কোরআন শরীফ পোড়ানোর বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং নেই কেন!

মোশাররফ হোসেন মুসা :: মুসলিম ধর্মালম্বীরা কোরআন শরীফকে পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে সম্মান ও মান্য করে থাকে। সেজন্য কোরআনের সামান্যতম অবমাননা তাদের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। একই কারণে কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে বহু জায়গায় তুলকালাম কান্ড ঘটে থাকে, এমনকি প্রাণহানীর ঘটনাও দেখা যায়। গত ৬মে হেফাজতে ইসলাম কর্তৃক ঢাকা অবরোধকালে মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক তান্ডব ঘটে। সেদিন কতিপয় দুর্বৃত্ত বায়তুল মোকাররম এলাকায় খুচরা দোকানগুলোতে অগ্নিসংযোগ করলে প্রায় ৬৩৫টি কোরআন শরীফ পুড়ে যায়। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জামায়াত-বিএনপি ও হেফাজতের নেতা-কর্মীরা দাবি করেন আওয়ামীলীগের কর্মীরা ছদ্মবেশে এসে কোরআনে আগুন দিয়েছে। আওয়ামীলীগের বক্তব্য, জামায়াত-বিএনপি ইস্যু সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এ অপকর্ম করেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষের বক্তব্য- এ অপকর্ম যারাই করুক না কেন, তাদেরকে সনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা উচিত। মজার বিষয় হলো, যারা নিজেদেরকে ইসলাম ধর্মের রক্ষক হিসেবে দাবি করেন এবং প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতে রাজী বলে সংকল্প ব্যক্ত করে থাকেন-তারা এ বিষয়ে একেবারেই নিশ্চুপ। প্রসঙ্গক্রমে কোরআন শরীফ পোড়ানোকে কেন্দ্র করে পাবনা শহরে সংঘটিত একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

ঘটনাটি ১৯৮৬ সালের শেষের দিকের। শিমুল বিশ্বাস তখন বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর উদীয়মান নেতা (তিনি বর্তমানে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা এবং খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী)। সে সময় ঢাকায় জামায়াত কর্মীদের হাতে একজন শ্রমিক নেতা মারা গেলে এর প্রতিবাদে শিমুল বিশ্বাসের নেতৃত্বে ছাত্রমৈত্রী পাবনা শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এক সময় মিছিলের কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক ছাত্র শিবির অফিসে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে অফিসের আসবাবপত্র সহ কাগজপত্র পুড়ে যায়। পরদিন এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে শিবির দাবি করে অগ্নিসংযোগের কারণে অফিসে রক্ষিত কয়েকটি কোরআন শরীফ পুড়ে গেছে। তারা জামায়াত নেতা মাওলানা সোবহানের নেতৃত্বে (তিনি বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ মামলায় কারাবন্দী) দোষীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। স্থানীয় আওয়ামীলীগ সে আন্দোলনে সমর্থন দিলে আন্দোলনটি ব্যাপকতা লাভ করে। শুধু তাই নয়, জামায়াত কর্তৃক আয়োজিত পাবনা টাউন হলে অনুষ্ঠিত এক বিরাট প্রতিবাদ সভায় আওয়ামীলীগ থেকে নির্বাচিত এমপি ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল (পরবর্তীতে বিএনপি’র নেতা এবং বর্তমানে প্রয়াত) উপস্থিত হয়ে জামায়াতের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি কোরআনের পোড়া অংশ প্রদর্শন করে দোষীদের ২৪ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতারের দাবি করেন। পুলিশ এর কয়েকদিন পর শিমুল বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করে। এ ঘটনায় শিমুল বিশ্বাসকে প্রায় ৬ মাস হাজত খাটতে হয়। বায়তুল মোকাররম এলাকার কোরআন পোড়ানোর ঘটনাটি তার চেয়েও ভয়াবহ ও মর্মান্তিক। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভিডিওতে ছবি দেখে দোষীদের গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকে এ ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক ছবিতে দেখা যায় জাতীয় পার্টির দুই জন কর্মী (তাদের মধ্যে একজন এরশাদের  দেহরক্ষী) বৃক্ষকর্তন ও গাড়ি ভাংচুর করছে। এরশাদ এঘটনায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের কাছে কৈয়িফত তলব করেছেন । বর্তমানে বিএনপি বলা শুরু করেছে তারা হেফাজত কর্মীদের আপ্যায়ন করেছে মাত্র, জ্বালাও-পোড়াও কর্মকান্ডে বিএনপির কেউ অংশগ্রহণ করেনি । কিন্তু জামায়াত-হেফাজত নেতা কর্মীরা রহস্যজনক কারণে এ বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছে। হেফাজত সমর্থক জনৈক ব্যক্তির মতে-  হেফাজত কর্মীরা এই-ই প্রথম ঢাকায় গেছে । খুচরা দোকানগুলোতে যে কোরআন শরীফ বিক্রি হয় সেটা তাদের জানা ছিলনা । ভাবখানা যেন এই- তাদের বিশ্বাসের বাইরে কোন বই-পুস্তুক থাকা উচিত  নয় এবং  সেগুলো পোড়ানোও তেমন দোষের নয় । তাদের বেলায় যেটা দুর্ঘটনা অন্যদের বেলায় সেটি অবমাননা। সকলের জানা রয়েছে, তাদের এই কুপমূণ্ডূক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মুসলিম সমাজ  আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে বহুদুরে অবস্থান করছে ।  সেজন্য প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায়   এনে ধর্মব্যবসায়ী রাজনীতিকদের মুখোশ  উন্মেচন করতে হবে। সে সঙ্গে ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নয়া রেঁনেসাও সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক : গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক
ঈশ্বরদী, পাবনা। ফোন : ০১৭১২-৬৩৮৬৮২