বাংলাদেশিদের জন্য জাতিসংঘের (অ)সাধারণ অধিবেশন!

অহিদুল ইসলাম :: ১৯৭৪ সালের ১০ই জুন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সিকিউরিটি কাউন্সিলের রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্যপদ দেয়ার বিষয়ে সম্মতি হয়। ওই বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর সদস্য হয় বাংলাদেশ। আর ২৫শে সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন। স্বাধীন দেশের স্বীকৃতির সদস্য পদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান। তখন সাড়া দুনিয়ার চোখ ছিল রক্তস্নাত বাংলাদেশের দিকে, নজর ছিল রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধুর উপর।
এরপর জাতিসংঘে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ খু্ব একটা গুরুত্বর্পূণ হয়ে ওঠেনি। আগের বছরগুলোতে  বাংলাদেশ সরকার প্রধানের অংশ নেয়া, না নেয়া নিয়ে তেমন কোনো পার্থক্য বয়ে আনেনি। তবে এবার আওয়ামী লীগ দায়িত্ব নেয়ার পর সল্প উন্নত দেশ বা এলডিসির নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশ, জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন, এমডিজির সাফল্য, বাস্তব অর্থে সন্ত্রাস বিরোধী অবস্থান নেয়ার কারণে অন্তর্জাতিক সম্মেলন গুলোতে এক ধরণের গুরুত্বপায় শেখ হাসিনা।
এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক ওই সব আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সংবাদ কভার করেছে। তাই আমরা জানতে পেরেছি ,বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশের সরকার প্রধানের কদরের কথা। বর্তমান সরকারের সময় সব কয়টি বিদেশ সফরই বাংলাদেশের মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম, কোনো বির্তক ছাড়া, শুধু সফলতার কথা আমাদের জানিয়েছে। কিংবা হতে পারে গুরুত্ব আগের মতোই আছে, মিডিয়ার জন্য আমরা জানতে পারছি, ভাবছি গুরুত্ব বেড়েছে।
তবে এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের আগেই সিরিয়া ও ইরান নিয়ে কি সিদ্ধান্ত আসবে, তা সাজাতে ব্যস্ত ছিল ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া। আর বাংলাদেশে বির্তক ওঠে শেখ হাসিনার অধিবেশনে যোগ না দেয়ার ঘোষণা নিয়ে। টক শোতে বিরোধী দলসহ সমালোচকরা বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরীর চিঠি ও জাতিসংঘ মহাসচিব বানকি মুনের ফোনালাপের কোনো উত্তর নেই শেখ হাসিনার কাছে। তাই কোন মুখে যাবেন তিনি? মার্কিন মুল্লুকে? জবাব আসে জাতীয় সংসদ অধিবেশন ও দেশে রাজনৈতিক সমাবেশের জন্য যাবেন না। শেখ হাসিনা কেন, বিশ্বের অনেক দেশের সরকার প্রধানই যোগ দেন না জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে, পাঠিয়ে দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে। সর্বাধিক সময় আকাশে থাকার রেকর্ডধারী আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে আমরা এবার পাঠিয়ে দেবো।
তবে পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারী আবুল কালাম আজাদ আমাকে জানান, জাতিসংঘে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দারিদ্রের হার কমানোসহ নানা বিষয়ে উন্নতি করেছে বাংলাদেশ তা তুলে ধরতেই যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। আমি স্কল দিয়ে দেই ব্রেকিং নিউজ। স্বস্তি নেমে আসে মার্কিন ভিসা পাওয়া সাংবাদিক ও প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গীদের মনে। তত:পর যাত্রা, সরকারী খরচে সফর সঙ্গী ১৪০ জন। আর নিজ বা অফিসের খরচে যাওয়া সাংবাদিকের সংখ্যাও প্রায় শতাধিক।যা অন্য যে কোনো বছরের চেয়ে বেশি। পত্রিকা ও অনলাইনে খবর হয়। প্রথম আলোতে কলামও লিখে ফেলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। তার অশংকা আগামীতে এই সংখ্যা আরো বাড়বে, কমবে না। আর অপচয় হতে থাকবে দেশের টাকা।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনী, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস ইউং, পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, সিনিয়র সাংবাদিক, বিশিষ্টজন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, ছাত্রলীগের নেতারা যোগ দেন সম্মেলনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে খবর আসে প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গীরা ঘুরে-ফিরে, আত্মীয় বন্ধুদের সাথে দেখা করেছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মাত্র ১০জন মানুষ অধিবেশন কক্ষে যাওয়ার পাস পাবেন। তাই সফর সঙ্গীরা কেউ কেউ শপিং করছেন। একজন নেতাকে নিউ ইয়র্কে বাঙ্গালী ট্যাক্সি ক্যাব চালক সুটকেস কিনে দিয়েছেন। শপিং আনার জন্য। এ সবই প্রথম আলোর খবর।
আর সাংবাদিক বন্ধু, সিনিয়র সাংবাদিক ও বড় ভাইদের শেয়ার করা ছবিতে, আমাদের ফেসবুকের পেজ ভরে ওঠে আলো জলমলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছবিতে। আমরা দেখি আর লাইক দেই। তবে সজিব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক পেজে থেকে জানতে পরি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ফাস্ট লেডি মিশেল ওবামার সাথে ঘরোয়া পরিবেশে কথা বলেছেন শেখ হাসিনা ও তার ছেলে জয়। পরে খরব আসে, মার্কিন মুল্লুকের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠের ছাত্র জয় সম্পর্কে প্রসংশা করে বারাক ওবামা, শেখ হাসিনাকে বলেছেন, “ইউর সান ইজ ভেরী স্মর্ট”। বাংলাদেশের আগামী দিনের তরুণ রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে, ইশ্বরের পরে শক্তিশালী ব্যক্তির এমন প্রসংশা আমাদের ভাল লাগে। (বিরোধী শিবির থেকেও এ নিয়ে সমালোচনা হয়নি)
লম্বা সময় সাধারণ অধিবেশনে থেকে, একটু স্বস্তির নি:শ্বাস পেতে প্রধানমন্ত্রী পাশের নদীর তীরে চলে যান। সেখানে পরিবারের সদস্যসহ সবার সাথে ছবি তোলেন। একটি কল অন  শেষে প্রধানমন্ত্রী হেটেই রাস্তা পার হন প্রধানমন্ত্রী। এমন টুকরো বিষয়গুলোও সংবাদ মাধ্যমের চোখ এড়ায়নি। আমরাও জানতে পারি সে সব। যেমন এড়ায়নি বারাক ওবামা ও বানকি মুনের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর বসার আসন, সে তথ্যও।
তবে সব ছাপিয়ে আসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের কপি রাস্তায় পড়ে থাকার ঘটনাটি। এতো এতো লটবহর নিয়ে গেলেন, তবুও ভাষণের কপি পড়ে রইল রাস্তায়, বোমা সন্দেহে আটক করলো এফবিআই। ঘ্রাণ শুকে মার্কিন কুকুর জানিয়ে দেয়, কেমিক্যাল আছে বাক্সে। কারণ বাংলাদেশ থেকে প্রিন্ট হয়ে যাওয়া কাগজে কমিক্যালের উপস্থিতি থাকতেই পারে। ডেনজার জোন হিসেবে এলাকাটি সিলগালা করে ফেলে এফবিআই। পরে এফবিআইতে কর্মরত বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের কল্যাণে ভুল স্বীকার করে কপি পাওয়া যায়। বাংলা নিউজ জানিয়েছে, আশংকা এমন তৈরী হয়েছিল যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দেয়াও নাকি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যেতে পারতো।
তবে এই অধিবেশনে বাংলাদেশের অর্জনকে খাটো করে দেখা যাবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সাথে স্বাক্ষাত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের প্রধান মনমোহন সিং এর সাথে বৈঠকে তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কথা বলেছেন। চুক্তি দুইটি আলোর মুখ দেখবে এমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। তবুও উদ্বেগ প্রকাশ করা তো গেছে।
দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমানোর স্বীকৃতি হিসেবে দ্বিতীয় বার সাউথ সাউথ এ্যা্ওয়ার্ড পেল বাংলাদেশ। এটাও কম নয়। সল্প উন্নত দেশ গুলোর মধ্যে বাংলাদেশই এমডিজি অর্জনে সব চেয়ে এগিয়ে আছে। এসব স্বীকৃতি কম নয়। তাই ২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে পরতে পারছে বাংলাদেশ।নেতৃত্ব দেবে তাতে। অন্যরা জানবে পৃথিবীর সব চেয়ে মাথা পিছু কম জমির দেশ কিভাবে খাদ্যে স্বয়ং সম্পন্ন হয়, দরিদ্র মানের সংখ্যা কমে যায়, কিভাবে নারী ও মাতৃ মৃত্যুর হার কমায়। আমরা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য উন্নয়নের উদাহরণ।
তেতুল হুজুরদের হুমকী ধামকীর মুখেও নারী শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকার কারণে এক সেমিনারে বাংলাদেশ প্রসংশিত হয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শান্তির জন্য, অস্ত্র না কিনা বই, আর সেনা না পাঠিয়ে শিক্ষক পাঠাতে বলেছেন যুদ্ধবাজ দেশগুলোকে। এটাও কম নয়। এতো ভাল খবরের মধ্যে বিতর্কও পিছু ছাড়েনি।
সরকারী টাকায় ভ্রমন করা এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে গিয়ে গোপন ক্যমেরায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ধারণ করেছেন, তার টেপ জব্দ করা হয়েছে, এমন খবর আসে অন লাইন মিডিয়ায়। প্রথম আলোর মতো পত্রিকা “নারী সাংবাদিকের কান্ড” বলে খবরটি প্রকাশ করে। তবে রাতে একাত্তর টেলিভিশনের জার্নাল এ মু্ন্নি সাহা ও প্রথম আলোর সাংবাদিকের বক্তব্য কিছুটা পরিস্কার হওয়া  যায়। অন্তত গোপনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য কেউ ধারণের চেষ্টা করেনি। বরং অনুষ্ঠানিক ইন্টারভিউ নিয়েছেন মুন্নী সাহা। তবে প্রধানমন্ত্রীর অফিস চায়নি বক্তব্যটি ওই দিনই প্রচার পাক। কারণ আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাপা পড়ে যেতে পারে। তাই মুন্নি সাহা জানিয়েছেন, তার রেকডিং করা টেপটি প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর কাছে গচ্ছিত রেখে এসেছেন। তবে এখনো পুরো বিষয়টি পরিস্কার নয়, কোনো সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর ইন্টারভিউ সাধে অন্য কারো কাছে রেখে আসবেন, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। ধোয়াশা কাটেনি।
আরো যে সব কারণে অসাধারণ মনে হতে পারে এই সাধারণ অধিবেশন কারণ এটিই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলতি মেয়াদে জাতিসংঘের শেষ সাধারণ অধিবেশনে যোগদান। এই মেয়াদে, শেষ বাংলায় ভাষণ, এই মেয়াদে, শেষ বার বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
অহিদুল ইসলামরিপোর্টার : একাত্তর টেলিভিশন