ডিসিসিতে ‘রাজনৈতিক প্রশাসক’ নিয়ে আ.লীগে বিভক্তি

বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে শিগগিরই নিয়োগ হচ্ছে ‘রাজনৈতিক প্রশাসক’। এ নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে চিন্তা-ভাবনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। চলছে আলাপ-আলোচনা।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান নেতাকর্মী ও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন এটা জনগণ মেনে নেবে না।

তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে কাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তা এখনো ঠিক হয়নি। আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ে যে দুটি নাম শোনা যাচ্ছে তারা হচ্ছেন- ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে সাঈদ খোকন ও একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য একেএম রহমত উল্লাহ। ডিসিসির বিদ্যমান আইনে এ নিয়ে জটিলতা আছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে ডিসিসি দক্ষিণের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অতি দ্রুত এটি কার্যকর হতে পারে। সরকার এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে।’ বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর সেবা পেতে তেমন একটা সমস্যা হবে না বলেও মন্তব্য করেন ডিসিসির ওই কর্মকর্তা।

জানা গেছে, দুই সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েও বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। সরকার যাচাই বাছাই করে বিষয়টি দেখছে।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, জনগণের ভোগান্তি দূর করার জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। কিন্তু এর পরেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং নগরবাসীর সেবা পেতে আরো দুর্ভোগ ভেড়েছে। আমলারা প্রশাসক থাকায় জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া ডিসিসি আইনে কোনো আমলা ছয় মাসের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারেন না। তাই কার্মস্থলে যোগ দিয়ে কাজে মনোযোগ দেয়ার আগেই আবার বদলি। তাই তারা নগরবাসীকে সঠিক সেবা দিতে পারেন না। তারা বলছেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অথবা রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দিলে কাজে গতিশীলতা আসবে। একই সঙ্গে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।

আইন অনুয়ায়ী, সিটি করপোরেশনে নিয়োগপ্রাপ্তরা হবেন প্রশাসন ক্যাডারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব)। তাদের স্থায়িত্ব ছয় মাসের বেশি হবে না। এজন্য নগরবাসীর দুর্ভোগ ও জনসমস্যা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারেন না তারা। নিলেও তা বাস্তবায়নের আগেই তারা আবার বদলি হয়ে যান। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা নগরবাসীর সেবার বিষয়টি মাথায় রেখেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন। তবে এ আইনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সেজন্যই সরকার বিষয়টি নিয়ে আইনজ্ঞদের ব্যাপক মতামত নিচ্ছে। জটিলতা কেটে গেলে রাজনৈতিক প্রশাসকদের মাধ্যমেই সিটি করপোরেশন চালানো হবে।

সরকারের অপর একটি সূত্র দাবি করছে, এই মুহূর্তে ঢাকা সিটি করপোরেশনে নির্বাচন দিলে সরকারের ভরাডুবির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তারা সে ঝুঁকি নিতে চান না। যতদূর সম্ভব রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দিয়েই সংস্থা দুটি পরিচালনা করাটাই এ মুহূর্তে সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য লাভজনক। এ বিষয়টিও তারা মাথায় রেখেছেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, দেড়কোটি ঢাকাবাসীর বৃহত্তর সেবাদানের কথা চিন্তা করে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগের কথা ভাবা হচ্ছে। এটি করা হলে ডিসিসির সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।

তারা আরও বলেন, ডিসিসিতে এমন প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হবে যারা দল গুছিয়ে পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও যেন অংশ নিতে পারেন।

অপর একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, দুই সিটি (ঢাকা দিক্ষণ ও উত্তর) করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগের জন্য দলের উচ্চ পর্যায়ে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হচ্ছেন- ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে সাঈদ খোকন ও একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ক্লিন ইমেজধারী একেএম রহমত উল্লাহ। সাঈদ খোকনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও একেএম রহমত উল্লাহকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নিয়োগ দেয়া হতে পারে। এজন্য তারাও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ রাখছেন। এর মধ্যে প্রধামন্ত্রী নিজেও তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলেও শোনা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘সরকার বিভক্ত দুই সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। এমনটাই আমার জানা আছে। তবে এটি পুরোপুরি শেষ না হওয়া পযর্ন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. সেলিম বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আমাদের সঙ্গে আলোচানা হয়নি। তবে এটি করা হলে তা জনগণ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেন, ‘এটা সরকারের মন্ত্রী ও উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের জিজ্ঞাসা করেন। আমি এটা জানি না।’

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এটা হবে সংবিধানের চরম পরিপন্থি। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে- স্থানীয় সরকারের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকবেন। এটা করলে সংবিধান লঙ্ঘন অব্যাহত থাকবে। এটার মাধ্যমে সরকার রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আইনে আছে ৬ মাসের মধ্যে যে কোনো স্থানে নির্বাচন দিতে হবে। এটা আমাদের আপিল বিভাগ চরমভাবে অমান্য ‍করে আসছেন।’

এজন্য তিনি অতি দ্রুত দুই সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের দাবি জানান।

২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধনী) বিল, ২০১১ পাসের মাধ্যমে ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগ করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশ নামে স্বতন্ত্র দু’টি করপোরেশন গঠন করা হয়। তার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ৩৬টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে ৫৬টি ওয়ার্ড রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, ডিসিসি ভাগ হওয়ার পর নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এখন বিভক্ত দুই সিটি করপোরেশনকে ৫টি অঞ্চলে বিভিক্ত করে ১০টি আঞ্চলিক অফিস নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সেবা দান করা হচ্ছে।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ ২০০২ সালের এপ্রিলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর টানা প্রায় ১০ বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা। ২০০৭ সালের ১৫ মে ডিসিসির মেয়াদ শেষ হয়। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। বর্তমানে প্রশাসকের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু সীমানাসহ বিভিন্ন ছোটখাটো জটিলতার ছুতো দিয়ে নির্বাচন দেয়া হচ্ছে না।

২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল ২৪ মে নির্বাচনের দিন ধার্য করে বিভক্ত ডিসিসি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু ভোটার তালিকা আর সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় তা আটকে যায়। এরপর ২০১৩ সালের ১৩ মে ডিসিসি নির্বাচনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন উচ্চ আদালত।

এর পর সরকার ও নির্বাচন কমিশন আবার নির্বাচন করার জন্য তোড়জোড় শুরু করে। তখন ইসিও ঘোষণা দিয়েছিলে, ওই বছরের অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ ঢাকা সিটি করপোরেশনের দুই অংশের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু ঢাকার সুলতানগঞ্জ ইউনিয়ন ঢাকা সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠানে আবারও বাধাগ্রস্ত হয় নির্বাচন কমিশন। তবে পরবর্তী সময়ে সুলতানগঞ্জকে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ততদিনে শুরু হয়ে যায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল। ফলে সিডিসির নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি।