ফের মামলার চাপে বিএনপি

বার্তাবাংলা ডেস্ক ::   ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর আন্দোলনে কিছুটা বিরতি দিয়েছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী জোট। বিএনপি চেয়ারপারসনও দল গুছিয়ে উপজেলা নির্বাচনের পর নতুন করে আন্দোলন শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিছুদিন যৌথবাহিনীর অভিযান পরিচালনার পর সরকারও মামলা, হয়রানি ও গ্রেপ্তার কিছুটা কমিয়ে দিয়েছিল। কৌশলে বিএনপিকে ব্যস্ত রাখতে ঘোষণা করা হয় উপজেলা নির্বাচনের তফসিল। কিন্তু প্রথম দু’দফা উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বেশি বিজয়ী হওয়ায় ভোল পাল্টে ফেলে সরকার। নতুন করে মামলা-হামলা ও গ্রেপ্তার-নির্যাতন শুরু করেছে। বিরোধী জোট শক্তি সঞ্চয় করে রাজপথে যাতে সক্রিয় হতে না পারে সেজন্য নতুন চাপ সৃষ্টি করছে সরকার। একে একে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের। আদালতে হাজির হলেই নামঞ্জুর হয়ে যাচ্ছে জামিন। মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর জেলগেটেই ফের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এছাড়া গ্রেপ্তারের পর থানায় নিয়ে রাজনীতি না করার মুচলেকাও নেয়া হচ্ছে নেতাদের কাছ থেকে। মামলায় জামিনপ্রাপ্ত নেতাদের বাসায় প্রায়ই তল্লাশি চালানো হচ্ছে। মামলা দেয়া হচ্ছে বিএনপি তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধেও। বাদ যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। দুটি মামলায় তাদের বিরুদ্ধেও বিচার শুরু হয়েছে। এছাড়া নির্বাচিত ১৯ দল সমর্থিত উপজেলা চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যানদেরও বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার-হয়রানি করা হচ্ছে। জানা গেছে, গত ১৯শে মার্চ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজির হলে এজলাস কক্ষে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয় ১৯ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়াকে। দুটি মামলায়ই তার সময় বাড়ানোর আবেদন নাকচ করে অভিযোগ গঠন করা হয়। এর ফলে দুটি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচার শুরু হলো। এর আগে গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি পৃথক চারটি মামলায় আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান। আদালত তার জামিন আবেদন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তিনিও বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এরপর গত ১২ই মার্চ অর্থপাচার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনদিনের রিমান্ডে পাঠানো হয় বিএনপির এ সিনিয়র নেতাকে। রিমান্ড শেষে তিনিও বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এরপর ১৬ই মার্চ আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ঢাকা মহানগরের সদস্য সচিব আবদুস সালাম। আদালত তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গত ১৮ই মার্চ একটি মামলায় রাজশাহী মহানগর আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু। আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। ১৯শে মার্চ খালেদা জিয়ার আদালতে হাজির হওয়াকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার জজকোর্ট এলাকায় মিছিল করেন বিএনপি নেতারা। এসময় গ্রেপ্তার করা হয় সূত্রাপুর থানা যুবদল সভাপতি জাবেদ কামাল রুবেলকে। ২০শে মার্চ শাহবাগ থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রাইসুল ইসলাম চন্দনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২১শে নভেম্বর মহানগর যুবদলের সহ-সম্পাদক মো. সিরাজকে। এরপর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে তিনদফা জেলগেটে গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ই ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা মহানগর দপ্তর সম্পাদক ওসমান গনি টুটুলকে। ৯ই মার্চ জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর ফের জেলগেটে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে গত ১৯শে মার্চ মুক্তি পান তিনি। সবুজবাগ থানা বিএনপির আহ্বায়ক বদিউজ্জামান বদিকে আটকের পর থানায় নেয়া হয়। এরপর সেখানে আর রাজনীতি করবে না মর্মে তার কাছ থেকে বন্ডসই নেয় পুলিশ। গত ২০শে মার্চ রাতে গে-ারিয়া থানা বিএনপির সেক্রেটারি আবদুল কাদিরের বাসায় পুলিশ তল্লাশি চালায়। এছাড়া একতরফা নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন চলাকালে গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রদল সভাপতি আবদুল কাদের ভূইয়া জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব ও সিনিয়র সহ-সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ এখনও মুক্তি পাননি। এদিকে উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর অব্যাহতভাবে মামলা-হামলা ও নির্যাতন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। তিনি বলেন, দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সরকারদলীয় ক্যাডাররা বিএনপি নেতাদের নানাভাবে হয়রানি করছে। প্রশাসনও সরকার দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩২ হাজার মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাত হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। ১৯ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতারাও অনেক মামলার আসামি। রাজধানীসহ দেশের তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন নতুন করে আন্দোলনের চেয়ে মামলা সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ৩২ হাজার মামলায় দলের প্রায় তিন লাখ নেতাকর্মী আসামি। রাজধানীতে তাদের বিরুদ্ধে দুই থেকে তিন হাজার মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মির্জা আলমগীরের নামে ১৪টি মামলা হয়েছে। তাছাড়া ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন খোকা, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা দশের অধিক। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রি. জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, রুহুল কবির রিজভী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবদিন ফারুক, আন্তর্জাতিক সম্পাদক এহছানুল হক মিলন, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরব, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী সোহেল, সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপুসহ বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই একাধিক মামলার আসামি। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা শতাধিক। এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান মানবজমিনকে বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধিতা থাকে। দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়- কে কতটুকু জনগণের কাছে যেতে পারে। কিন্তু এই সরকার যেমন নির্বাচনকে গুরুত্ব দেয়নি। একইভাবে জনগণের চাওয়া-পাওয়াকেও পাত্তা দিচ্ছে না। গায়ের জোরে একতরফাভাবে সব কিছু করে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অবৈধ এই সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার-নির্যাতন চালাচ্ছে। আমি মনে করি, গ্রেপ্তার-নির্যাতন করে অতীতেও বিএনপিকে দুর্বল করতে পারেনি। এবার তারা এসব করে বিএনপিকে দুর্বল করতে পারবে না। সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। শিগগিরই গণবিস্ফোরণে এই সরকারের পতন হবে।