একজন তরুণ উদ্যোক্তার আত্মকথন…

আমি মাহাবুবুর রহমান আরমান। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিবিএ অনার্স ৩য় বর্ষের মার্কেটিং বিভাগের একজন ছাত্র। অনেক বছর ধরে কম্পিউটার আর ইন্টারনেট এর সাথে জড়িত। অনেক আগে থেকেই আইটি জগত এ কাজ করছি পাশা পাশি করেছি আউটসোরসিং আর ফ্রিল্যান্সিং ও। আমি আসলে গ্রাফিক ডিজাইন এ পারদর্শী ছিলাম। ঘটনা ২০১২ সালের। হঠাত খুব ইচ্ছে জাগে নিজের ডিজাইন করা টিশার্ট গুলো কে প্রিন্ট করে পরার। কয়েকটা অনলাইন ব্র্যান্ড এর সাথে যোগাযোগ ও করলাম। অথচ তারা যে প্রাইস বলল তা আমার দ্বারা বহন করা সম্ভব ছিল না। একটা সময় তারা পাত্তা ও দিচ্ছিলো না। সেই থেকেই জিদ করলাম। যে নিজেই কিছু একটা করবো। বর্তমান অবস্থায় নতুন নেমে একটা নতুন ব্র্যান্ড কে পরিচিত করা টা অনেক দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু মাথায় সবসময় এটা ঘুরতো করতে ই হবে এমন কিছু। আর সেই থেকে বাজার যাচাই করা শুরু করলাম ছয় মাস ধরে এমন চলল।

কিছু বন্ধুদের সাথে কথা বললাম এ ব্যাপারে যে কি করা যায়। পরিকল্পনা শুনে প্রথম বার ওরা রাজী হলো না। কারন ওরা প্ল্যান্টাই বোঝে নাই। তখন ভেবে নিলাম একাই করবো কিছু একটা। যাই হোক। পরে পরিকল্পনা টা আরো দৃঢ় করলাম। এবার আবার বন্ধুদের বললাম এবার ওরা রাজি হয়ে গেলো। সবাই ১০০০ টাকা করে দিল। ৮ জন সদস্য এর মধ্যে ২ জন দিতে পারলো না। বাকী টা আমি দিলাম, পুজি মাত্র ১৫০০০ টাকা। ডিজাইন আমার করা ছিলো। ফেইসবুক থেকে পরিচয় হওয়া এক বড় ভাই প্রথমে ব্যাপক সাহায্য করলেন। যা অকথ্য। তিনি একটা প্রিন্টিং আর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী যোগার করে দিলেন। স্যাম্পল দেখে ভালো লাগলো। তাই কাপড় কিনে নেমে পড়লাম। প্রায় ২৫ কেজি কাপড় কিনলাম ব্ল্যাক আর হোয়াইট এর। কিন্তু কাপড়টা খারাপ ছিলো না যদিও তারপর ও অনেক কাপর নষ্ট হলো। কাপড় এর মাঝে অনেক গুলো অংশ গোল চাক্তির মত করে কাটা ছিল। মাত্র ৮৮ টা টিশার্ট হলো। তার মধ্যে একটা চুরি গেলো। তার মধ্যে অনেক গুলা মানে ৩০+ টিশার্ট নষ্ট হয়ে গেলো। প্রিন্ট জনিত কারনে। অগুলা এখনও পরে আছে। বিক্রি করি নি। এই কারনে সবাই অনেক কিছু বলতে লাগলো, যারা পারটনার ছিলো সবাই সরে গেলো ধীরে ধীরে অনেকে অনেক কটু কথা বলতে লাগ্লো যে শুধু সময় নষ্ট করছি, পারবো না শুধুই পড়ালেখা তে ব্যাঘাত ঘটাইতেসি। বাসা থেকে তো কোনো সাপোর্ট ই দিতে চাইলো নাহ। অনেক বকা ঝকা শুনার পরো আকড়ে ধরে ছিলাম। বষবাস ছিলো যে পারবো। কিন্তু অনেক লস হয়ে গিয়েছিলো সেটা কে পূরন করতে নতুন ভাবে মূলধন দরকার। যা ছিলো না। পরে যুগিয়েছিলাম। মাঝে বন্ধু রা রাস্তায় দেখলেই কটু কথা বলতো, ব্যবসায়ী ব্যবসায়ী বলে ডাক্তো শুনতে কেমন জানি লাগতো। তার পর আমরা আমরা দুজন ছিলাম আর ইতালী থেকে একজন আমাদের সাথে যোগ দিলো।

আমাদের ব্যবসা টা পুরোপুরি ফেসবুক আর অনলাইন নিরভর ছিলো। আমি এর বাইরে কখনো যেতে চাই নি। আইটি জগতে কাজ করতাম বিধায় অনেকের সাথেই পরিচয় ছিলো ছিলো ভালো সম্পরক ও। তারা নির্দ্বিধায় কিনে নিতো আমার পণ্য। তবে এমন মানুষদের সংখ্যা খুবি কম ছিলো। আমার জানা ছিলো যে বাংলাদেশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা সৌখিন। যারা ফ্যাশন সচেতন। আমাদের মূল টার্গেট ছিলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। শুধু মাত্র ফেসবুকের কারনে তা করতে পেরছিলাম ও সঠিক ভাবে।

ফেসবুক অনেকে স্প্যাম আর স্ক্যামিং এর জন্য ব্যবহার করতো। অনেকে আরো খারাপ কাজ ও করতো কিন্ত ফেসবুক  ব্যবহার করে ও যে আয় করা যায় তা অনেকেই জানতো না। আর ঠিক এই সময়েই আমার ইচ্ছে ছিলো নতুন কিছু করে দেখানো। কিন্তু ব্যপার টা একটু কঠিন ছিলো। খারাপ কাজ গুলো আমাদের পিছিয়ে দিতে পারতো, কিন্ত আল্লাহ  এর রহমত তা হয় নি।

অনলাইন এ টিশার্ট বিক্রি করা এতো টা সহজ ছিলো নাহ। কিন্তু তারপর ও আমার তা করতেই হবে এই মনোভাব নিয়ে এগিয়েছিলাম। অনেকেই পিছপা হয়েছিল। তবু নিজে পিছু হটি নাই।

যেহেতু আমি আইটি এর মানুষ ছিলাম আর তাই আমি সোশ্যাল মিডিয়া এর ইম্প্যাক্ট টা খুব বেশি ভালো বুঝতাম। আর যেহেতু ফেসবুক অনেক নামকরা ছিলো তাই এটা আমার সুযোগ ছিলো। প্লাটফর্ম খালি ছিলো আমার জন্য। একটা ছোটো খাট সমীকরন করে ছিলাম আমি। আমি দেশের ১০% মানুষের মধ্যেকার ৩৫% মানুষ কে টার্গেট করেছিলাম যারা কিনা ১৫-২৫ বছর বয়সি। আর এদেরকে একমাত্র ফেসবুকেই পাওয়া সম্ভব ছিলো অন্য কোথাও এতো সহজে এতো কম খরচে আমার পক্ষে তাদের কাছে পৌঁছানো সহজ ছিলো না। আর তাই ফেসবুক এর বিকল্প নেই। আর ফেসবুক এমন একগতা যায়গা যেখানে সব বয়সি মানুষদের মিলন মেলা।

সমস্যা হয়েছে শুধু এক্টাই আর তা হলো, সবাই ফিজিকালি স্টোর কিনা জিজ্ঞেস করতো। আমরা ভালো পণ্য বানিয়ে সরবরাহ করতাম তারপর মানুষ অনেক প্রশ্ন করতো। বিশ্বাস করাতে অনেক কষ্ট হতো। যদিও এখন আর সেই সমস্যা টা বেশি নাই।

২-৩ টা লোকাল মেলা করার পর হঠাত বিডিওএসএন এর মুনীর হাসান স্যার এর সহযোগীতায় আমরা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এক্সপো ২০১২ তে একটা স্টল নেই। ওটাই ছিলো আমাদের মূল টারনিং পয়েন্ট। এর পর আরো কয়েকটা মেলা আমাদের ঘুরে দাড়াতে সাহায্য করেছে এর মধ্যে ইকমারস ফেয়ার ২০১৩, ঢাকা আর উদ্যোক্তা উৎসব ২০১৩ চট্টগ্রাম অন্যতম। এখন গড় হিসেবে ভালো ডিজাইন এর পণ্য থাকলে আমাদের ১৫-৩০ দিনে ৩০০-৪০০ টিশার্ট কোনোঝামেলা ছাড়াই বিক্রি হয়ে যায়। আর এতে কোনো সমস্যা ও হয় না। এখন পর্যন্ত কোনো কমপ্লেইন করে কোনো কাস্টমার। এটাই আমাদের অর্জন।

এখন আল্লাহ এর রহমতে অনেক ভালো আছি। ছোটো ছোটো অর্ডার গুলা রেগুলার হ্যান্ডেল করতে পারি। দেশের কর্পোরেট ক্লায়েন্ট দের সাথে কাজ করার চেষ্টা করছি। ভালো মানের পণ্যের অঙ্গিকার নিয়ে এগিয়েছি আর তাই ধরে রাখার চেষ্টা করতেসি। আমাদের অনেক ক্লায়েন্ট এখন আল্লাহ এর রহমতে। এর মধ্যে আমাদের মতন অনলাইন ব্র্যান্ড ও আছে। বিদেশেও পণ্য যাচ্ছে আমাদের। হংকং, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউকে, ইউএসএ তে ও কথা চলছে। এখন পর্যন্ত ৩টা পুরষ্কার পেয়েছি আমরা আর দুটি সার্টিফিকেট। আর তাই ফেসবুক স্টোর এর পাশাপাশি এখন ই-কমারস এর দিকে ও হাটছি আমরা। এখন সারা বিশ্বে আমরা টিশার্ট ডেলিভারি দিতে পারি। যা দেশে প্রথম।

এখন আমাদের অফিস হয়েছে, একটা ঠিকানা হয়েছে। আমাদের ট্রেড লাইসেন্স আর টিআইএন আছে আমার নামে।

এই ছিল আমার কাহিনী