মানবউন্নয়ন সূচক অগ্রগতিতে বাংলাদেশ

মো. আবুল হাসান ও খন রঞ্জন রায় :: ১৫ মার্চ শুক্রবার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০১৩ সালের যে মানব উন্নয়ন সূচক প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশ ১৮৭ টি দেশের মধ্যে ১৪৬ তম হয়েছে। গড় আয়ু, স্বারতা, শিা এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে সারাবিশ্বে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউএনডিপি। ৬৯ দশমিক ২ বছর গড় আয়ু, জনপ্রতি ৪ দশমিক ৮ বছরে শিাগ্রহণ এবং ১ হাজার ৭৮৫ ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে মানব উন্নয়ন সূচকে এবারে বাংলাদেশের এই অবস্থান।
দণি এশিয়ার মানব উন্নয়নে সবচেয়ে এগিয়ে শ্রীলঙ্কা। দেশটির বৈশ্বিক অবস্থান ৯২তম এবং উচ্চপর্যায়ভূক্ত। বাংলাদেশের সরকারি নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই এখন মানবসম্পদ উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা মানবসম্পদ উন্নয়নের মধ্য শ্রেণীর দেশে উন্নীত হতে পারলে অধিক জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ পারবে না তা বিশ্বাস করা মুশকিল।
এবারের মানব সম্পদ উন্নয়ন প্রতিবেদনের প্রতিপাদ্য হলো ‘দেিণর উত্থান: বৈচিত্র্যময় বিশ্বে মানব অগ্রগতি’। বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশ বেশ ভালো অগ্রগতি লাভ করেছে। যে কয়েকটি দেশের অগ্রগতি বেশ দ্রুত এগুলো হলো চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, দণি আফ্রিকা ও তুরস্ক।
কিন্তু বাংলাদেশ, চিলি, ঘানা, মরিশাস, রুয়ান্ডা, থাইল্যান্ড ও তিউনিশিয়ার মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দ্রুততম সময়ে উন্নতি করা বিশ্বের ১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। তারপরও প্রত্যাশিত নয়।
১৯৫০ সালে চীন, ভারত, ও ব্রাজিল মিলে বিশ্ব অর্থনীতির ১০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করত। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি – এই ছয় সনাতনী শক্তির হিস্যা ছিল বিশ্ব অর্থনীতির অর্ধেক। অথচ আগামী ২০৫০ সালে চীন, ব্রাজিল ও ভারত বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশ জোগান দেবে বলে আশা করছে গবেষকদল। দেিণর দেশগুলোর মধ্যে নতুন বাণিজ্য আর প্রযু্িক্তর অংশীদারিত্বই এই প্রসারণের মূল চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের উৎপত্তি পাকিস্তান নামক ব্যর্থ রাষ্ট্র থেকে। এক প্রান্তে পশ্চিম পাকিস্তান অন্য প্রান্তে পূর্ব পাকিস্তান মাঝখানে ১৪ শত মাইল ভারত। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামক এক হাস্যকর রাষ্ট্রের জন্ম দেয় জিন্নাহ। বর্তমানে দণি এশিয়ার ৮ টি দেশের মধ্যে পাকিস্তান হচ্ছে সবচেয়ে অনিরাপদ দেশ। পশ্চাৎপদ নারীশিানীতি, জন্ম থেকে সামরিক শাসনে জর্জরিত। জঙ্গিদের অভয়াশ্রম। মার্কিনীদের ড্রোন হামলায় সার্বভৌমত্ব লঙ্গণ হচ্ছে। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত। কারণে অকারণে প্রতিবেশিদের সাথে যুদ্ধে জাড়িয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর পড়ন্ত বিকালে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পরাজিত সেনাপতি মুক্ত আকাশের নিচে আত্মসমর্পনের গ্লানি পৃথিবী নামক গ্রহটি যতদিন থাকবে ততদিন পাকিস্তনীদের তাড়া করবে।
প্রকৃতির নিয়মেই পরাজয় পিছনের দিকে চলে। হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানিকে ধাবিত করে। আর স্বাধীনতা ও মুক্তি সামনের দিকে পথ চলে। বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য হাজার বছরের। নিজস্ব কালচারের বর্ণছটায় আলোকিত বাঙালির ঐতিহ্য দেখে বিমোহিত পুরো বিশ্ব। একটি জাতির ঐতিহ্য এতটা সমৃদ্ধিশালী হতে পারে তা অনেকেরই মনে বিস্ময় সৃষ্টি করে। গত শতকের বায়ান্নতে রক্তের দামে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পর ৭১ এ মহান বিজয় ছিনিয়ে আনতে লাখ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে দেশটির প্রতি ইঞ্চি জমি। পৃথিবীতে ভাষার জন্য যেমন কোন জাতি রক্ত ঝরায়নি, তেমনি স্বাধীনতার বেদিমূলে ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুলাখ মা বোনের সম্ভ্রম উৎসর্গের কোন দ্বিতীয় নজিরও খুঁজে পাওয়া যাবেনা।  নজিরবিহীন আত্মত্যাগের দামে বিজয়ের সোনালি সূর্য ছিনিয়ে আনার অবিস্মরণীয় গৌরব, শৌর্য-বীর্য, দেশপ্রেমের দ্যুতি নিরন্তর অফুরন্ত আলোর যোগান দিয়েছে।
অথচ উন্নত বিশ্বের কথা বাদ দিলেও দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ মানব উন্নয়ন সূচকে অনেকটা পিছিয়ে আছে। বরাবরের মতো এবারও দণি এশিয়ার মানবসম্পদ উন্নয়নের শীর্ষে আছে শ্রীলঙ্কা। মালদ্বীপ, ভারত ও ভূটানের অবস্থান যতাক্রমে ১০৪, ১৩৬ ও ১৪০তম। সেখানে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে যুগলবন্দী হয়ে ১৪৬ তম স্থানে থাকার লজ্জা পেতে হয়।
বাংলাদেশের মানব সম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনায় মহান ভাষা আন্দোলন, ৬৯ গণ অভ্যূত্থান মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ ল শহীদের জীবন উৎসর্গ পৃথিবীর সপ্তম জনবহুল দেশ বিবেচনায় রাখতে হবে। পরিসংখ্যানে নীচের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে উপরের দিকে মনোযোগ হতে হবে। প্রথম থেকে সপ্তমের মধ্যে স্থান নির্ধারণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে ২০১৩ নরওয়ে শূন্য দশমিক ৯৫৫ স্কোর অর্জন করে ১ম স্থান দখল করেছে। ২য় অস্ট্রেলিয়া, ৩য় আমেরিকা, ৪র্থ নেদারল্যাণ্ড, ৫ম জার্মানি। তাদের এই অর্জনের চালিকা শক্তি হলো মানবসম্পদ উন্নয়নের ডিপ্লোমা শিা। নরওয়ে মূল শিতি জনগোষ্ঠীর ৮২ শতাংশ অস্ট্রেলিয়  ৭৭শতাংশ, নেদারল্যাণ্ড ৬৮ শতাংশ, জার্মানি ৬৪ শতাংশ ডিপ্লোমা প্রযুক্তি শিা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। আমেরিকা ৪৩১৭ টি বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে স্বদেশী বিদেশীদের অধ্যয়নের সুযোগ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে গুটিকয়েক বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স চালু। মাত্র ২ শতাংশ শিার্থী ডিপ্লোমা শিা গ্রহণের সুযোগ প্রাপ্ত হয়।
শিাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়ে থাকে। যে জাতি যত বেশি ডিপ্লোমা শিায় শিতি সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিাই ব্যক্তিকে উন্নতির ধারায় নিয়ে যায়। শিা ব্যক্তির দেহ মনের পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে তাকে একদিকে যেমন আধুনিক ও কর্মউপযুক্ত করে তোলে অন্যদিকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থেকে নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণের মানসিকতা তৈরি করে। শিাই ব্যক্তির ভেতরকার সত্তাকে জাগ্রত করে সৃষ্টিশীল কর্মে অনুপ্রাণিত করে তোলে।
একবিংশ শতাব্দী হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। একবিংশ শতাব্দীতে ডিপ্লোমা শিায় উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। ডিপ্লোমা শিা ছাড়া কোন জাতিই উন্নতির শিখরে উঠতে পারে না। আমরা জানি বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক দিয়ে অনেক অগ্রসর। এ অধিক জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা না গেলে কখনোই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধিত হবে না। তা করতে গেলে আধুনিক প্রযুক্তি শিার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ডিপ্লোমা শিার েেত্র রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাহলে মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেেশর অবস্থান কাক্সিত স্থানে উপনীত হবে।

মো. আবুল হাসান, সভাপতি
খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব
ডিপ্লোমা শিা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।
৪৭, মতি টাওয়ার, চকবাজার, চট্টগ্রাম।
০১৭১১ ১২২৪২৫, ০১৮২০ ১৩০০৯০