নারী বিদ্বেষপূর্ণ… ‘চটিওয়াজ’!

অহিদুল ইসলাম :: আমরা চটি বইয়ের কথা জানতাম। এই চটি বইয়ের লেখকে নাম রসময় গুপ্ত। কবে কোথায় কে এই রসময় গল্প লিখা শুরু করেছেন আমার জানা নাই। ১০০ বছর আগে যে চটি বইগুলো লিখেছিল, সেই লেখকের নাম ছিল রসময়গুপ্ত, আর এখন যে লিখছে তার নামও রসময় গুপ্ত। ইদানিং আমাদের পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। তাই গুলিস্তানে চটি বইয়ের বাজারটি আর খুজে পাওয়া যায় না। পত্রিকার স্টলে দাড়ালেই চটি বইয়ের মলাট দেখা মিলত, তা আর এখন চোখে পড়ে না।
মানুষ এখন অনেক বেশি ভাচুয়াল জগতের বাসিন্দা। মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে বিনোদিত হয়। এ  বিষয়টি মাথায় রেখেই হয়ত, চটি বইয়ের সেই জায়গা পূরণ করতে এখন ফেসবুক, ইউটিউবে একটা ওয়াজের ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে। এটি নিয়ে নানা জনে নানা মত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন, “হুজুর ঠিক কথাই বলেছেন”। তবে আমার ওই ওয়াজ শুনে মনে হয়েছে, কোনো ওয়াজ নয়, কেউ নিজের চটি বইয়ের কিছু অংশ পড়ে শুনাচ্ছেন। আর কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী সংসদে বলেছেন, “বাসের মধ্যে কেউ যদি অন্যের গায়ে বমি করে দিলে,  যেমন গা ঘিন ঘিন করে, শফীর ওয়াজ শুনে তেমনই গা ঘিন ঘিন করেছে”।
ওয়াজ আমাদের মনে গভীর প্রভাব রয়েছে। আমি ছোটবেলায় ওয়াজ শুনতে অনেক দূরে যেতাম। ওয়াজ হত সাধারণত শীতকালে। জৈনপুরী হুজুরের ওয়াজ এখনো আমর মনে আছে। কিভাবে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ থেকে ৫ ওয়াক্ত নামাজ হল মহানবীর উম্মতের জন্য, মহানবী কত কষ্ট করে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন। হুদায় বিদার সন্ধি, বিদায় হজ্বের ভাষণ, ইসলামের সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধের বিষয়ে ওয়াজ করতেন। সাথে থাকতো সেই সময়ে কিভাবে ফরজ পালন করতেন সাহাবীরা। তারা এতো কষ্ট ও যুদ্ধের মধ্যে যদি সব সহীহভাবে পালন করতে পারেন, আমাদেরও তা করতে হবে। এসবই ছিল ওই ওয়াজের বিষয়।
কিন্তু একি ওয়াজ শুনলাম। তিনি বলেছেন, মেয়েরা “ ঘরে থেকে আসবাবপত্র হেফাজত করবে, ছেলে সন্তানের দেখাশুনা করবে”। খুব খেলায় করুন “ছেলে সন্তান” মেয়েদের নয়। তাহলে মেয়ে শিশুর কি হবে? আইএ্যামেজাহেলিয়ার যুগে মেয়েদের জীবিত কবর দেয়া হত, তিনি কি তাই করতে চান?
তিনি বলেছেন, “সাতটআটটা বাজে গার্মেন্টসে যায় আপনার মেয়ে, রাতের আটটা দশটা বারোটায়ও ফিরে না। কোন পুরুষের লগে ঘুরাফিরা করতেসে তুমি ত জান না। কতো জনের মধ্যে মুত্তালা হচ্ছে আপনার মেয়ে, আপনি ত জানেন না। জেনা কইরা কইরা টাকা রোজগার করে, কি বরকত হবে?”
কতটা উজবুক আল্লামা শফী?নারীদের তিনি কি চোখে দেখেন? আমরা জানি গার্মেন্টসে বাবা, মা, সন্তান, স্বামী, স্ত্রী, ভাই, বোন এক সাথে, একই গামেন্টর্সে কাজ করে। ৩০ লাখ নারীর সংসার চলায় গার্মের্ন্টস আয়ের মাধ্যমে। এটাই জানতে চাই কে কার সাথে “জেনা” করে। ওনি যে ওয়াজ করতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান, তার স্ত্রীকি আর কারো সাথে তখন “জেনা” করেছে?
তার বক্তব্য, “মেয়েদের কেলাস ফোর ফাইভ পর্যন্ত  লেখাপড়া করান। বিবাহ    দিলে স্বামীর টাকা পয়সার হিসাব নিকাশ করতে পারার মত। অতটুকুই দরকার”। কেন মেয়েদের পড়ানোতে মাওলানা শফীর কষ্ট তা ওঠে এসেছে, জাতিসংঘের অধিবেশনে দেয়া পাকিস্তানের কিশোরী মালালা ইউসুফজাই এর বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, “চরমপন্থীরা বই আর কলমকে ভয় পায়, তারা নারীদের ভয় পায়”। সে বলেছেন, “আসুন আমরা খাতা কলম হাতে তুলে নেই। এগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সবার আগে শিক্ষা, শিক্ষাই সমস্যার একমাত্র সমাধান। একজন শিশু, একজন শিক্ষক, একটি কলম ও বই গোটা বিশ্বকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।” কিন্তু এই পরিবর্তনতো চায় না মৌ্লবাদী গোষ্ঠী, শফীর হেফাজীদের দল। তারা শুধু পিছন দিক থেকে নয়, চারপাশ দিয়েই নারীকে আটকে রাখতে চায়। সেজন্যই সন্তান জন্ম দেয়ার কারাখানা হিসেবে দেখে নারীদের। এই সময় এসোও জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা বলে। আর এই বলে পুরুষদের উস্কে দেয় যে, “জন্ম নিয়ন্ত্রণ মানে হল পুরুষকে খাসি” করে দেয়া”। এমন কুরুচিপূর্ণ কথা আর কি হতে পারে?
তারপর শফী সাহেব বলেছেন, “মহিলারা তেতুলের মতো। মহিলাদের দেখলে নাকি লালা ঝরে”। আবার “লালা না ঝরলে নাকি তারা পুরুষ নয়”। পরিচিত জনরা বলেছেন, শফী কি তার মা ও বোনকে দেখলেও এমন করে লালা ঝরে? আমি বলি লালা তো ঝরে অসুস্থ কুকুরের মুখ থেকে। কোনো মানুষেরও লালা ঝরলে বুঝতে হবে সেও কুকুর হয়ে গেছে। তার নাকি “কু খেয়াল” আসে নারীদের দেখলে। “কেউ যদি বলে কুখেয়াল আসে না তাহলে সে নাকি ধ্বজভঙ্গ”, পুরুষত্ব নষ্ট হয়ে গেছে”। তিনিতো কয়েকবার পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ্ব্ করতে গেছেন, সেখানে পুরুষ মহিলা একসাথে নামাজ পড়ে, হজ্ব করে। সেখানেও কি শফী হুজুরের লালা ঝরে ছিল। সেজন্য সংসদে তার বিচার দাবি করেছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। আমার মনে হয় এতো যাদের লালা ঝরে তাদের ঘরের বাইরে আসার কোনো অধিকার নাই। ঘরেই বন্দী রাখা ভালো।

তবে আশার কথা হলো তিন যখন এই বয়ান করেন, তখন  এই সব নারী বিদ্বেষী বক্তব্যের সময় শ্রোতাদের বারবার তার সাথে একমত কিনা জানতে চাচ্ছিলেন আল্লামা শফী আহমেদ। কিক্তু শ্রোতারা কেউই তার ডাকে সাড়া দেয়নি। সমস্বরে ঠিক বলে ওঠেনি।

লেখক: রিপোর্টার; একাত্তর টেলিভিশন