বাংলাদেশকে আল-কায়েদার হুমকি, জিহাদের ডাক

ইউটিউবে ‘ইসলামের আলো’ নামের একটি চ্যানেলে রয়েছে ভিডিওগুলো

মো. মাহমুদুল হাসান :: ইসলামভিত্তিক বিতর্কিত আন্তর্জাতিক সংগঠন আল-কায়েদার কথিত ‘অডিওবার্তা’ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। সংগঠনটির বর্তমান প্রধান আইমান আল-জাওয়াহিরি বাংলাদেশে জিহাদের ডাক দিয়েছেন বলে ইউটিউবে ভিডিওবার্তা ছড়ানো হয়েছে। এর পর থেকে তা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। মূলধারার বিভিন্ন মিডিয়াও এ বিষয়ে সংবাদ প্রচার-প্রকাশ করছে। টকশো’র অন্যতম বিষয় হয় কথিত ওই অডিওবার্তা।
ইউটিউবে ‘ইসলামের আলো’ নামের একটি চ্যানেলে ১৭০টি ভিডিওর মধ্যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে দুটি ভিডিও রয়েছে। মূলত অডিওতে জাওয়াহিরির ছবি সংযুক্ত করে ভিডিওগুলো বানানো হয়। সেই সঙ্গে আরবি-ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা অনুবাদও যুক্ত করা হয়েছে। ওই দুটি ভিডিওতে কথিত জাওয়াহিরির বক্তব্য রয়েছে। আল-কায়েদা নেতা আইমান আল-জাওয়াহিরির নাম ও ছবিসহ অডিওবার্তায় বাংলাদেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্রের’ বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ারও আহ্বান জানানো হয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ায় পর থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ গোয়েন্দারা নড়েচড়ে বসেছেন। এই চ্যানেলটিতে রয়েছে ভিডিওগুলো http://www.youtube.com/user/islameralo
অডিওবার্তায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মুসলিম ভাইয়েরা, ইসলামের বিরুদ্ধে যারা ক্রুসেড ঘোষণা করেছে, তাদের প্রতিরোধ করার জন্য আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি। উপমহাদেশ ও পশ্চিমের শীর্ষ ক্রিমিনালরা ইসলামের বিরুদ্ধে, ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র করছে, মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, যাতে আপনাদের তারা অবিশ্বাসীদের দাসে পরিণত করতে পারে।
বার্তায় জাওয়াহিরি পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তিকে আরবিতে কথা বলতে শোনা যায়। পাশাপাশি ইংরেজি সাব-টাইটেলে দেখা যায় তার তর্জমা। বাংলাদেশকে ‘বিরাট এক জেলখানা’ হিসেবে তুলে ধরে এই বার্তায় বলা হয়, এই দেশে মুসলমানদের সম্মান আজ ভূলুণ্ঠিত।
তবে আলকায়েদা প্রধানের কথা বলা হলেও সরকার মনে করছে, দেশকে অস্থিতিশীল করার অংশ হিসেবে একটি চক্র এই কাজটি করছে। এর সঙ্গে তালেবান জঙ্গি, জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, নতুন আত্মপ্রকাশ হওয়া জঙ্গি সংগঠন দাওয়াহ্ ইল্লাল্ল, হিযবুত তাহরীরসহ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা এমন তথ্য দিয়ে আরো জানিয়েছেন, এ ধরনের অডিওবার্তায় অবাক হননি তারা। এর আগে একাধিক শীর্ষ জঙ্গি নেতার আল-কায়েদা কানেকশন মিলেছে। অনেক জঙ্গি আফগান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এমন প্রমাণও রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। কাজের কৌশল ও ধরন দেখে অনেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনে করছেন, ভাষান্তরের কাজটি ইসলামী ছাত্রশিবির করে থাকতে পারে।
র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সাংবাদিকদের বলেছেন, জামায়াতে ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম, হিযবুত তাহরীরের তৎপরতা আল-কায়েদার সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা। আল-কায়েদার জিহাদের হুমকি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটা তাদের পক্ষে স্বাভাবিক। তারা সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে একসঙ্গে কাজ করে। গত বছরের ৫ মে মতিঝিলে হেফাজতের তা-ব এরই অংশ। তিনি বলেন, প্রচারিত বার্তাটি সত্যিই আইমান আল-জাওয়াহিরির কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইসলামের আলো চ্যানেলটিতে ঢুকে দেখা গেছে, চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি ২৯ মিনিটের একটি অডিওবার্তা আপলোড করা হয়। এর আগে গত ১৩ ডিসেম্বর ২ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের আরেকটি অডিওবার্তায়ও অভিন্ন আহ্বান জানানো হয়। আল-কায়েদার নামে গতকাল শনিবার বিভিন্ন মাধ্যমে যে বার্তা প্রচার পেয়েছে তার শুরু হয়েছে গত বছরের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের তা-ব ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার তথ্য বিকৃত করে। এতে ইসলাম রক্ষার জন্য বাংলাদেশে জিহাদের ডাক দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর একই ধরনের হুঙ্কার জামায়াত-শিবিরও দিয়েছিল। এছাড়া হেফাজতের তৎপরতার পেছনে আছে ইসলামের শাসন কায়েমের নামে জিহাদের আহ্বান। আর হিযবুত তাহরীর তাদের প্রচারণায় সবসময়ই জিহাদের কথা বলে আসছে। এ প্রসঙ্গে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গে আল-কায়েদার সম্পর্ক পুরোনো। এখন তারা সন্ত্রাস করতে নতুন করে চক্রান্ত করছে।
অন্যদিকে অডিওবার্তা নিয়ে সমালোচনার মুখে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী গতকাল বিকেলে দাবি করেছেন, তাদের সঙ্গে আল-কায়েদার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র।
২৮ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ওই ক্লিপের প্রথম সোয়া দুই মিনিট গত বছর মে মাসে মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ এবং তাদের তুলে দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কিছু আলোকচিত্র দেখানো হয়েছে। এরপর শুরু হয়েছে জাওয়াহিরির বক্তব্য।
‘ম্যাসাকার বিহাইন্ড এ ওয়াল অব সাইলেন্স’ শিরোনামে ওই বার্তায় বলা হয়, মুসলমানদের ওপর একটি নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সত্য গোপন করছে। আর এই রক্ত ঝরছে বাংলাদেশে।
জাওয়াহিরির নামে প্রচারিত ওই বার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশ আজ এমন এক ষড়যন্ত্রের শিকার, যাতে ভারতীয় এজেন্ট, পাকিস্তানের দুর্নীতিগ্রস্ত সেনা নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী, বিশ্বাসঘাতক রাজনীতিবিদরাও জড়িত। আর উপমহাদেশের, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ‘মুসলিম উম্মাহ’ এই ষড়যন্ত্রের ‘মূল শিকার’ বলে বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
অডিওবার্তায় আরো বলা হয়, বাংলাদেশে ইসলামের মৌল বিশ্বাস ও রাসুলের (সাঃ) বিরুদ্ধে আজ যে অপরাধ ঘটানো হচ্ছে, তার বীজ বপন করেছে সেই ক্রিমিনালরাই। পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়া তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ঠেকানো বা পাকিস্তানি সামরিক শাসন থেকে মুক্তিÑ কোনোটাই এর মূল লক্ষ্য ছিল না। আসল লক্ষ্য ছিল এই উপমহাদেশে মুসলিম উম্মাহর ভিত্তি দুর্বল করা, মুসলমানদের বিশ্বাসকে ছিন্নভিন্ন করা, আঞ্চলিক বিভেদ আর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এর মৃত্যু ডেকে আনা। বার্তায় বলা হয়, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত ও আফগানিস্তানে আজ যা হচ্ছেÑ তা সেই ‘শয়তানি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নেরই প্রাথমিক পর্যায়।
এতে আরও বলা হয়, কাল যারা বাংলাদেশে হত্যাযজ্ঞ চালালো, আজ তারাই পাকিস্তানে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। একইভাবে বাঙালির সম্মান রক্ষার ধুয়া তুলে যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল, তারাই আজ বাঙালির বিশ্বাস, সম্মান, জীবন ও সম্পদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
কথিত জাওয়াহিরি বলেন, তারা দাবি করে ইসলাম ও এই উপমহাদেশের মুসলামনদের রক্ষায় ৬০ বছরের বেশি সময় আগে তারা পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল। আর আজ আমরা যে পাকিস্তান দেখি, সেখানে শরিয়ার কোনো স্থান নেই। একইভাবে তারা দাবি করে ৪০ বছর আগে তারা বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিল স্বাধীনতা এবং জনগণের মুক্তির জন্য। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশ আজ পরিণত হয়েছে বিরাট এক কারাগারে, যেখানে মুসলমানদের সম্মান ও পবিত্র স্থান অপবিত্র করা হচ্ছে।