মনিরামপুরে বোমাবাজি গুলি ও কেন্দ্র দখল

বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: যশোরের মনিরামপুরে নজিরবিহীন সন্ত্রাস সৃষ্টি করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি-জামায়াতের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ না হওয়ায় নির্বাচন চলাকালে কমপক্ষে ২০টি কেন্দ্র দখল করে ভোট ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ জামায়াত-শিবির কেন্দ্র দখল করে নির্বাচনী ফল তাদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করেছে। তবে প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে হাজরাহাটি কেন্দ্র বাদে বাকি সবগুলো কেন্দ্রে এক প্রকালে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরেই মনিরামপুরে বিরাজ করছিল ত্রিমুখী উত্তেজনা। ক্ষমতাসীনরা এ উপজেলা পরিষদটি নিজেদের দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। সব রকমের চেষ্টা-তদবির করে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়া ঠেকাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত বেলা ১১টার পরে আওয়ামী প্রভাব আছে এমন সব কেন্দ্রগুলোতে হানা দিয়ে প্রতিপক্ষ প্রার্থী বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্র ও বুথ থেকে বের করে দেয়। তার পর প্রিজাইডিং অফিসার ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারদের জিম্মি করে এককভাবে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার অভিযোগ রয়েছে আমজাদ হোসেন লাভলুর নির্বাচনী কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। আবার কোথাও কোথাও বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট প্রদানের অভিযোগ করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ২৬ বিজিবির কমান্ডার লে. কর্নেল মতিউর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন উপজেলার হাজরাহাটি কেন্দ্রে জামায়াত-শিবির কর্মীরা বোমা ফাটিয়ে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ছিনতাই করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ৪৭ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় হামলাকারীরা বেশ কয়েকটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় বলে তিনি জানান। এ হামলায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হয় বলে পুলিশ দাবি করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে হাজরাহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সরকার সমর্থক একদল সন্ত্রাসী চড়াও হয়। তারা প্রত্যেকটি বুথ থেকে জামাত সমর্থিত প্রার্থী এডভোকেট গাজী এনামুল হকের নির্বাচনী পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়। ভয়ে নিরাপদে বুথ ত্যাগ করে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী মশিউর রহমানের নির্বাচনী পোলিং এজেন্টরা। এসময় সরকারি দল সমর্থিত ২০-২৫ জন নেতাকর্মী ওই কেন্দ্রের প্রতিটি বুথে ঢুকে জোর করে ব্যালট পেপার নিয়ে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে। খবর পেয়ে জামায়াত সমর্থিত ৫০-৬০ জন নেতাকর্মী পাল্টা ওই কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে বুথ দখল করে নেয় এবং জাল ভোট দেয়া হয়েছে অভিযোগে ৩টি ব্যালট পেপারভর্তি ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। পুলিশ বাধা দিয়ে এসময় তারা বেশ কয়েকটি হাত বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ৪৭ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় পুলিশের নায়েক আবদুল জব্বার আহত হন। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে যশোরস্থ ২৬ বিজিবির কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মতিউর রহমান জানান, জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা হামলা করে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে। পরে পুলিশ গুলি চালিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে ২টি বাক্স উদ্ধার করে। অপর একটি বাক্স ভর্তি ব্যালটে সন্ত্রাসীরা আগুন ধরিয়ে দেয়। বর্তমানে ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ রয়েছে। এদিকে গত রাতে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা দেয়ার অভিযোগে পুলিশ জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী গাজি এনামুল হকের ভাই গাজী মুকিদুল হককে এক লাখ টাকাসহ আটক করেছে। গতকাল দুপুরে পুলিশ তাকে আদালতে সোপর্দ করে। তবে জামায়াত বলছে এসবই নির্বাচনী বিজয় ছিনিয়ে নিতে সরকারি দল ও তাদের পোষা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় অতি উৎসাহী সদস্যের মস্তিষ্ক উর্বর চিন্তার ফসল। এদিকে জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক শাহাবুদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেছেন, মনিরামপুরে তাদের প্রার্থীর বিজয় ছিনিয়ে নিতে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতাকর্মীরা ব্যাপক নির্বাচনী সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন চলাকালে উপজেলার খামারবাড়ি, মাচনা, মুক্তারপুর, চাকলা মাদরাসা ও হাই স্কুল, মশ্মিমনগর হাই স্কুল, চাপাতলা প্রাইমারি স্কুল, মুজগুন্নি প্রাইমারি স্কুল, নাগোরঘোপ প্রাইমারি স্কুল, রামনাথপুর প্রাইমারি স্কুল, চালুয়াহাটি প্রাইমারি স্কুল, মোবারকপুর প্রাইমারি স্কুল, ত্রিপুরাপুর প্রাইমারি স্কুল, খেদাপাড়া, চন্ডিপুর, সম্মিলনী হাই স্কুল, হানুয়ার প্রাইমারি স্কুল, মনিরামপুর মহিলা কলেজ, হাজরাহাটি প্রাইমারি স্কুল কেন্দ্রসহ কমপক্ষে ২০-২৫টি কেন্দ্র দখল করে ব্যাপক জাল ভোট দিয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে তাদের প্রার্থী গাজী এনামুল হকের কর্মী সমর্থক ও পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি প্রশাসনের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ এনে এসব কেন্দ্রে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানান। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দও। তাদের বক্তব্য হচ্ছে বিজয় নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে গোটা উপজেলায় সন্ত্রাস চালিয়ে সাধারণ ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে যেমন বাধা দিয়েছে তেমনি যেখানে সুযোগ পেয়েছে সেখানে সরকারী দল সন্ত্রাস চালিয়ে ভোট কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে। ফলে এ নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে তারা এই নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনঃনির্বাচন দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও ইউএনও শরীফ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, একটি কেন্দ্রে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোট গ্রহণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাকি কয়েকটি কেন্দ্রে সামান্য কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তবে তা কঠোর হস্তে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা মোকাবিলা করেছে। ফলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন ও ভোট গ্রহণ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। এদিকে স্থগিতকৃত হাজরাহাটি ভোট কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ১৭৮৫।