বরগুনা-বেতাগী-বাকেরগঞ্জ মহাসড়ক পুঃননির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ

সুমন সিকদার, নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা :: বরগুনা-বেতাগী-বাকেরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পুনঃর্নিমান কাজের  ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের পাওয়া গেছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা নিম্নমানের সামগ্রী ও নামে মাত্র কাজ করে বিপুল অর্থ লোপাট করেছেন। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা আট কোটি ৬২ লাখ ১৭ হাজার টাকার বিল তুলে নিয়েছেন। সরেজমিনে এসব অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে।
বরগুনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) কার্যালয় সূত্রে জানাগেছে, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার  প্রকল্পের আওতায় ২০১২ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে সড়কটির চান্দখালী বাইপাস থেকে নিয়ামতি বাজার  পর্যন্ত ৫টি গুচ্ছে প্রায় ২৮ কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশ বর্ধিতকরন ও পুনর্নিমান  কাজ শুরু হয় । ওই বছরের ২৯ জানুয়ারি প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫টি গুচ্ছে দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্র আহ্বান এর প্রেক্ষিতে কাজ পান ৪টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান সমূহ হচ্ছে- মেসার্স  তানিয়া এন্টার প্রাইজ এন্ড বাবুল শেখ (জেভি), খান এন্টার প্রাইজ, মেসার্স পায়েল এন্ড পিসি (জেভি) ও মের্সাস এমএ অ্যান্ড এমএইচই কনস্ট্রাকশন নামের  ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠান গুলো শুরু থেকেই এলজিইডির জেলা কার্যালয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কাজে নিুমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে আসছে।প্রাক্কলন অনুযায়ী সড়কটির দুপাশে ছয় ফুট বর্ধিত করে রাস্তা পুনর্নির্মাণের কথা। দুপাশ বর্ধিতকরণকাজে ২২ ইঞ্চি বেড কেটে তিনটি স্তরে প্রথমে বালু, পরে বালু ও খোয়া এবং আবার খোয়া ফেলে ১৬ ইঞ্চি ভরাট করে দৃঢ়করণ (কমপ্যাক্ট) করে ভিত্তি (বেজ) নির্মাণের কথা। এরপর পুরো রাস্তায় ছয় ইঞ্চি খোয়া (ম্যাকাডাম) ও বালু দিয়ে চূড়ান্ত দৃঢ়করণ করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, সড়কের এই অংশের কাজে দুই পাশে বর্ধিতকরণের জন্য ২২ ইঞ্চি খনন করে (বেড) লোকাল বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। পরে পুরোনো রাস্তার ওপরের অংশের পিচ ও পাথর এবং তিন ইঞ্চি পরিমাণ ইটের খোয়া তুলে বর্ধিত অংশে দিয়ে দেওয়া হয়। গোটা রাস্তার ওপরের অংশে ছয় ইঞ্চির স্থলে তিন ইঞ্চি নতুন খোয়া দিয়ে চূড়ান্ত দৃঢ়করণ করা হয়েছে। এখন এর ওপর পিচ ঢালাইয়ের প্রস্তুতি চলছে। এসময় তারা আরো বলেন, আমরা এর প্রতিবাদ করতে চাইলেও ঠিকাদারদের লোকজনের ভয়ে কিছু বলতে পারছি না।
কাজিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোশারেফ হোসেন অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার  প্রকল্পের এই সড়কের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছেনা। কাজটি যে ভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা দেখে আমি হতাশ। দুঃখের  বিষয় একাধিকবার উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভায় সড়কটির কাজের প্রাক্কলন দেখানোর জন্য  উত্থাপন করেও কর্তৃপক্ষের কোন সাড়া পাইনি। সড়কের কাজে যথেষ্ট অনিয়ম রয়েছে বলে আমি মনে করি।’
এ ব্যাপারে বুড়ামজুমদার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সুমন অভিযোগ করেন, সড়কে যেনতেন কাজ করিয়ে ঠিকাদাররা কোটি কোটি টাকা আÍসাৎ করেছেন। এভাবে নির্মাণকাজ হলে ছয় মাসের বেশি এই রাস্তা স্থায়ী হবে না।
সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার বিভিন্ন অংশে চূড়ান্ত দৃঢ়করণ করে পিচ ঢালাইয়ের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। বাকি কাজও চলছে। এলাকাবাসী এসময় পিচ ঢালাইয়ের জন্য প্রস্তুত রাস্তার দুই পাশের বর্ধিত অংশের কয়েকটি স্থান খুঁড়ে দেখান। তাতে তিন ইঞ্চি গভীরতার পর কোনো খোয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সেখানে উপস্থিত কাজের মিস্ত্রিদের কাছে কাজের অনিয়ম স¤পর্কে জানতে চাইলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, কোথায় কী পরিমাণ খোয়া, বালু দেওয়া হয়েছে তা আমরা জানি না।
এ ব্যাপারে মেসার্স  তানিয়া এন্টার প্রাইজ এন্ড বাবুল শেখ (জেভি) ঠিকাদরী প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার মারুফ রেজা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি প্রাক্কলন অনুসারেই আমার অংশের কাজ করেছি। প্রয়োজনে পুনঃতদন্ত করে দেখতে পারেন।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স পায়েল এন্ড পিসি জেভির বিভিন্ন অংশের কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে খানের হাঁটে রিটানিং ওয়াল নির্মানে সিলেটচান বালুর পরিবর্তে টোপ বালু দেওয়া হয়েছে। দুরমুজ (মানকি) দিয়ে পিলার না পুতে  হাত দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পিলার বসানো হয়েছে। এ অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মোঃ বাবুল বাদশা মিয়া বলেন,‘ আমার কাজে কোথাও কোন অনিয়ম নেই। প্রাক্কালন অনুযায়ী কাজ করেছি।
একই অভিযোগ উঠেছে খান এন্টার প্রাইজ এর ঠিকাদার খলিলুর রহমান ও মের্সাস এমএ অ্যান্ড এমএইচই কনস্ট্রাকশন এর ঠিকাদার হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে। ঠিকাদার খলিলুর রহমান বলেন, আমি কোন অনিয়মের আশ্রয় নেয়নি। প্রাক্কলন মোতাবেক সঠিক ভাবেই কাজ করছি। সংশ্লিষ্টদের নিদের্শনা  অনুযায়ী আমি ভাল ভাবে কাজটি শেষ করার আপ্রান চেষ্টা করছি। তার পরেও দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে কোথাও উনিশ-বিশ হতে পারে। যদি কোথাও ব্যতিক্রম হয়ে থাকে  তবে তা ঠিক করে দিব।’
এ ব্যাপারে এলজিইডি বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী  শাহেদুর রহমান  বলেন, ‘আমার কাছেও এ  সড়কের কাজে অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। কিছুদিন আগে আমারা সেখানে গিয়েছিলাম। তবে এখনো কাজ শেষ হয়নি। কোন ত্র“টি ও অনিয়ম থাকলে যথাসময়ের মধ্যে  তা অবশ্যই  ঠিক করে দেওয়া হবে।’