বার্তাবাংলা ডেস্ক »

COP 19 logoমো. মাহমুদুল হাসান, ওয়ারশো (পোল্যান্ড) থেকে :: মধ্য ইউরোপের পোল্যান্ডে এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-১৯) শুরু থেকেই ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ নিয়ে ধনী-দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে তুমুল বাগবিতণ্ডা চলছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এবারের সম্মেলনের প্রথম থেকেই ধনী রাষ্ট্রগুলো অর্থাৎ যারা কার্বন নিঃসরণ বেশি করে তাদের ওপর দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর চাপ অব্যাহত রয়েছে। তবে উন্নত দেশগুলো ‘লস এন্ড ড্যামেজে’র বিষয়ে একেবারেই নারাজ। তাদের বক্তব্য, ক্ষয়ক্ষতিকে (লস এন্ড ড্যামারেজ) অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশন ফান্ডের মধ্যে ফেলে দিতে হবে। এ নিয়ে নতুন কোনো তহবিল গঠনের কোনো প্রযোজন নেই বলেও দাবি ধনী দেশগুলোর। তবে এ ধরনের ‘অবান্তর’ প্রস্তাব মানতে নারাজ গরিব দেশগুলো। আর এ নিয়েই চলছে দেনদরবার আর বাগবিত-া।  দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এর আগের সম্মেলনগুলোতে ধনী দেশগুলো যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবারের সম্মেলনে সেগুলো পূরণ করতে হবে। এ জন্য লস অ্যান্ড ড্যামেজের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে লস অ্যান্ড ড্যামেজের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিশ্রুতির কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর গ্লোবাল চেঞ্জ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, এবারের সম্মেলনে হঠাৎ করেই যে অনেককিছুর প্রাপ্তি ঘটবে তেমনটা আশা করছি না। তবে এখন হতাশার খবর হচ্ছে লস অ্যান্ড ড্যামেজ ইস্যুতে ধনী দেশগুলো বলছে, এটা অভিযোজনের সঙ্গে যুক্ত করতে। অর্থাৎ এই খাতে আলাদাভাবে তহবিল করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহযোগিতা না করে অভিযোজন থেকে করতে হবে। তিনি বলেন, এটা যদি হয় তাহলে এবারের সম্মেলনের ফলাফল শুধু শূন্যই নয়, বরং উল্টো যাত্রা বা পেছনের দিকে হাঁটার মতো অবস্থা হবে। গত দুই বছর ধরে যে সংগ্রাম চলছে সেটি একেবারেই শেষ হযে যাবে। মোট ১১দিন যে সম্মেলন চলবে তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই শেষ। তবে বিভিন্ন জোটের নেতারা এখন পর্যন্ত কোনো আশার আলো দেখছেন না। বৈশ্বিক উঞ্চতা কমাতে করণীয় ও জলবায়ু তহবিল নিয়ে আলোচনার চেয়ে এবারের সম্মেলনে পাল্টাপাল্টিই হচ্ছে বেশি। শিল্পোন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো পরস্পরবিরোধী বির্তকে জড়িয়ে পড়ছে। সম্মেলনে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট অ্যানেক্স-১, উদীয়মান অর্থনীতির জোট বেসিক, স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোট এলডিসি, ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জোট এওসিস ও আফ্রিকান ইউনিয়নের সম্মিলিত জোটের নেতারা পোল্যান্ডে কোনো আশার আলো দেখছেন না। জোটগুলো নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি ক্রিস্টিনা ফিগুইরাস বলেছেন, অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ে এখনও পর্যন্ত রশি টানাটানি চলছে। ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড পরিচালনার তহবিল কীভাবে সংগৃহীত হবে তাও পরিষ্কার নয়। এছাড়াও অভিযোজন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, আগামী তিন বছর অভিযোজনের পরিকল্পনা, কীভাবে অর্থায়ন হবে, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে অর্থায়ন, অ্যাডাপটেশন ফান্ড বোর্ড গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।  জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির শিকার দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, লস অ্যান্ড  ড্যামেজের জন্য গত দু বছর ধরে যে যুদ্ধ চলে আসছে তা এবার নেতিবাচক দিকে ধাবমান। উন্নত দেশগুলোর ‘গোয়ার্তুমি’র কারণে সেটি এবার একেবারে পেছনের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান সম্মেলনে (কপ-১৭) প্রথম লস অ্যান্ড ড্যামেজের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো দাবি তুলেছিলো। সেখান থেকেই এ বিষয়ে একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া এ ব্যাপারে তৈরি করা হয় একটি গাইডলাইন। পাশাপাশি তৈরি করা হয় একটি ওয়ার্কিং গ্রুপও। গত বছর কাতারের দোহাতে অনুষ্ঠিত কপ-১৮-এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। তখনও ধনী দেশগুলো এবিষয়টিকে অভিযোজনের সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোর প্রতিবাদের কারণে তারা পিছু হটে। দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো এবার আশা করেছিল লস অ্যান্ড ড্যামেজের বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাবে। কিন্তু এবারের সম্মেলনের শুরু থেকেই এ বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে ধনী ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »