বার্তাবাংলা ডেস্ক »

gosak123বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে স্বাধীনতার এই চার যুগ পরেও মতবিরোধ ও দলাদলির অবসান হয়নি। ইতিহাসকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কপোল কল্পিত বিকৃত ইতিহাস থেকে ফায়দা নিতে ব্যস্ত প্রধান দুই রাজনৈতিক দল। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই জীবন্ত স্মারকগুলোর প্রতি কারোরই কোনো দরদ নেই। যুদ্ধ শুরুর অব্যাবহিত পরে যেস্থানটি থেকে সবচেয়ে প্রেরণাদায়ী বাণীটি প্রচারিত হয়েছিল সেই কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রের দুর্দশা যেকোনো নাগরিককে ক্ষুব্ধ করবে। স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে দুই দল দুই ব্যক্তিকে নিয়ে জঘন্য রাজনীতিতে ব্যস্ত আর সেই স্থাপনাটি পড়ে আছে অনাদরে জরাজীর্ণ অবস্থায়।

‘স্বাধীনতার ঘোষক’ নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মতবিরোধে আজকাল ঘি ঢালেন দলকানা বুদ্ধিজীবীর দল। একাত্তরের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল সেই ঘোষণা কেন্দ্রটির দুর্দশা নিয়ে এই বুদ্ধিজীবীদেরও কোনো মাথাব্যথা নেই।

মুক্তিযুদ্ধের মহান স্মৃতি বিজড়িত কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি সংরক্ষণে কার্যকরী উদ্যোগ না নেয়ায় অযত্নে অবহেলায় জাতীয় গর্বের স্থাপনাটির দৈন্যদশা দেখে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হন মানুষ।

জানা যায়, ২০০৭ সালের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কেন্দ্রটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। এখনো পর্যন্ত তা মেরামত করা হয়নি। চট্টগ্রাম বেতারের পদস্থ কর্তারা একাধিকবার নষ্ট হওয়া যন্ত্রাংশ মেরামত এবং কেন্দ্রের সংরক্ষণে বাংলাদেশ বেতারের সদর দপ্তরে বিভিন্ন প্রস্তাব এবং সুপারিশ করেছেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তাও আটকে আছে। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কেন্দ্রের আওতাধীন ৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার শ্রোতারা প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা ভালোভাবে শুনতে পারেন না। একই সমস্যার কারণে শ্রোতারা অনুষ্ঠানমালার সাথে সাথে এক ধরনের বিরক্তিকর উদ্ভট আওয়াজও শুনতে পান।

২০০৭ সালে বিএনপি সরকার কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ভূমির উপর ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামক একটি পার্ক স্থাপন করে। কিন্তু সেটি স্বাধীনতার এই স্মৃতি সংরক্ষণে কোনো ভূমিকা রাখছে না। পার্কে আসা দর্শনার্থীরাও স্বাধীনতার ঘোষণা কেন্দ্রটির ব্যাপারে কোনো তথ্য জানার সুযোগ পাচ্ছে না। এই ধরনের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি বেতার কেন্দ্রের জায়গায় স্থাপিত পার্কটিতে।

পার্কটি নির্মাণের পর সড়কের পাশে ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাংসদ ও জাসদের কার্যকরী কমিটির সভাপতি মইন উদ্দিন খান বাদল ‘স্বাধীনতার ঘোষণা স্তম্ভ কেন্দ্র’ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে একটি ফলক উন্মোচন করেন। কিন্তু তা ওই পর্যন্তই।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইয়ের সূত্র মতে- ২৬ শে মার্চ দুপুরে প্রথম স্বাধীনবাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নানের ভরাট কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তা। বেলাল মোহাম্মদের তত্ত্বাবধানে আবুল কাশেম সন্দ্বীপ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার উল্লেখ করে সাধারণকে উদ্দীপ্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য প্রচার করতে থাকেন।

আরো উল্লেখ আছে- এর মধ্যে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান ফোর্স নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ করতে করতে পিছিয়ে পটিয়া চলে আসেন। তখন তাকে অনুরোধ করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাহারা বসানোর জন্য। মেজর জিয়া সে অনুরোধ সানন্দে গ্রহণ করেন এবং ২৭ তারিখ সন্ধ্যায় তিনি বেতার কেন্দ্র পরিদর্শনে এলে বেলাল মোহাম্মদ তাকে অনুরোধ জানান যেন সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে তিনি একটি ঘোষণা দেন।

মেজর জিয়া স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে পরপর দুটি ঘোষণা পাঠ করেন যার দ্বিতীয়টি ছিল এরকম- আই, মেজর জিয়াউর রহমান ডু হেয়ারবাই ডিক্লেয়ার দ্য ইনডিপেন্ডেন্স অব বাংলাদেশ অন বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান…।

ঘোষক নিয়ে দু’দলের মধ্যে যতই মতবিরোধ আর পরস্পর বিরোধিতা থাকুক স্বাধীনতার ঘোষণা যে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকেই হয়েছে সেটি নিয়ে কোনো সন্দেহ বা বির্তক নেই। এরপরও কেন এটির এমন করুণ দশা জানতে চাইলে নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এটি দলের ব্যাপার না, সর্বজনীন বিষয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম অফিসিয়াল ঘোষণা এ কেন্দ্র থেকেই এসেছিল। তাই এটি শুধু চট্টগ্রামের নয়, পুরো দেশের জন্যই স্বাধীনতার সাক্ষী হিসেবে গুরুত্ববহ। তাই কেন্দ্রটি সংরক্ষণে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ।’

কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বলে দাবি করেন আমীর খসরু।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা মোছলেম উদ্দিন বলেন, ‘জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই বেতার কেন্দ্রটির সংরক্ষণ প্রয়োজন। এ কেন্দ্র থেকে যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তা মুক্তিযুদ্ধের জন্য বড় অর্জন। আমরা সরকারের কাছে কেন্দ্রটির যথাযথ সংরক্ষণ করার দাবি করছি।’

এ কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নানই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারের চন্দগাঁও থানাধীন কেন্দ্রটির বিপর্যয়ের সূচনা হয় ২০০৭ সালের ১১ জুন থেকে। এদিন স্মরণকালের অতি বর্ষণে কেন্দ্রটি পানির নিচে থাকে ১১ দিন। ফলে স্বাভাবিক সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। নষ্ট হয় বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। পরে বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও স্বাভাবিক সম্প্রচার নিশ্চিতের জন্য করণীয় নির্ধারণে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির সদস্যরা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছিলেন।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১১ জুন বিরামহীন বৃষ্টি এবং আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের কারণে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রের টিআরহল, সাবস্টেশন কক্ষ, জেনারেটর কক্ষ ও এন্টেনা কক্ষে পানির উচ্চতা ফ্লোর থেকে ১৩-১৪ ইঞ্চি বৃদ্ধি পায়। ফলে সংস্থাপিত বিভিন্ন ট্রান্সফরমার, চোক কয়েল, ১১ কেভি সার্কিট ব্রেকার ও অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়।

চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ লিয়াকত আলী বলেন, ‘ঢাকার পর চট্টগ্রাম বেতারের অবস্থান। এখান থেকেই ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতার ঘোষণা হয়। ফলে এটি এখন দেশের একটি ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি এখন চরমভাবে অবহেলিত। অথচ দেশের অন্যান্য বিভাগের বেতারগুলোর অবস্থা তুলনামূলক ভালো।’ তিনি বলেন, ‘এ কেন্দ্রের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই আমি ঢাকার সদর দপ্তরে বিভিন্নভাবে প্রতিবেদন ও প্রস্তাব দিয়ে আসছি।’

বাংলাদেশ বেতারের প্রধান প্রকৌশলী আহমদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘বেতার কেন্দ্রটির সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পৃক্ত। তাই এটি একটি জাতীয় স্মারকে রূপ নিয়েছে। এটির যত্ন নেয়া ও সম্প্রচারে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের নিচের স্থানটি ইতোমধ্যে মাটি ভরাট করা হয়েছে। তাছাড়া নষ্ট হওয়া ট্রান্সমিটারগুলো সংস্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, একটি ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে এক কিলোওয়াট ক্ষমতার ট্রান্সমিটার নিয়ে বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫৪ সালের ২২ জুন। পরে ১৯৬২ সালের প্রথমদিকে কালুরঘাটে ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ট্রান্সমিটার স্থাপন করা হলে শুরু হয় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। ১৯৬৩ সালের ১ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে নিজস্ব অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়।

১৯৮৭-৮৮ সালে স্থাপন করা হয় ১০০ কিলোওয়াটের ট্রান্সমিটার, যার আয়তন ৫০ বর্গকিলোমিটার। প্রতিষ্ঠানটি ৫১ বছর পার করেছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৪ ঘণ্টা নিজস্ব অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। সঙ্গে রিলে করে প্রচারিত হচ্ছে- বিবিসি, ডয়েচে ভ্যালে, এনএইচকে ও সিআরআই এর মতো বিদেশি প্রচার মাধ্যমের অনুষ্ঠান। সংগীত শিল্পী, নাট্যশিল্পী, নাট্যকার, শিশুশিল্পী, কথক, আলোচক, ঘোষক-ঘোষিকা সব মিলে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার তালিকাভুক্ত শিল্পী আছে এ বেতার কেন্দ্রের।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »