বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Barguna pic-Sumon-001

সুমন সিকদার, নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ
দুর্যোগ প্রবণ উপকূলীয় জেলা বরগুনার বঙ্গোপসাগরতীরবর্তী তালতলী উপজেলার বড় অংকুজান পাড়া গ্রামের একজন দরিদ্র গৃহবধু খাদিজা (৩৫)। স্থানীয় গ্রাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য তিনি। ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের সময় তিনি নারী-শিশু ও প্রতিবন্ধীসহ দুই হাজার স্থানীয় অধিবাসীকে চার কিঃমিঃ দূরত্বের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু খাদিজাই নয়, তার মত অনেকেই গ্রাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হয়ে যে কোন দুর্যোগের আগে ও পরে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতি ও প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

তালতলী উপজেলার একাধিক গ্রামে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দুর্যোগের কোন সংকেত থাকুক আর নাই থাকুক সেখানকার অধিকাংশ গ্রামে এখন নিয়মিত চলছে দুর্যোগ বিষয়ক মাসিক সভা। সভায় অংশগ্রহনকারী সদস্যদের সকলেই বেরিবাঁধের উপরে এবং বাইরে বসবাসকারী হতদরিদ্র পরিবারের নারী ও পুরুষ। সভার আলোচিত বিষয়গুলোও ভিন্ন রকম। সেসব সভায় উঠে আসছে চলতি মাসের সম্ভাব্য আপদ বিপদসহ করনীয় নানা অনুষঙ্গ। অতিবৃষ্টির সময় কী কী উপায়ে ঘরের লাকড়িসহ (জ্বালানী), খাদ্য শস্য এবং অন্যান্য গৃহসামগ্রী সংরক্ষণ করতে হবে। হাঁসমুরগীসহ গবাদি পশুর কী কী রোগ বালাই হতে পারে এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায়গুলো কী। সারা বছরের মৌসুমী আপদগুলোর কথাও আসছে আলোচনায়। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় এবং ঘুর্ণিঝড় চলাকালীন জোয়ার জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলায় করনীয় নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলে এসব সভাগুলোতে।

স্থানীয় সচেতনমহল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে আইলা ও মহাসেনসহ একাধিক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের কারনে স্থানীয় অধিবাসীরা দুর্যোগ ইস্যুতে তুলনামূলকভাবে অনেক সচেতন হয়ে উঠছে। নিজেরাই এখন প্রতি মাসে নিয়মিত মাসিক সভা করে দুর্যোগ প্রস্তুতির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আলোচনায় এনে দুর্যোগকালীণ সময়ে একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্পেন সরকারের অর্থায়নে স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন সংগ্রামের (সংগঠিত গ্রামোন্নয়ন কর্মসূচীর) সহযোগিতায় এসিএফ (অঈঋ) নামের একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন সিডর ও আইলাপরবর্তী সময়ে কমিউনিটি ম্যানেজড্্ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন (ঈগউজজ) নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। এ প্রকল্পের অধিনে বরগুনার তালতলী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী পরিচালনা করে আসছে। পাশাপাশি বাছাইকৃত দরিদ্র পরিবারের জন্য প্রশিক্ষণের পরে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা, গৃহপালিত হাঁসমুরগী, গবাদিপশু, মৎস্যপোনাসহ বিভিন্ন উপকরণ সহযোগিতা দিয়ে আসছে। সম্প্রতী গত ১৬ই মে উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মহাসেন পরবর্তী সময়ে এসিএফ তালতলীর তিনটি ইউনিয়ন বড়বগী, সোনাকাটা এবং নিশানবাড়িয়ার ১৯৯৫টি পরিবারে ইমার্জেন্সী শেল্টার কিডস এবং হাইজিন কিডস্্ বিতরণ করে।

তালতলীর একজন ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজী জানান, সাধারণ মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে, জানমালসহ নিজেদের আত্মরক্ষায় নিজেদেরকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি এসিএফের সিএমডিআরআর প্রকল্পের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। বরগুনার ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচীর উপ-পরিচালক হাফিজুর রহমান জানান, তুলনামুলকভাবে বরগুনার তালতলীতে স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে দুর্যোগ ইস্যুতে সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে এসিএফের সিএমডিআরআর প্রকল্পটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান, এবারের মহাসেনে সিএমডিআরআর প্রকল্পের অধিনে গ্রাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির নারী ও পুরুষ সদস্যরা ঝুকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে সাধারণ জনগনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে প্রসংশনীয় দায়িত্ব পালন করেছে।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »