মালালা পশ্চিমাদের ঢাল?

অহিদুল ইসলাম :: মালালা ইউসুফ জাই। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে এক পরিচিত নাম সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে। কেন এই কিশোরীকে নিয়ে এতো প্রচারণা? কেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন পর্যন্ত তাকে নিযে এতোটা উদ্বিগ্ন? কেন এমন অনেক ঘটনা বাদ দিয়ে মালালাকে নিয়ে উতালা হয়ে পড়লেন তাবৎ দুনিয়ার মাথাওয়ালা মানুষগুলো?
মালালা তালেবান নিয়ন্ত্রিত এবং পাকিস্তানের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সোয়াত উপত্যকার মেয়ে। স্কুল থেকে বাড়ীফেরার পথে তালেবনাদের হাতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। সে মেয়েদের পড়া লেখার বিষয়ে আগ্রহী করতে প্রচারণা চালাচ্ছিল তার ব্লগের মাধ্যমে। সেজন্য মালালার প্রচারনাগুলো তালেবান নীতির বিরোধীও ছিল। এ জন্যই জঙ্গী এই গোষ্ঠীটি তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে ছিল। স্থানীয় একটি রেডিওতে তার ব্লগ নিয়মিত প্রচারিত হত। তবে তালিবানদের জানা ছিল না কার লেখা প্রচারিত হচ্ছে। তাদের ভ্রান্ত নীতি ও আদর্শের বিরুদ্ধে কে সাহস করে দাড়িয়েছে ওই উপত্যকায়। তেমন এক সময়ে পশ্চিমা কয়েকটি গণমাধ্যম মালালাকে খুঁজে বের করে। তার ইন্টাভিউ প্রচার করে। তখনই কিশোরী মেয়েটি জীবন তালেবানের হুমকীর মুখে পড়ে। তবে পশ্চিমাদের প্রচেষ্টা ছিল তাকে সাড়িয়ে তোলার। তারা করেছেনও। কিন্তু এটা কি শুধু একজন মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য তাঁরা করেছেন? নাকি মালালাকে তাদের প্রয়োজন ছিল?
আমি তালিবানদের ঘৃণ্য কর্মকান্ডের পক্ষ নিয়ে কথা বলছি না। আমি মামালার প্রচারিত মৌলিক মানবাধিকার ও নারী শিক্ষার বিরুদ্ধেও নই। আমি বিষয়টিকে আরো গভীরে গিয়ে দেখতে ও দেখাতে চাই।
কেন পশ্চিমা সরকার আর গণমাধ্যমে তাকেই বেঁছে নিল? আরো অনেকের কথা কেন তারা বলছে না? মালালা সাথে আরো দুইটি মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। (Shazia Ramzan and Kainat Riaz ) সাজিয়া রমজান ও কায়ানাৎ রিয়াজ একই ভ্যানে করে বাড়ি ফিরছিলেন। পশ্চিমা মিডিয়া ও সরকারগুলো তাদের খোঁজ নেয়নি।
আমরা কতবার পশ্চিমা নেতা ও গণমাধ্যমের মুখে শুনেছি আবির কাছিম হামজা আল জায়নাবীর নাম? (Abeer Qassim Hamza al-Janabi ) ভুলে গেছেন তো? কে এই মেয়ে? সে ইরাকে ১৪ বছরের কিশোরী ছিল।পাঁচ মার্কিন সেনা তাকে ধর্ষণ করে।ঘটনা ধামাচাপা দিতে মার্কিন সেনারা জায়নাবীসহ তাঁর পরিবারের সদস্যকে খুন করে। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি জায়নাবীর ৬ বছরের শিশু বোনও। আমরা কতবার শুনেছি পশ্চিমা গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদের মুখে তার নাম? জাতিসংঘ কি তার কথা বলেছে কখনো? আমরা জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখে কতবার শুনেছি সেই ঘটনার কথা? তারা সবাই বেমালুম ভুলে যেতে পেরেছেন সে সব কথা।
মালালা শিশুদের মৌলিক মানবাধিকার ও শিক্ষার কথা বলেছেন, সেটাতো সিরিয়ার শিশুদের ক্ষেত্রও প্রযোজ্য। সিরিয়ায় প্রায় ২০ লাখ শিশু যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। আড়াই বছর ধরে চলা সরকার বিরোধী যুদ্ধে তাদের শিশুরা পড়া-লেখা, বিনোদন থেকে দূরে রয়েছেন। একটা হিংসা আর বিদ্বেষপূর্ণ পরিবেশে মধ্যে বড় হচ্ছে তারা। তাদের জীবন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। এই শিশুদের পড়া লেখার প্রয়োজন নেই?
সিরিয়ার যুদ্ধ থামাতে আগ্রহী নয় পশ্চিমা সরকারগুলো। বরং তারা বিদ্রোহীদের সাহায্য দেয়ার বিষয়ে বেশি মনোযোগী। বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও শক্তি সরবরাহের বিষয়ে পশ্চিমা সরকারগুলো আলাপ আলোচনা করছে। মানে আরো যুদ্ধ চলুক। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাংবাদিক রবার্ট ফিক্সের আশংকা, “পশ্চিমারা অস্ত্র সরবরাহ করলে তা জঙ্গিদের হাতে গিয়ে পড়বে। আফগানস্তানের তালিবানদের মতো আরো একটি জঙ্গী সংগঠন গড়ে উঠতে পারে সিরিয়ায়। কারণ সোভিয়েত বিরোধী লড়াইয়ের জন্য মার্কিনীদের দেয়া অস্ত্রে তালিবান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল”।
শিশু শিক্ষা যদি তাদের এতোই মায়া কান্না! তাহলে তারা কেন সিরিয়ার শিশুদের কথা ভাবছেন না? কেন কথা বলছেন না শিক্ষা ও আনন্দহীন এবং অন্ধকার পরিবেশে যু্দ্ধের মধ্যে বেড়ে উঠা শিশুদের বিষয়ে? আফগান ও ইরাকের যুদ্ধের মধ্য বড় হওয়া শিশুদের কথা কি বলবো? অঙ্গ হারিয়ে ভিক্ষার থলি নিয়ে বসা শিশুদের খোঁজ নিয়েছে জাতিসংঘ। তাদের কথা তুলে আনছে পশ্চিমা মিডিয়া?
আমি মালালার শিক্ষা প্রচারের বিপক্ষে নই মোটেও। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া ও সরকার মালালাকে প্রচারের মাধ্যমে বলতে চায়, দেখ সেখানে তালেবান আছে, আর তারা মেয়েদের পড়া লেখায় বাঁধা দিচ্ছে। এই সুযোগে তারা ড্রোন হামলার মতো পাপকে বৈধ করে নিতে চায়। তারা মামালাকে প্রচার করে ইরাক, আফগানে তাদের বোমাবাজি, দখলদারিত্বকে বৈধ করতে চায়। লুকাতে চায় তাদের নিরাপরাধ মানুষ হত্যার আপরাধ।
কিন্তু পাকিস্তানে ড্রোন হামলায় কত বেসামরিক মানুষ মারা যাচ্ছে? কত শিশু তাদের নিরাপরাধ বাবা-মাকে হারাচ্ছে? তাদের আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে নির্মমতার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে? তার খবর নেয় না পশ্চিমা সরকার আর গণমাধ্যম।সেখানকার শিশুটি যখন বড় হবে। জানবে পশ্চিমাদের নির্মম গোলা তাঁর আপনজনকে হত্যা করেছে। তাকে কি সহজেই প্রতিশোধ পরায়ন করে তোলা যাবে না?
আর তথাকথিত সভ্য পশ্চিমারা যুদ্ধের ঢাল হিসেবে কিন্তু নারীকেই ব্যবহার করতে ওস্তাদ।তাদের এ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ন্যাটো বাহিনিকে উৎসাহ যোগাচ্ছে যে, “তাদের অগ্রগতি ধরে রাখতে হবে”। নিউইয়র্কে ন্যাটো সামিট উপলক্ষে (poster campaign ) পোস্টার তারা বের করেছে। এখানে নারীদের আগ্রগতির কথা বলে তারা যুদ্ধের বৈধতার সনদ বিক্রি করছে।
পাকিস্তানের দুই সংবাদিক বন্ধু আমাকে বলেছেন, “আমাদের মূল সমস্যা তালেবান নয়, মার্কিনীদের ড্রোন হামলা। এতে মার্কিন আর প্রগতি বিরোধী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে পাকিস্তানে। ড্রোনে যত না জঙ্গি মারা যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি মানুষ তালেবানদের পক্ষে কথা বলা শুরু করেছে”।
কারণ কোনো মানুষ তার দেশে হামলা হোক চায় না, সেটা যে কারণেই হোক। আর তাতে যদি সাধারণ মানুষ মারা যায় ক্ষোভ বাড়াটাতো স্বাভাবিক। নাকি?
লেখক: রিপোর্টার, একাত্তর টেলিভিশন