“হোয়াইট ওয়াশ”

অহিদুল ইসলাম :: ক্রিকেট খেলার সুবাদে বাংলাদেশের মানুষের কাছে “হোয়াইট ওয়াশ” শব্দটি পরিচিত। শব্দটির বাংলা করা হয়েছে “ধবল ধোলাই”। যখন ক্রিকেট খেলার সিরিজে একটি দল কোনো ম্যাচেই জিততে পারে না, সেই হেরে যাওয়াকেই বলে “হোয়াইট ওয়াশ” বা “ধবল ধোলাই”। ১৯২১ সালে এ্যাসেজ সিরিজে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া ৫-০ তে ইংল্যান্ডকে “হোয়াইট ওয়াশ” করে দেয়। আর বাংলাদেশের মানুষ “হোয়াইট ওয়াশ” শব্দটার সাথে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে ২০১০ সালের ১৭ অক্টোবর। যখন শক্তিশালী নিউজিল্যান্ডকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ওয়ানডে সিরিজে ৪-০ “হোয়াইট ওয়াশ” করে বাংলার মাটিতে। রাগবি আর টেনিস খেলাতেও একইভাবে “হোয়াইট ওয়াশ” শব্দটি ব্যবহার করা হয়। “হোয়াইট ওয়াশ” হওয়াটা বড় ধরণের লজ্বার। ধুয়ে ধবধবে সাদা করে দেয়া, প্রতিপক্ষের আসলে কোনো চিহ্নই নেই খেলার মধ্যে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৪-০ তে পরাজয়কে “হোয়াইট ওয়াশ” বলা যেতেই পারে। সরকারের মেয়াদের সাড়ে চার বছর পর বড় ধরণের ধাক্কাই খেলো ১৪ দলীয় মহা জোট সরকার। অনেকটাই বাকরুদ্ধ আর হতাশ আওয়ামী লীগের নেতারা। যদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন, “এতে সরকারের বিজয় হয়েছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, সেটাই প্রমান হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আর নাই দরকার”।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সদা সত্য ভাষী হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত দুই মন্ত্রী। এদের একজন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তিনি বলেছেন, “এটা সরকারের জন্য অশনি সংকেত”। আর যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দলের নেতাকর্মীদের জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন, তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে। পরে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া বলেছেন, “ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার একটা সুযোগ পেল আওয়ামী লীগ”। আর দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, “এ ফলাফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না”।
অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “সরকারকে নো বলে দিয়েছে দেশের মানুষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দিয়েছে ভোটারা, সরকারের উচিত এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়া”। দলটির অরেক নেতা মওদুদ আহমেদ সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাবি করেছেন, “সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগাম নির্বাচন দিন”। আর বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দলীয় নেতাকর্মীদের, “আনন্দ মিছিল না করার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে”।
জামায়াত-শিবিরের প্রতিক্রিয়া কেউ নেয়নি। নিলে তারা নিশ্চয় বলতো, “মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষে রায় দিয়েছে, এখন ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দিয়ে তাদের নেতাদের সম্মানের সাথে ঘরে ফিরিয়ে দিতে হবে”।
আওয়ামী লীগের যে সব প্রার্থীরা হেরেছেন, তারা কেউ প্রার্থী হিসেবে খারাপ ছিলেন না। এক বাক্যে অনেকেই বলেছেন, তারা নিজ নিজ এলাকায় বেশ উন্নয়নও করেছেন। ঝক ঝকে খুলনা শহর মেয়র খালেকের করা। আর লঞ্চ র্টামিনালে গেলেই বুঝা যায় রবিশাল শহরের কতটা উন্নয়ন করে ছিলেন মেয়র শওকত হোসেন হিরণ। ১৪ বছরের মেয়র বররুদ্দিন আহমেদ কামরান কিংবা রাজশাহীর খায়রুজ্জামান লিটন। কেউই ব্যাক্তিগত বড় ধরণের কোনো দূর্নীতি, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়ার অভিযোগ অভিযুক্ত হননি। নির্বাচনের আগে মিডিয়াতে এ ধরণের বক্তব্য ওঠে আসে নি।
তবুও কেন রাজশাহীতে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে ৪৭ হাজার ৩৩২ ভোটের ব্যবধানে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের কাছে পরাজিত হতে হল? সিলেটে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান কেন ৩৫ হাজার ১৫৭ ভোটের ব্যবধানে আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে গেলেন? বরিশালে শওকত হোসেন হিরনকে কেন ১৭ হাজার ১০ ভোটের ব্যবধানে পরাজয় মেনে নিলেন আহসান হাবিব কামালের কাছে? খুলনায় তালুকদার আব্দুল খালেক হারলেন, মনিরুজ্জামান মনির কাছে ৬০ হাজার ৬৭১ ভোটের ব্যবধানে?
এই প্রশ্ন গুলোর নানা ব্যাখ্যা উঠে এসেছে মিডিয়ার মাধ্যমে। তাতে জাতীয় ইস্যুগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে নির্বাচনে ভোটারদের কাছে, এমন বক্তব্যই এসেছে। সরকারের ব্যর্থতা, ১৪ দলীয় জোটের মধ্য ঐক্য না থাকা, বিরোধী দলকে তুচ্ছ তাছিল্য করা, সরকারের পক্ষ থেকে ব্যপক প্রচারণা চালানো হয়নি প্রার্থীদের পক্ষে, সব কিছু্তেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের ষড়যন্ত্র দেখা, সব মৌলবাদীরা একত্র হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন সবাই। আর বলছেন, দেশের মানুষ খালি পরিবর্তন চায়, মনে করে, নতুন কেউ আসলেই “সব পাওয়ার দেশ হয়ে যাবে”।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো মেয়র নির্বাচনে যারাই জিতেছে পর পরবর্তীতে তারাই ক্ষমতাশীন হয়েছে। ১৯৯১ সালে ঢাকার মেয়র নির্বাচনে হানিফ জিতেছিলেন, ১৯৯৪ সালে মহিউদ্দিন চৌধুরী জয় পেয়েছিল চট্টগ্রামে। পরে ৯৬ তে ক্ষমতায় এলো আওয়ামী লীগ।  ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে এই চার সিটি নির্বাচনে জয় পেয়েছিল লীগ। আর আওয়ামী লীগের ক্ষমতার দেড় বছরের মাথায় ২০১০ সালে মহিউদ্দিন চৌধুরী হেরে যাওয়ার কারণ সুষ্পষ্ট ছিল। মহিউদ্দিন চৌধুরী “ধরাকে সরা জ্ঞান” ভেবে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও নানা বিষয়ে পাত্তা দিচ্ছিলেন না শুনা যাচ্ছিল। আর চট্ট্রগ্রাম শহরের অন্যতম সমস্যা জলাবদ্ধতার সমাধান করেনি তিনি।
অনেকগুলো কারণ মিলেই এই চার সিটি নির্বাচনে এমন “হোয়াইট ওয়াশ” হয়েছে  আওয়ামী  লীগ। কিন্তু কি শিক্ষা নেবে আওয়ামী লীগ? কী করার আছে জাতীয় নির্বাচনের ছয় সাম আগে এমন একটি সতর্ক বার্তা পেয়ে?
তারা কি বিরোধী দলের দাবির তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নেবে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি আবুল হোসেনকে দেয়া “দেশ প্রেমিক” ম্যাডেল প্রত্যাহার করে নেবে? অনির্বাচিত মশিউরদের বিদায় করে দেবে? পদ্মা সেতু না হওয়ার জন্য দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাইবে? শেয়ার বাজার কেলেংকারীর হোতাদের বিচারের আওতায় আনবে? ডেসটিনি ও হলমার্কের বিষয়ে কি হবে? বিশ্বজিৎ? ছাত্রলীগ? যুবলীগ?
সরকার কি পারবে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গা নদীর পানি ন্যায্যা হিস্যা আদায় করতে? টিপাই মুখে বাঁধ বন্ধ করতে? তিস্তার পানি বন্টনে চুক্তি করতে? কিংবা সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন করতে? বন্ধ হবে কি সীমান্তে গুলি করে মানুষ হত্যা?
আর সামনে আসছে রোজা, ঈদ। সারা দুনিয়াতে উৎসবকে সামনে রেখে জিনিস পত্রের দাম কমে, আর সোনার বাংলায় তার হয় উল্টো। বাড়ে দাম। বাড়বে এবারও। দামের পাগলা ঘোড়ার মুশে কি লাগাম পড়াতে পারবে? কত টাকা হবে ভোজ্য তেল, পিঁয়াজ, বেগুনের কেজি? আইন শৃংঙ্খলা পরিস্থিতি কি নিয়ন্ত্রণে থাকবে? চাঁদাবাজী, ছিনতাইয়ের ঘটনা কি বন্ধ করতে পারবে? বিশেষ করে পুলিশের চাঁদাবাজী? যুদ্ধাপরাধীদের রায় হলে কিংবা রায় কার্যকর হলে কি জামায়াতকে শান্ত রাখতে পারবে সরকার? কোনো পথচারী পুড়ে মারা পড়বে নাতো? পরবে কি দলীয় কোন্দল মেটাতে? পারবে কি ১৪ দলীয় জোটের দূরুত্ব দূর করতে?
এসব অনেক প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করছে আগামী দিনের সরকারের ভবিষ্যৎ। নির্ভর করছে নব গঠিত গাজিপুর সিটি নির্বাচন ও ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশনের ফলাফল। আর জাতীয় নির্বাচন। তবে ঐতিহাসিকরা বলে রেখেছেন ১৯৩৭ সালের পর এই উপমহাদেশে কোনো দলই টানা দুই বার ক্ষমতায় আসেনি। তবে এর ব্যতিক্রম হবেই না এমন কথাও নেই। কারণ, যা না হওয়ার কথা, তেমনটা অ তো ঘটে।
লেখক: রিপোর্টার; একাত্তর টেলিভিশন