বিএমডিসির অনুমোদনহীন নর্দার্ন মেডিকেলে শিক্ষার্থীরাই জিম্মি!

বার্তাবাংলা রিপোর্ট :: নর্দার্ণ ইন্টারন্যাশন্যাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল! প্রচার-প্রচারণা, নাম-ডাকে পুরোদস্তুর একটি মেডিকেল কলেজ। কাক ডাকা ভোরেই সাদা এ্যাপ্রোণ পরা শত শত মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীর পদচারণায় মুখরিত হয় ক্যাম্পাস। বিখ্যাত-অখ্যাত শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে প্রায় নিয়মিত পাঠদান চলেছে। চলছে হাসপাতালে আগত রোগীদের চিকিৎসাও। বাহির থেকে প্রায় সবকিছু ঠিকঠাক!

তবে নর্দার্ণ ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের নেই বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এর অনুমোদন। ফলে ডাক্তারী পাশ করলেও এসব শিক্ষার্থী কোথাও প্রাকটিস করার সুযোগ পাবেনা।

নর্দার্ণ মেডিকেলের জন্য নেই কোন নিজস্ব ক্যাম্পাস ভবন। হাসপাতালের জন্যও নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে ধানমন্ডির ৮/এ-এর একটি আবাসিক বাড়িতে। যা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অনুমোদন পাওয়ার নিয়ম পরিপন্থী। এ সব কারণে প্রতিষ্ঠার পর আট পেরিয়ে গেলেও বিএমডিসি অনুমোদন দেয়নি চিকিৎসক তৈরির এই প্রতিষ্ঠানটিকে।

এসব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার পেছনে রয়েছে একটি অযোগ্য ও ভূয়া শিক্ষক চক্র। তাদের খপ্পরে পড়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে নর্দাণ ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের চার শতাধিক ‘হবু’ ডাক্তার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক অদক্ষতা আর সীমাহীন দুর্নীতি।

সরেজমিন অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে দেখা গেছে, প্রাইভেট এই মেডিকেল কলেজের অন্তত একডজন শিক্ষক, কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা ভূয়া অভিজ্ঞতাপত্র ও লবিং-তদ্বিরের জোরে কলেজটির বড় বড় পদগুলো দখল করে রেখেছেন। এসব শিক্ষকদের অব্যাহত স্বেচ্ছাচারিতা ও অদক্ষতার শিকার হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও চিকিৎসা প্রার্থী অসহায় রোগীরা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষকদের প্রায় সকলেই নর্দার্ণ ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে যোগদান করে মিথ্যা ও অসত্য তথ্য দিয়ে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক, এমনকি অধ্যাপক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন । কেউ কেউ আবার বিভাগীয় প্রধানসহ বড় বড় পদ আকড়ে বসে আছেন। বিএমডিসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট অনুযায়ী তারা কোনভাবেই বর্তমান পদ-পদবী ও সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেননা বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এমন শিক্ষকদেরই একজন ডাক্তার আব্দুল মালেক। ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) সাবেক অধ্যাপক পরিচয় দিয়ে নর্দার্ণ মেডিকেল কলেজের সার্জারী বিভাগের শিক্ষকতা করছেন তিনি। ১৯৭৬ সালে ঢামেক থেকে এমবিবিএস পাশ করার পর তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহকারী সার্জণ, কনসাল্টেন্ট, সিনিয়র কনসাল্টেন্টসহ সর্বশেষ ২০১০ সালে ২২ ফেব্রুয়ারী ঢামেক থেকেই সহযোগী অধ্যাপক (কারেন্ট চার্জ) হিসেবে অবসরে যান। ঢামেকে তিনি সহযোগী অধ্যাপক (কারেন্ট চার্জ) থাকলেও তার বিজনেস কার্ড, সাইনবোর্ডসহ সর্বত্র ঢাকা মেডিকেল-এর প্রাক্তণ অধ্যাপক পরিচয় দিয়ে নির্জলা মিথ্যাচার করছেন। চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনি সহ অনেকে চাকুরিচ্যুত হয়েছিলেন নর্দার্ন মেডিকেল থেকে। তবে কোন অদৃশ্য শক্তির জোরে আবারো পূণরায় বহাল হয়ে ‘স্বঘোষিত’ সার্জারী বিভাগের বিভাগীয় প্রধানও হয়েছেন।

উল্লেখ্য সার্জারী বিভাগে কোন অধ্যাপক না থাকায় সম্প্রতি বিএমডিসির নির্দেশণাক্রমে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল প্রফেসর মো: মোজাফ্ফর হোসেনকে চলতি বছরের মে মাসে সার্জারী বিভাগে নিয়োগ দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শিক্ষক চক্রটির অসহযোগিতার কারণে অদ্যবধি দায়িত্ব বুঝে পাননি বলে জানিয়েছেন প্রফেসর মোজাফ্ফর।

এসব অনিয়ম ও অভিযোগের ব্যাপারে ডাক্তার আব্দুল মালেক এর কাছে জানতে চাইলে, তিনি কোন ধরণের মন্তব্য করজে অপরাগতা প্রকাশ করেন। নর্দার্ণ মেডিকেলের এই চিত্র শুধু ডাক্তার আব্দুল মালেকের নয়, হাসপাতালের শীর্ষ একাধিক কর্মকর্তাসহ অন্তত ১২জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা মিথ্যা ও অসত্য তথ্য দিয়ে রোগী সেবা ও শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।

এসব শিক্ষকদের কারণে ক্লাস চলছে অনিয়মিত ও দায়সারা গোছের। সিলেবাস অসম্পুর্ণ থাকছে। পরীক্ষায় অনিয়মের মাধ্যমে পাশ করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন সহ নানা অনিয়মের ফলে শিক্ষার্থীদের বহুলাকাঙ্খিত ডাক্তার হবার স্বপ্ন উবে যেতে বসেছে।

শুরুর দিকে বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা প্রফেসর এই মেডিকেল কলেজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও বর্তমান কর্তৃপক্ষ অর্থাভাব দেখিয়ে তাদেরকে বিদায় করে দেয়। অনেক শিক্ষকের ন্যায্য বেতন-ভাতাও প্রদান করেনি কর্তৃপক্ষ। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা সহ একাডেমিক কার্যক্রমের উপর।

মেডিকেল কলেজটিতে কোন ধরণের নিয়োগ বিধিই মানা হয়না বলে অভিযোগ করেন খ্যাতনামা এ্যানেসথেটিস্ট ও নর্দার্ণ মেডিকেলের সাবেক প্রফেসর ডা. ফজলুর রহমান। নিয়ম না মানার জন্যই প্রতিষ্ঠানটির এই দুরবস্থা বলে মনে করেন তিনি।

নাম গোপন রাখার শর্তে নর্দার্ণ মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের একজন ছাত্রী বলেন, বিপূল অংকের টাকা পরিশোধ করে এখানে ভর্তি হয়েছি। অথচ কলেজটিতে শিক্ষার নি¤œমান ও পরিবেশ দেখে ডাক্তার হবার স্বপ্নটাই উবে যেতে বসেছে। এখানে কর্তৃপক্ষের কোন বালাই নেই। অভিযোগ শোনার মত কেউ নেই। যার যেমন ইচ্ছে, তেমন ভাবেই চালাচ্ছে। জানিনা, এই মানের পড়াশোনা করে, পাশ করার পর কী করবো!

এমন নানা অভিযোগ আর হতাশার কথা শোনা গেছে নর্দার্ণ মেডিকেল কলেজের প্রায় সকল বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে।

তবে প্রশাসন এসব ব্যাপারে নির্বিকার। শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে বিপূল অংকের (এককালীন প্রায় ১৫ লাখ) অর্থ আদায় করে নিলেও এসব শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেনা মানসম্মত ক্লাস, ল্যাব ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা। প্রথম দুটি বর্ষের  শিক্ষার্থীরা বিএমডিসির অনুমোদন নিয়ে শেষ হলেও কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালীর কারণে ঝুলে আছে পরবর্তী ব্যাচগুলোর অনুমোদন। তারা জানেনা, পাশ করে কী করবে!

সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে এই নির্বিকার থাকার কারণও জানা গেছে। মানসম্পমত শিক্ষা কাগজে-কলমে, বিজ্ঞাপনে থাকলেও ব্যবসায়িক মনোভাব ও মুনাফাভিত্তিক মানসিকতার জন্যই শিক্ষাঙ্গণটির এই দূরবস্থা। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে  প্রথমবারের মত এই হাসপাতাল ও কলেজটির মালিকানা পরিবর্তণ হয়। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল এখানকার শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর। মেডিকেল কলেজ মালিকদের শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ মনোভাবের ফলে জিম্মি হয়ে পড়েছে, এখানকার ছাত্র-ছাত্রী ও অবিভাবকগণ।

নর্দার্ণ ইন্টারন্যাশন্যাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আনোয়ার হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, প্রথম দ’ুটি ব্যাচের জন্য বিএমডিসির অনুমোদন পেয়েছিলাম। বর্তমান ব্যাচগুলোর অনুমোদনের জন্য চেষ্টা চলছে। তবে বিএমডিসি’র অনুমোদন না থাকলেও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে বলে জানান।