদৌ কুমড়া চাষ হবে-কিনা-তা নিয়ে তাদের সংশয় ছিল। তদুপরি তাদের ছিল না কোন প্রশিক্ষণ।

যোগ করেন, এ অবস্থায় আমরা ভুমি সনাক্তকরণ কর্মশালার মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ দিই। কালোপাথুরি ও বৌদ্ধবাটি নামে কৃষকদের মাঝে ভারত থেকে আসা এক ধরণের বীজ সরবরাহ করি। পরে তিস্তার বালিতে কতটুকু গর্ত করতে হবে, কি পরিমাণ গোবর দিতে হবে, কতক্ষণ পর পর পানি দিতে হবে সে সম্পর্কে ধারণা প্রদান করি। এতে অনেক কৃষক কুমড়া চাষে আগ্রহী হয়। ফলন ভালো হওয়ায় এখন অনেক কৃষক কৃষি কাজের পরিবর্তে কুমড়া চাষে এগিয়ে আসছে।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহিম (৭৫) জানান, আগে তিনি কৃষি কাজ করতেন। এ বছর তিস্তার পানির অভাবে ধানের ফলন ভালো না হওয়ায় এখন তিনি এই বালুচরে কুমড়া চাষ শুরু করেছেন। চলতি বছর কার্তিক মাসে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন এর সহায়তায় এই গ্রামের তিস্তার বালুচরে তিনি এক সারি কুমড়ার চাষ শুরু করেন। তার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এক সারিতে ৭০-৭৫ টি কুমড়া রয়েছে। এ সময় কুমড়ার মৌসুম হওয়ায় স্থানীয় বাজারে দাম তুলনামূলক কম। আকার ভেদে প্রতি কুমড়া বিক্রি হচ্ছে ৩০-১০০ টাকা পর্যন্ত। কুমড়া বিক্রি হলেও তিনি তা বিক্রি করছেন না। কারণ, ২/৩ মাস পর আরো দাম বাড়বে। এ আশায় তিনি ঘরের মাচায় কুমড়া সংগ্রহ করে রেখেছেন।

তিনি বলেন, আর এ কাজে সহযোগিতা করছে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। গোবর ও অন্যান্য সার প্রদান বাবদ তাদেরকে প্রতি মাাসে ১৮০০ টাকা ও মাচা তৈরি বাবদ ১৩০০ টাকা করে দিচ্ছে। পরে বিক্রি করে বেশি লাভ-এই আশায় এখন তিনি অধিকাংশ কুমড়া মাচায় রেখে দিয়েছেন। এখন তার স্বপ্ন-ভবিষ্যতের লাভের টাকায় রিক্সা কিনবেন। আর তাতে আয় বাড়বে। অভাব ঘুচবে সংসারের।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নে কর্পুরা গ্রামে তিস্তার বালুচরে সরেজমিনে দেখা গেছে, এই গ্রামের বালুচরে কাঁচা-পাকা সবুজ হলুদ রঙের সারি সারি কুমড়া গাছ।ছোট, বড়, মাঝারি আকৃতির কুমড়ায় ছেয়ে গেছে পুরো বালুচর। বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। মৌসুম শেষ দিকে হওয়ায় চাষীরা এখন কুমড়া কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। তপ্ত রোদেও কুমড়া দেখার জন্য উৎসুক মানুষের ভীড়। মৌ-মৌ গন্ধে শুধু উৎপাদক কৃষক নয়, সবার মন আনন্দে দোলা লেগেছে। তিস্তার বালুচরে সর্বত্রই কুমড়ার বাম্পার ফলনকে ঘিরে এখন উৎসবের আমেজ। এ যেন জীবিকা অর্জনের আর একটি বিকল্প মাধ্যম হয়ে উঠেছে তিস্তার বালুচরে কুমড়া চাষ।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন-বাংলাদেশ এর রংপুর অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারি, লালমনির হাট, গাইবান্ধা-এই পাঁচ জেলায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন কুমড়ার আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে ২ হাজার মেট্রিক টন বেশি।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বছরে ২২ হাজার কোটি টাকার অধিক ব্যয় হয়। যার অনেকগুলো প্রকল্প কাঙ্খিত দারিদ্র্য দূরীকরণে তেমন কোন সুফল বয়ে আনতে পারে না। অথচ এ জাতীয় উদ্যোগ একই সাথে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি করছে, পাশাপাশি অতিদরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছে। অর্থাৎ পরিকল্পিত কর্মসূচিই পারে সঠিকভাবে অতিদারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে পৌঁছতে।

প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন-বাংলাদেশ এর ঢাকা অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পে পরিবার প্রতি ১০০ কুমড়ার ফিট তৈরিতে ব্যয় হয় ৭ হাজার টাকা। ৭ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে পরিবারটির আয় হয় ৩০ হাজার টাকার অধিক।  যা পরিবারটি বিকল্প আয় বর্ধন কাজে বিনিয়োগ করে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনয়ন করে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভুমিহীন অতিদরিদ্র পরিবারগুলো পতিত চর ব্যবহার করে একই সাথে যেমন দেশের ভূমির স্বল্পতা পূরণে কাজ করছে এবং সার্বিকভাবে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। তাই সরকারের দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচিতে এ জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করলে সহ¯্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অতিদ্রুতই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »