বার্তাবাংলা ডেস্ক »

TB treatment in Bangladesh>> প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ
শারমিন আরা :: ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ (Multi Drug Resistance-MDR) করতে হলে ডটস ব্যবস্থাাকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করতে হবে। কিন্তৃু আমাদের দেশে ডটস কার্যক্রম এখনো সেভাবে সফল হয় নি। এছাড়া শিশুদের যক্ষ্মা রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার বিষয়াদিতে এখনও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর পাশাপাশি ডায়াগনস্টিক সুবিধার অপ্রতুলতা, লক্ষণ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে অনেকের মধ্যে। তবে শিশু যক্ষ্মা বিষয়ক জনসচেতনতা সৃষ্টি, সরকারি ও ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগ এবং চিকিৎসকদের একটু সময় নিয়ে রোগী দেখার মানসিকতা গড়ে উঠলে এ চিত্র পাল্টে যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ রোগ নিয়ন্ত্রণে যেসব চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে সেগুলো হলো: রোগীদের চিকিৎসা সেবায় গাফলতি, স্বাস্থ্য আচরণবিধি মেনে না চলা, আধুনিক চিকিৎসা উপকরণের অভাব, মানসম্মত ওষুধ না থাকা, চিকিৎসার জন্য স্বতন্ত্র এমডিআর হাপাতালের উদ্যোগ না নেওয়া, শিশু যক্ষ্মা সনাক্তকরণে সমস্যা, পাবলিক-প্রাইভেট পাটনারশিপে জোরালো উদ্যোগ না থাকা, ডায়াগনসিস করার ক্ষেত্রে জটিলত ইত্যাদি।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সূত্রে জানা যায়, বিশ্বে মোট যক্ষ্মা রোগীর ১০ শতাংশ শিশু। কিন্তু বাংলাদেশে এই হার ৩ শতাংশ। তবে সনাক্ত করণের হার ২০০৫ সালে ছিল ১.৮৫ শতাংশ। যা ২০১১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৩.১৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের যক্ষ্মা রোগে প্রধান সমস্যা এর সনাক্তকরণে। কারণ শিশু যক্ষ্মা রোগীর রোগ সঠিকভাবে অনুমান সম্ভবপর হয় না। ১০ বছরের নীচের শিশুদের  যক্ষ্মা রোগের নির্দিষ্ট কোন লক্ষণ পাওয়া যায় না। যক্ষ্মার জীবাণু সনাক্তকরণের জন্য কফ পাওয়া কঠিন, পাকস্থলির রস সংগ্রহ করা কঠিন, টিউবারকুলিন পরীক্ষার ফল দ্বারা সব সময় সঠিক সিদ্ধান্তে আসা যায় না।

এনটিপি’র ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কনসাল্টেন্ট ডা. মো. মুজিবুর রহমান জানান, বিশে^ যক্ষাপ্রবণ ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ। ২০১১ সালে সারাদেশে মোট এক লাখ ৪৮ হাজার ১৯৬ জন যক্ষ্মারোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে শিশুদের মধ্যে ফুসফুস বহির্ভুত যক্ষায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সূত্রে জানা গেছে, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ২০১১ সালে যক্ষারোগী কমেছে। ২০০৯ সালে কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষারোগীদের ৭৪ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭০ শতাংশ শনাক্ত হয়। ২০১১ সালে এ হার ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক  প্রফেসর ডা. ডীন মো: নূরুল হক বলেন, যক্ষ্মাসহ সরকারের সকল কর্মসূচি সফল করতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা, অঙ্গিকার, বেসরকারি পর্যায়ে ও মিডিয়ার সহযোগিতা এবং সর্বোপরি গণসম্পৃক্তকরণ। তিনি বলেন, মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্রার বা ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। কারণ, সাধারণ যক্ষ্মা রোগী আরোগ্য লাভ করলেও ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা রোগী কোনভাবেই ভালো হয় না। তাই এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি জরুরি।

টিবি অ্যান্ড ল্যাপ্রসি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূিচর লাইন ডিরেক্টর ডা. আশেক হোসেন জানান, দেশজুড়ে ৮৫০টি ডটস কর্ণার ও এক হাজার ৫০টি ল্যাবে সর্র্ম্পূ বিনামূল্যে যক্ষা শনাক্তকরণ সুবিধা রয়েছে। সেখান থেকে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। আর এ বিষয়ে জনসচেতনতা গতে তুলতে সরকারের পাশাপাশি ব্র্যাকসহ নানা বেসরকারি সংস্থা কাজ করে আসছে। তাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।

তিনি বলেন, শিশু স্বাস্থ্য সমস্যা চিহ্ণিতকরণে সরকারের উদ্যোগ নেই-এটা মিথ্যা। সরকার পরিচালিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে শিশু যক্ষা রোগ নির্নয় ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আছে। তবে সমস্যা যেটা, তা হচ্ছে, থিংকিং সমস্যা। এজন্য মানুষের সচেতনতা জরুরি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্য্যালয় এর সাবেক প্রো-ভিসি ও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন এর সভাপতি রশীদ-ই-মাহবুব এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ডটস ব্যবস্থাাকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করতে হবে। কিন্তৃু আমাদের দেশে ডটস কার্যক্রম এখনো সেভাবে সফল হয় নি। ফলে এক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয় নি।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক ড. মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের এখন তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো হচ্ছে: জনসম্পৃক্ততার জন্য বাণিজ্যিক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান যেমন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা, রোগীদের দ্রত ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসা কর্ াএবং দরিদ্র রোগীদের স্বার্থে জনউদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি নেওয়া।

তিনি আরো বলেন, সরকারের যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমসূচীর (এনটিপি) সাথে ব্র্যাকসহ মোট ৪৩টি প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজি-৬ অনুযায়ী যক্ষার প্রকোপ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে কার্যত্রক্রম জোরদার করতে হবে।

এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডটস পদ্ধতির চিকিৎসায় ফুসফুসের যক্ষা নিরাময়ের সাফল্য আশাব্যঞ্জক হলেও ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ এখনও সেভাবে আসেনি।  কারণ রোগীদের অসচেতনতার কারণে এ রোগ কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এছাড়া তারা শিশুদের যক্ষ্মা নির্ণয় ও চিকিৎসায় প্রতিবন্ধকতা দুর করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাদের মতে, যক্ষা নিরুপণে সরকারের সঙ্গে ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এখন যেভাবে উদ্যোগ নিয়েছে তা অব্যাহত থাকলে শিশু যক্ষা রোগ সনাক্তকরণ ও চিকিৎসার বিষয়ে কাঙ্খিত অগ্রগতি হতে পারে।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »