বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Al Kayeda Threatমো. মাহমুদুল হাসান :: নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার বাংলাদেশে জেহাদের ডাকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক মহল ও বিশিষ্ট নাগরিকরা। তাদের দাবি, আল-কায়েদার সুযোগ্য উত্তরসূরি জামাত-হেফাজত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে এবং সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ মুক্ত দেশ গড়তে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ জামাত-শিবির ও হেফাজতকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করতে হবে। অকশ্য এই অডিওবার্তাকে হুমকি হিসেবে দেখছেন না ক্ষমতাসীনরা। তাদের মতে, এ ধরনের হুমকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি সরকারের রয়েছে। তবে এর সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

প্রসঙ্গত, এক অডিওবার্তায় বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধীদের প্রতিহতের ডাক দিয়েছে আল-কায়েদা। ‘বাংলাদেশ : ম্যাসাকার বিহাইন্ড এ ওয়্যার অব সাইলেন্স’ শীর্ষক ২৯ মিনিটের অডিও বার্তার শুরুতে ২০১৩ সালে ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজত ইসলামের সমাবেশের ওপর হামলায় স্থিরচিত্র দেখানো হয়। আল কায়দার নেতা আল-জাওয়াহিরি তার বক্তব্যে সরাসরি হেফাজতে ইসলাম বা জামাতে ইসলামের নাম উচ্চারণ করেননি; তবে বার্তাটির শুরুতে হেফাজতের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের স্থিরচিত্র দেখানো হয়। একই সঙ্গে বক্তৃতার একটি অংশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ট্রাইব্যুনাল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। আল কায়দা নেতা বাংলাদেশকে একটি জেলখানা অভিহিত করে বাংলাদেশ সরকারকে ইসলাম বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশিষ্টজনরা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আল-কায়েদার অর্থায়নে পরিচালিত জঙ্গি সংগঠন জামাতের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। তারা দেশে আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র করছে। ঐক্যবদ্ধভাবে এদের মোকাবেলা করতে হবে। নতুবা এদের নিষ্ঠুরতার মাশুল জাতিকেই দিতে হবে।

বিষয়টিকে উদ্বেগজনক আখ্যায়িত করে কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এর সত্যতা খুঁজে বের করতে হবে। সর্বশক্তি দিয়ে এদের প্রতিহত করতে হবে। নতুবা দেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃবৃন্দ গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে বলে, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ২০০৪ সাল থেকে অভিযোগ করে আসছে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী শক্তির অপতৎপরতা শুরু হয়েছে যা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত; যে গোষ্ঠীকে লালন-পালন করছে বিগত দিনের জামাত-বিএনপি জোট সরকার। সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী শক্তির আসল লক্ষ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে হটিয়ে দেশকে ধর্মভিত্তিক চরম সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করা। আল-কায়েদার বক্তব্যেই প্রমাণিত হয় তাদের সমর্থনপুষ্ট আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদী শক্তি জামাত, হেফাজত ও বিএনপি এক হয়ে আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। নতুন সরকার যখন দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিচ্ছে; সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দৃঢ়পদক্ষেপ নিচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে এই অডিওবার্তা প্রকাশ ও ধর্মের নামে

উসকানি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রেরই অংশ। ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করে, সরকারের পক্ষ থেকে অতিদ্রুত এই ষড়যন্ত্রের উৎস খুঁজে বের করা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ওই অপশক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, জামাত এদের গডমাদার। তালেবানদের সঙ্গে জামাতের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। জামাত নিষিদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া আল কায়েদা প্রধান জাওয়াহিরির প্রতিরোধের ডাকে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, বিএনপির এদের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, এই অডিওবার্তার সঙ্গে আমেরিকাও যুক্ত আছে। তারা বাংলাদেশকে আফগান-ইরাকে পরিণত করতে চায়। বিএনপি-জামাতকে ক্ষমতায় এনে ইন্ডিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে লড়তে বাংলাদেশকে ঘাঁটি করতে চায়। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র চলছে। সরকারকে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

আল-কায়েদার এই অডিওবার্তা শুধু দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্যই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মন্তব্য করেছেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, এটি আমদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত। বিশ্ব সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে এদের মোকাবেলা করতে হবে। তিনি বলেন, এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। আমরা গত ২০ বছর ধরে এদের বিরুদ্ধে কাজ করছি। আল-কায়েদার উত্তরসূরি জামাত-হেফাজত। আমাদের প্রধান কাজ হবে কালক্ষেপণ না করে জামাত-শিবির-হেফাজত নিষিদ্ধ করা এবং এদের মূল উপড়ে ফেলা। নতুবা দেশে জঙ্গিবাদের চাষ হবে, মৌলবাদ বাড়বে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের অডিওবার্তা খুবই আশ্চর্যজনক ঘটনা। তবে এটি কতোখানি যথার্থ তা খতিয়ে দেখতে হবে। অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। দেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। সরকারের উচিত হবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

এ বিষয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন বলেন, এটি বিশাল উদ্বেগের কারণ। সরকার জনবিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা সুযোগ পায়। মুক্তিযুদ্ধের কতোগুলো মূল মন্ত্র ছিল। এগুলো উপেক্ষার কারণে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হবে।

আল-কায়েদার অডিওবার্তাটি দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবেই দেখছেন গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার। তিনি বলেন, জামাত-হেফাজত-আল কায়েদা একই সূত্রে গাথা। এদের অর্থের উৎসও একই। এদের নিষিদ্ধ করার দাবিতে তরুণ প্রজন্ম আন্দোলন করছে। জাওয়াহিরির বক্তব্যের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে। কালক্ষেপণ না করে এদের মূলোৎপাটন করতে হবে। এরা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

তবে অডিওবার্তাকে হুমকি মনে করেন না সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এই ধরনের হুমকি মোকাবেলার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে মন্তব্য করে আসাদুজ্জামান বলেন, যে সব দেশে এই ধরনের ঘটনা (আল কায়দার তৎপরতা) ঘটেছে, সেখানে স্থানীয়রা এতে ইন্ধন দেয়। কিন্তু আমাদের জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। এদেশের মানুষ জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, আল-কায়দা চায় না। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, শিগগিরই তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। বাংলাদেশকে হুমকির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, কোথা থেকে-কিভাবে এই অডিওবার্তা এসেছে, পুরো বিষয়টি সরকার খতিয়ে দেখছে। সন্ত্রাস দমনে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কাজ করে যাওয়ার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, আল-কায়েদার প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরির অডিওবার্তার সঙ্গে জড়িত সব বিষয় আমাদের নজরে আছে। জাওয়াহিরির অডিওবার্তার উদ্দেশ্য কী হতে পারেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অডিওবার্তার সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর ভূমিকা সবকিছু নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

এদিকে বিএনপি-জামাত ও আল-কায়েদার সুর অভিন্ন বলে মন্তব্য করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি-জামাত ও আল-কায়েদা একই সুরে কথা বলছে। আল-কায়েদা প্রধান আইমান আল জাওয়াহিরি গতকাল গণমাধ্যমে দেয়া এক অডিওবার্তায় বলেছেন, বাংলাদেশকে বর্তমান সরকার কারাগারে পরিণত করেছে। সাম্প্রতিক সময় ১৯ দলের নেতারাও আল-কায়েদার মতো একই সুরে কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, বিএনপি-জামাত দেশের স্বার্থরক্ষা করছে না। তারা পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষা করছে। তাদের এ ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে।

আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরির হুমকির পেছনে খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের ম“ রয়েছে বলে দাবি করেছে ছাত্রলীগ। গতকাল রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সমাবেশে সংগঠনের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, দেশীয় ষড়যন্ত্রে ব্যর্থ হয়ে বিদেশী জঙ্গিদের সহায়তায় খালেদা জিয়া ও তার সন্তান তারেক রহমান দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আল কায়েদাকে ভাড়া করে অডিওবার্তা দিয়েছে। এ বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন থাকার আহ্বানও জানান তিনি।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »