অন্তত একটি হাসপাতাল হোক আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা নির্ভরতার প্রতীক

মো. আবুল হাসান  ও খন রঞ্জন রায় :: চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং ভোগান্তির বিভিন্ন মাত্রার কাছে পর্যুদস্ত হয়ে সাধারণ মানুষ এখন রোগমুক্তি নিয়ে অন্তহীন দুর্ভাবনায় রয়েছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে ছোটা সঙ্গতি, সীমাবদ্ধতা বলেই তারা সরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়। সামর্থ্য যাদের আছে তারা বেসরকারি হাসপাতালকেই ভরসা হিসেবে দেখে এবং প্রয়োজন হলেই বিদেশেও ছুটে যেতে পারে সুস্থতার সন্ধানে। দেশের ভিআইপিগণ চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা নেওয়া কথা ভাবেন না। স্বাস্থ্য চেকআপ বিষয়টিও হরহামেশায় বিমান নির্ভরতার গন্তব্যে সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে গমন করেন। এতে বছরে ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থ বিবেচনা ছাড়াও জাতি হিসাবে এটি অবমাননার বিষয়। ভুক্তভোগী রোগী এবং তাদের অনেক পরিবারের অভিযোগ, দেশের অধিকাংশ হাসপাতালেই চিকিৎসার নামে রোগীর জীবন নিয়ে ছেলেখেলা চলে। বাংলাদেশের এই ব্যয়বহুল ও অনাদরের চিকিৎসার প্রতি মানুষের আস্থা নেই। সাধারণত সরকারি হাসপাতালে গরিব রোগীরা গিয়ে থাকে। গরিব রোগীদের অর্থবিত্ত নেই, ডাক্তার ও হাসপাতালের স্টাফদের/ তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয় চরমভাবে। গ্রামগঞ্জে ও জেলা শহরের হাসপাতালের অবস্থা আরো ভয়াবহ। এ নিয়ে প্রতিদিন কোন না কোন পত্রিকার শিরোনাম হয়।
১৯৭৪ সালের ২৮ জানুযারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে পিওথলির অপারেশনের মাধ্যমে ভিভিআইপিদের বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের যাত্রাপথ উন্মোক্ত করেন। এরপর থেকে যত দিন যাচ্ছে ততদিনই এই পথযাত্রীদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাক, কান, গলা নিয়মিত চেকআপ করেন আমেরিকায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পায়ের ব্যাথার চিকিৎসা করেন সৌদি আরবের কিং ফাহাদ হাসপাতালে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসাইন মো: এরশাদের জন্য সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল নির্ধারণ করা আছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বিচারপতি উচ্চপদের আমলা এরা সবাই দেশের ভিআইপি ব্যক্তি। বাংলাদেশে এদের চিকিৎসা নেই, করাতেও চান না। বাংলাদেশের ১৯ তম রাষ্ট্রপতি ৮৪ বছর বয়সী বর্ষীয়ান জননেতা মো: জিল্লুর রহমান। তার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ হতে কয়েক হাজার মাইল দূরে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ থাইল্যান্ডের ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিরবিদায় হন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মারা যান। প্রবীণ জননেতা আবদুল জলিলের মৃত্যু হয় বিদেশে। প্রখ্যাত রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আবদুর রাজ্জাকের জীবনাবসান ঘটে লন্ডনে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কোলকাতার হাসপাতালে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এরশাদুল বারী মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।  এই তালিকা আরো দীর্ঘ করা যায় অবলীলায় অনায়াসে। বিদেশে চিকিৎসার নামে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণারও শিকার হচ্ছেন দেশের অসংখ্যা সাধারণ মানুষ। অথচ এ বিষয়ে উদাসীন সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন ও ভারতের কিছু নামকরা হাসপাতালের নামে ঢাকা চট্টগ্রামে সাব অফিস খুলে অবাধে প্রতারণা করেছে হাসপাতালগুলো।
৫৬ হাজার বর্গমাইলের ক্ষুদ্র বাংলাদেশে একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ৩২ টি সরকারি ও ৬৭টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ১৮টি বিশেষায়িত চিকিৎসা ইনস্টিটিউট, ৬৪ জেলায় জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা, ইউনিয়নে ছোট বড় ৪ হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিদ্যমান এই সব হাসপাতালে ৬০ হাজার নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছে। দেশসেরা মেধাবীরা চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যায়নের সুযোগ পায়। প্রতি বছর স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ অর্থ বরাদ্দ করা হয়। তারপরও কেন রাষ্ট্রের কর্ণাধারগন এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না।
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পড়লে সহজেই অনুধাবন করা যায়, একটি দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ডা: মাহাতির মোহাম্মদের ওপেন হার্ট সার্জারি প্রয়োজন পরে। বিদেশ একমাত্র ভরসা। তিনি তা করলেন না। দেশেই ব্যবস্থার নির্দেশ দিলেন। হলোও তাই। এরপর থেকে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিশ্বের অনুপ্রেরণা ও মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাজে বসবাসকারী সকল স্তরের মানুষের জন্য বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর শিক্ষাবঞ্চিত অসচেতন ও অর্থ-সামর্থ্যহীন জনগণের জন্য ক্যান্সার নামক রোগটি আজও ঘাতক-ব্যাধি হিসেবে বিবেচিত। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে জনগণের স্বাস্থ্য-বিষয়ক সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ এবং আর্থিক সচ্ছলতা থাকার ফলে ঐ সমস্ত দেশের বাসিন্দারা প্রাথমিক অবস্থাতেই ক্যান্সার সংক্রমণের প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার আওতায় নিজেদের মুক্ত করতে পারে। ফলে, ঘাতকব্যাধি হলেও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগমুক্ত সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যান্সার পরিস্থিতির যে চিত্র আছে তা থেকে দেখা যায়, এদেশে প্রতিবছর ৭ হাজার শিশুসহ প্রায় ২ লক্ষেরও বেশি মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ৫০ হাজারেরও বেশি মারা যায় বিনা চিকিৎসায়। নতুন করে ক্যান্সার আক্রান্ত ২ লাখ রোগীর মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোগীই চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর চিকিৎসা পাচ্ছে বছরে মাত্র ২০ হাজার নতুন রোগী। অনকোলজি ক্লাব, ঢাকা আহছানিয়া মিশন হাসপাতাল, ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। এই রোগ নির্ণয়ে প্রথম কাজ বায়োপসি পরীক্ষা। দেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্যাথলজির অভাবে সাধারণ মানুষ এদেশে এখনও ক্যান্সার  সনাক্তকরণ ব্যবস্থাদির সুযোগ সহজে ও স্বল্পব্যয়ে গ্রহণ করতে পারে না। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপিস্ট ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সমন্বয়ে টিম দরকার। এ ক্ষেত্রে মেডিকেল ফিজিসিস্ট রশ্মি প্রয়োগের জন্য টিপিএস ব্যবস্থায় ছক তৈরি করবেন, রেডিওথেরাপিস্ট সিটিস্ক্যানারের মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্ত করবেন এবং মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও রেডিওথেরাপিস্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওথেরাপি) রশ্মি প্রক্ষেপণ করবেন। এসব চিকিৎসার জন্য দেশে কমপক্ষে ৬০০ মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং এক হাজার রেডিওথেরাপিস্ট প্রয়োজন। কিন্তু আছে মাত্র ৬০-৭০ জন রেডিওথেরাপিস্ট আর ২০ জনের মতো মেডিকেল ফিজিসিস্ট। সরকারিভাবে একজনও নেই। বর্তমানে রোগ নির্ণয় সঠিক প্যাথলজি ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল।  আগে রোগীর নাড়ি দেখে, হাঁটাচলা দেখে রোগ নির্ণয় সম্ভব হলেও এমন এটা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে যে কোনো রোগ নির্ণয়ের পূর্বশর্ত হল রোগীর সঠিক রোগের ইতিহাস, ফিজিক্যাল পরীক্ষা এবং সর্বশেষে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা । এ  তিনটির  সমন্বয় ছাড়া বর্তমানে কোনো রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং পরবর্তী ফলোআপ সম্ভব নয়।
পরীক্ষা নিরীক্ষার দায়িত্বে থাকা পর্যাপ্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অভাবে সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যাবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার বৃদ্ধি পেলেও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংখ্যা বাড়ছে না। এই পরিস্থিতিতে বিশেষ করে অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার নন-টেকনিক্যাল লোক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এতে চিকিৎসার মান যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি বাড়ছে, ভুল চিকিৎসার আশংকা । ভুল রিপোর্টের কারণে প্রায়শই ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
এক্স-রে সংশিষ্ট ও যাবতীয় পরীক্ষার নিরীক্ষার দায়িত্বে থাকা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রেডিওলজি। দেশে আন্তর্জাতিক মানের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট একজনও তৈরি করা হয়নি। দেশে নার্সের অভাবে আরও প্রকট। মানসম্পন্ন চিকিৎসার জন্য ১ জন ডাক্তারের বিপরীতে নার্স থাকা উচিত ৩ জন। অথচ আমাদের দেশে উল্টো, ২ জন ডাক্তারের জন্য রয়েছে একজন নার্স। পৃথিবীর সবদেশে শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে বোর্ড কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশে নার্সিং ডিপ্লোমা নিয়ন্ত্রণ করে নার্সিং কাউন্সিল। জেলা উপজেলা নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হলে নার্সিং শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ যথোপযুক্ত করা অতি জরুরি। গুণগত মানের চিকিৎসা প্রদানে হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ঔষধের সাথে আনুষাঙ্গিক হলো আধুনিক যন্ত্রপাতি। প্রায়ই শোনা যায় সরকারি হাসপাতালে মূল্যবান যন্ত্রপাতি আছে, তবে তা কাজ করছে না। অকেজো হয়ে বাক্সবন্ধি পড়ে আছে। বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ইন  ইলেকট্রো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার অভাবে কোন মেডিকেল যন্ত্র কারখানা গড়্ উেঠেনি। বিদেশ থেকে আমদানীকৃত মূল্যবান যন্ত্রপাতি  রক্ষণাবেক্ষণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।
সমস্ত বাধা দুর করে একটি রাষ্ট্র, একটি দেশ, একটি সরকার কি পারে না ভিআইপি ব্যক্তিদের চিকিৎসার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করতে? সিঙ্গাপুরের একটি প্রাইভেট হাসপাতাল যা পারছে, তা কি পুরো বাংলাদেশ করতে পারে না? দেশে একটি হাসপাতাল দাঁড় করানো যেতে পারে যেখানে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, এমপি, বিরোধীদলীয় নেত্রী, উচ্চপদের আমলা এবং অন্য রাজনীতিবিদদের চিকিৎসার পূর্ণ ব্যবস্থা থাকবে। বিশ্বস্বাস্থ্য দিবসের প্রাক্কালে জাতির প্রত্যাশা অন্তত একটি হাসপাতাল হোক আন্তর্জাতিক মানের। দেশের চিকিৎসা আশা আকাক্সক্ষা ও নির্ভরতার প্রতীক।(অসম্পাদিত)

মো. আবুল হাসান, সভাপতি
খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব
ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ
৪৭, মতি টাওয়ার, চকবাজার, চট্টগ্রাম।