তাঁদের কি হৃদয় বলতে কিছু নেই !

লাকি বেগম :: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, পৃথিবীর এক দেশ আরেক দেশের তত কাছাকাছি হচ্ছে। পূর্বে দিল্লী বহুদুর ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে দিল্লী এখন কাছের শহর । বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বহু মানুষ দিল্লীর চেয়েও দূরে তামিলনাড়– প্রদেশের ভ্যালোরে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে বর্তমানে বাঙালিরা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পৌছে গেছে। আমিও উন্নত জীবনের আশায় পরিবার-পরিজন নিয়ে নরওয়ের  ওসলো’তে বসবাস করছি। কিন্তু হাজার হাজার মাইল দুরে অবস্থান করলেও বাংলাদেশকে ভুলতে পারিনা । কারণ বাংলাদেশ শুধু আমার জন্মস্থানই নয়, সেখানকার সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশেই আমি বেড়ে উঠেছি। টিভিতে যখন দেখি আগুনে যানবাহনগুলো দাউ- দাউ করে জ্বলছে, পেট্রোল বোমায় অগ্নিদগ্ধ মানুষেরা হাসপাাতলে কাতরাচ্ছে, সামান্য ৫-৬ হাজার টাকার লোভে শিশুকে খুন করছে, তখন মনটা হাহাকার করে উঠে। বিবেক-যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতে পারিনা। দেশ পরিচালনার জন্য সরকার রযেছে, ভুল-ক্রটি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বিরোধী দলও রয়েছে। মর্মান্তিক ঘটনাগুলো দেখে কি তাদের এতটুকু মন কাঁদে না! রাজনীতি তো মানুষেরই কল্যাণের জন্য।

পত্রিকা সূত্রে জানা গেছে, সরকার বিরোধী আন্দোলনের সময় আগুনে দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে ২১২ জন মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ২৩ জন । তাদের অধিকাংশই গরীব মানুষ। অন্যান্য ঘটনায়  মারা গেছেন আরও  শতাধিক মানুষ। প্রায় ১০ হাজার বৃক্ষ কর্তন করা হয়েছে। প্রায় ১ হাজার যানবা নে আগুন দেওয়া হয়েছে। ঘটনাগুলো দেখে নেতা-নেত্রীদের মনে দাগ কেটেছে কি না সন্দেহ রয়েছে। বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধদের দেখতে বিরোধী দলীয় নেত্রী যাননি। প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন বিবেকের তাড়নায় নয়, রাজনীতির প্রয়োজনে। অন্যান্য রাজনীতির, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের বিরুদ্ধে ত্রকই অভিযোগ করা যায়।

প্রায় ৪ বছর আগের একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। জতিসংঘ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট টেড টার্নার বাংলাদেশে সফরে গিয়েছিলেন। তাঁর সফর সঙ্গী ছিলেন নরওয়ের ত্রক সাবেক প্রধানমন্ত্রী (নামটি মনে করতে পারছিনা বলে দুঃখিত)। তাঁরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীর সঙ্গে কথা বলেন না ত্রবং দেশের সমস্যা নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে মতবিনিময় করেন না, তা জানতে পেয়ে খুবই বিস্মিত হন। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন-‘এ জাতীয় ঘটনা নরওয়েতে আড়াইশ বছর পূর্বে ছিল।’ তিনি যথার্থই বলেছেন; কিন্তু নরওয়েকে বাংলাদেশের মতো দীর্ঘকাল বিদেশীদের অধীনে থাকতে হয়নি- একথা তিনি বলেন নি । সকলে স্বীকার করবেন, বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে ঔপনিবেশিকতা দুর হচ্ছে না কেবল দীর্ঘদিনের বিদেশী শাসনের ঐতিহ্যের কারণে । আমার ধারণা, একই কারণে সরকারি দল ও বিরোধী দল কেউই প্রকৃত অভিভাবকের ন্যায় আচারণ করতে পারছে না । আমরা দেখলাম, বিরোধী দলীয় নেত্রী বার বার বিদেশী কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং তাদের সমর্থন কামনা করে বিবৃতি দিচ্ছেন। সরকারও ভোটার বিহীন নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে বিদেশী শক্তির স্বীকৃতি আদায় করে সেটি বারবার প্রচার করছেন। উভয় দলই এখন জনগণকে ক্ষমতার মালিক মনে করছেন না । সব দেখে জনৈক কলাম লেখক আক্ষেপ করে বলেছেন- ‘অন্ধ হলেই সুখে থাকতাম ।’ এর উত্তরে আরেকজন বলেছেন- ‘শুধু অন্ধ হলেই হবে না, বধিরও হতে হবে।’ যা হোক, ওসব হতাশার কথা। আামদের নেতা-নেত্রীদের মনে রাখতে হবে, দেশের সমস্যা তাদেরকেই সমাধান করতে হবে,  বিদেশীরা করে দেবে না । বিদেশীরা তাদের দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্যই বাংলাদেশে আছেন। তাছাড়া, তাঁরা তো তাঁদের দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশের কারোর কাছে অভিযোগ করছেন না।
লেখক : নরওয়েপ্রবাসী