পারিবারিক সহিংসতা : বন্ধ হোক প্রতিটি ঘরে

আরিফুর রহমান ::
প্রাককথন
————————-
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নারীর ক্ষমতায়নের ইতিবাচক চিত্র আজ সর্বজন স্বীকৃত। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র (প্রাক্তন), পররাষ্ট্র, কৃষিসহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে নারীর আধিক্য এবং অংশগ্রহণ অন্যান্য সময়ের চাইতে বেশি পরিলতি হচ্ছে। মহান জাতীয় সংসদের স্পীকার, সংসদের উপনেতা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী হওয়া সত্ত্বেও নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, নির্যাতন, সহিংসতা, ধর্ষণ-পরবর্র্তী খুন, যৌতুকের বলি, রাস্তাঘাট-স্কুল-কলেজে ইভটিজিংয়ের শিকার, উত্ত্যক্ততা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া আজ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় রুপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীরাও রেহাই পাচ্ছে না। যতই দিন যাচ্ছে এই নির্যাতনের মাত্রা এবং রুপের পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের প্রোপট ও পরিস্থিতি
—————————-
নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য বিশ্বব্যাপি নানা দিবস উদযাপন করা হয়। এরপরও নারী নির্যাতন কিংবা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কমছে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিগত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দশ মাসে প্রায় ৫ হাজার ৮৩৯ জন নারী ৩৩ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো চরম মানবতাবিরোধী ঘটনাও চয়েছে। যৌতুকের জন্য হত্যার মতো নিষ্ঠুর ঘটনাও সেই তালিকায় বিদ্যমান। লোকলজ্জা ও হুমকির ভয়ে আমাদের সমাজে ধর্ষণের ঘটনাসহ নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনাই থেকে যায় লোকচুর আড়ালে। তথাপিও ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ১,৬৪৫টি, ১,৯৪৫টি, ৩,১৩১টি, ৫,৭৯২টি, ৫,৬১৮টি, ৫,৯০৮টি, ৬,৯২২টি এবং ৬,০৫৪টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সর্বস্তরের করণীয়
——————————-
বিগত সময়ের সকল নারী নির্যাতনের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে প্রতিয়মান হয় যে, সকল নির্যাতনের ঘটনায় পুরুষের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে বেশি। তাই একথা সহজেই অনুমেয় যে, এই নির্যাতন বন্ধে পুরুষদেরই নিতে হবে অগ্রগণ্য ভূমিকা।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুরুষেরা যেসকল ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে তা নিন্মে আলোচনা করা হলো:
>>   নারীর প্রতি সকল প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।
>>   নারীদের সহযোগি ভাবা, বন্ধু ভাবা
>>   নারীর প্রতি পুরুষের আচরণ, চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন করা
>>    ধর্মীয় গোঁড়ামী ও ভূল ধারণা দূর করা,
>>   নারী বিষয়ক আইন ও সনদের প্রচার ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা
>>    নারী নির্যাতনকারীকে সামাজিকভাবে বয়কট করা
>>    সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করা
>>    পাঠ্যপুস্তকে নারী বিষয়ক রচনার অন্তর্ভূক্তি
>>    ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা
>>    জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণিত বিভিন্ন নীতিমালার প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন
>>    প্রতিবন্ধী নারীদের সমান সুযোগ দেওয়া
>>    আইনের যথাযথ প্রয়োগে সহযোগিতা করা
>>    শিক্ষা, ক্রীড়া ও সুস্থ সংস্কৃতিতে নারীতের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা
>>    জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ
>>    কর্মক্ষেত্রে নারীর মতায়নের নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা
>>    নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি করা বিবিধ

নারীদের প্রতিদ্বন্দী না ভেবে সহযোগী ভাবা
————————–
যে কোন নারীর পরিচয় এই তিনটিই। কন্যা, জায়া, না হয় জননী। নিজ গৃহ কিংবা কর্মেেত্র তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। সহকর্মী হিসেবে প্রতিদ্বন্দী বা প্রতিযোগী না ভেবে সহযোগী ভাবতে হবে। তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ বিনির্মাণে পুরুষদের নিতে হবে অগ্রগণ্য ভূমিকা। যে কোন কাজ বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবশ্যই নারীর মতামত বিবেচনা করতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সকল নারীকে প্রতিদ্বন্দী না ভেবে সহযোগি ভাবার প্রবণতা সৃষ্টি করতে হবে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করা
—————–
আমরা যে যেই ধর্মের অনুসারী হই না কেন, আমরা যদি প্রত্যেকে প্রত্যেক ধর্মের অনুশাসন মেনে চলি তাহলে নারী নির্যাতন অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। কারণ, প্রত্যেক ধর্মেই নারী নির্যাতন প্রতিরোধ এবং নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদাকে অনেক উচ্চ আসনে স্থান দেওয়া করেছে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার মধ্যদিয়ে নারী নির্যাতনের  অভিশাপ দূর করা সম্ভব।

পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন
——————————
নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ, জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণিত
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরা) আইন ২০১০, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
ভ্রাম্যমান আদালত আইন ২০০৯, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

সহিংসতা বন্ধ হোক পরিবার থেকে
———————
লণীয় যে, প্রায় সব ক্ষেত্রে পরিবারই নারী নির্যাতনের অন্যতম ক্ষেত্র। পারিবারিক অঙ্গনেই নির্যাতন ও নিপীড়নের প্রায় সব ঘটনা ঘটে থাকে। যদিও রাষ্ট্র থেকে ন্যায্য পাওনা নারীরা অনেক সময়ই পায় না। নির্যাতনবিরোধী আইন কাঠামোও নারীদের জন্য সহায়ক নয়। অধিকাংশ নারী নির্যাতনের পেছনে কোনো না কোনোভাবে পুরুষের সংশ্লিষ্টতা থাকে। নির্যাতনকারীদের বিচার হলে বন্ধ হবে নারী নির্যাতন। নারীদের প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধে, নিগ্রহের হাত থেকে রা করতে জাতিসংঘ এবং জাতীয় পর্যায়ে গৃহিত বিভিন্ন কনভেনশন-এর যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে নিশ্চয়ই বলবেন না, “তোমাদের লড়াই তোমরা লড়ো!”? নারী যেহেতু সবার প্রথমে মানুষ, তাই তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার রার দায়িত্ব নিতে হবে আামাদের সকলকেই। যদিও নারীদের বিষয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার বিদ্যমান। অনেকেই বলে ‘নারীর কথা মত চলা মেয়েলী স্বভাব’। সুখী সংসার বিনির্মাণে নারীর প্রতি সম্মানপূর্বক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। ঐ ভ্রান্ত ধারণার মানুষদের বলতে চাই, “বিনা প্রমাণে যা দাবি করা যায়, বিনা প্রমাণে তা প্রত্যাখ্যানও করা যায়”।

অতএব সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধে পুরুষদের এক সঙ্গে বলতে হবে-

স্বপ্নের হাতে হাত রেখে দেখো
বাঁচবো মোরা একসাথে আজ
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমিই যোদ্ধা
আমিই দারুণ স্বপ্নবাজ…
লেখক : প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী, সাইকোসোশাল কেয়ার প্রোগ্রাম,
উৎস; চট্টগ্রাম।