কোটিপতি হইবার প্ররোচনা ও আমার দর্শন

মাশরুর শাকিল :: ইদানিং বেশ বিপদে আছি বলিতে পারেন। কোটিপতি হইবার প্ররোচনার বিপদ। হাসলেন। হাসতে পারেন। কিন্তু আমি মহা মুশকিলে। কাজের প্রয়োজনে নিয়মিত কোটি পতিদের সহিত, আমারে টেলিভিশনে দেখিয়াই লোকজন এই প্ররোচনা দেয়া শুরু করিয়াছে। বলিতে পারেন, তাহাতো ভালোই। কেননা কোটিপতি হইতে কেনা চায়। আপনার মধ্যে কোটি পতি হইবার সংযোগ বিদ্যা ও তাহাকে ব্যবহার করিবার মন্ত্র আছে বলিয়াই তো তাহার সুবিধা নিতে চাহিতেছে। হাচা কথা । আমিও যে মাঝে মাঝে এ প্ররোচনার ফাঁদে পড়িনি তা নয়। কিন্তু পরক্ষণেই আমি বড় অস্থির হইয়া পড়ি। আমার সুখ শান্তি সবই আগামী দিনের কোটি পতি হইবার স্বপ্ন গিলিয়া খায়। দোষ আমারি।
জীবনের এতটুকু পথ আসিবার যাত্রায় টাকা পয়সা লইয়া কম কষ্ট ভোগ করিনাই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পকেটে টাকা নাই তাই একবেলা কমও খেয়েছি কখনো কখনো। তাই কোটি পতি হইতে চাইনা এ কথা সত্য নয়। এই স্বপ্ন আছে, তবে লোভ নাই। তাড়াহুড়োও নাই।
মাঝখানে আসলে তীব্রভাবে বাঁধ সাধিয়াছে জ্ঞান অর্জনের তীব্র আকাঙ্খা। রিডিং ক্লাব নামক এক অদ্ভুত ক্লাব। যাহা বাঁধিয়া দিয়াছে কমপক্ষে ৫০ পাতা পড়িতে হইবে।
বই পড়ার নেশা আমার বহু পুরোনো। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয জীবনে তাহা হইয়া উঠে নাই। স্বাংবাদিক হইবার তীব্র নেশায় এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি বড় বেশি অস্থির জীবন করিয়া রাখিয়াছিলো। ইচ্ছা ছিলো কিছু টাকা পয়সা কামানোর বিহিত হইলে বই কিনিবো।
এখন জীবনে যাপন করিবার মোতো টাকা কামাই করি। মাস শেষে কারো কাছে হাত পাততে হয়না।এমনিতে সবসময় আমি ঋণকে ঘৃণা করিতাম। এখন ১০০০ খানেক বইযের একখানা ছোটখাটো লাইব্রেরীও গড়িয়া তুলিয়াছি। ম্যানিব্যাগে টাকা থাকিলে বই না কিনিলে তাহার অস্থিরতা আমাকে নিবৃতি দেয়না। প্রতিদিন ৫০/১০০ পৃষ্ঠা না পড়িলে আমার সুখ মেলেনা। এইভাবে জীবনের একটা ছক গড়িয়া উঠিয়াছে। ও এর সাথে আবার যুক্ত হইয়াছে কিছু লেখার অভ্যাসও। ইহাতেই আমার সুখ।
এক্ষনে প্রশ্ন করিতে পারেন.. এসববের সাথে কোটি পতি হইবার পথে বাধা কোথায়। বাধা আছে। কোটিপিতি হইতে গেলে তো কোটি পতিদের কাছে ঘুরিতে হইবে। তাহাদের কাছ থেকে যাহারা প্ররোচনা দিতোছেন তাহাদের জন্য কাজকাম বাগাইতে হইবে। এসব করিতে গেলে চাকরির বাইরে কিছু সময় এ জন্য
ব্যয় করিতে হাইবে।সমস্যা এখানেই। এতেই আমার জ্ঞান অর্জন কেন্দ্রিক যে ছক জীবন। তাহাতে ছেদ পড়ে। আমার ৫০/১০০ পাতা আর পড়া হয়না। কদিন পরেই আমি বড় বেশি অস্থির হইয়া উঠি।
বুঝিলাম, আমার উপর লক্ষির চেয়ে স্বরস্বতির আছর বেশি।। এই আছর আমি উপভোগ করি। জীবনে যদি জ্ঞানী নাইবা হলাম । তবু এই চেষ্টা বৃথা নয়। এই চেষ্টার যে সুখ তাহা কোটি পতি হইবার চেয়ে কম নয়।
বাংলাদেশের খুব কম কোটিপতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাহাদের সাথে রোলস রয়েস কিংবা ল্যান্ড ক্রুসারে ছড়িায়া আমার কখনো মনে হয়নাই , আমারো যদি এ ধরনের একখান গাড়ি থাকিতো। তাহাদের সুদৃশ্য কয়েক হাজার স্কয়ার ফিটের বাড়িতে গিয়া আমার মনে হয়েছে, বড় বেশি শুন্য, মরুভুমির নির্জনতা যেনো সবটা জুড়ে। নির্জনতা মুক্তিতে তাদের ক্লাবের আলো আধারিতে সুখ খুজিতে যাইতে হয়। তার চেয়ে আমার ভালো লাগে , জ্ঞানী লোকের উপচে পড়া বইযের ভীড়ে একখানা চেয়ার। যেখানে বসিয়া তিনি তাবৎ বিশ্বের সৃষ্টি রহস্য, তাহার ইতিহাসের আদ্যোপান্ত জানিতেছেন। কথা বলিতেছে তাহার পূর্বের এবং পরের সকল পন্ডিতদের সাথে। কোটিপতি হইবার লোভের চেয়ে আমার সেই লোভ অনেক বেশি তীব্র। অনেক বেশি সুখের।
আমি কোটি পতি হইবার চেয়ে কোটি পতিদের আমার কথায় মুগ্ধ করিতে পছন্দ করি। তবে ভাবিবেননা। যাহারা কোটি পতি হইবার চায় তাহাদের আমি অশ্রদ্ধা করি, অসম্মান করি। যদি কোটিপতি হওয়া তাহাদের সাধনা হয়, তবে আমি, সেইসাধনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। যাহার কোটি পতি হইয়াছেন , তাহাদের পরিশ্রমের কথা শুনিতেও আমার ভালো লাগে। আমি তাহাদের ভালোবাসি।
আমার সাধনাটি কোটিপতি হইবার নয়। জ্ঞান অর্জন করিবার । আশেপাশে অনেক কোটিপতির জীবন দেখিয়া এই ধারনা বদ্ধমুল হইয়াছে কোটিপতি হওয়া পুরোটা একজনের নিয়ন্ত্রণেও নয়। এর অনেকটাই খোদার হাতে। সুতরাং যাহা আমার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নয় তাহা নিয়ে অস্থির হইবার কিছু নাই। তাহা যদি কপালে থাকে তবে হইবেই। তার চেয়ে বরং জ্ঞান সাধনা পুরোটা আমার আয়ত্তে। ।।ইশ্বর চাইলেও এ ক্ষেত্রে আমাকে কোন সহযোগিতা করিতে পারিবেননা যদি না আমি নিজে উঠে পড়ে না লাগি। ইহা আমার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।
স্বরস্বতির সাথে ঘর সংসারে যদি লক্ষী আসিয়া দাড়ায় তবে তাহাতে আমি অখুশি হইবোনা। লক্ষীও নিশ্চয় একজন মুর্খ লোকের পাশে থাকিবার চেয়ে জ্ঞানব্রতের কাছে থাকিতে অনেক বেশি গৌরব বোধ করিবে। (ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত)

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, চ্যানেল আই