সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন গ্রামীণ উন্নয়ন

এস এম মুকুল :: বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হলে গ্রাম বাংলার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কথাটি যত সহজভাবে বলে ফেললাম_ কাজগুলো তত সহজভাবে করা হয় না। স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী ৪২ বছরের ইতিহাস তাই বলছে। বলা হয়ে থাকে তিনটি খুাঁিটর ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। আর এই তিনটি খুটির অন্যতম একটি হলো_ আমাদের গ্রাম বাংলার কৃষিখাত। খাদ্য ও কৃষিজাত উৎপাদনে পুরোটাই আসে এই গ্রামের কৃষিখাত থেকে। কিন্তু ৪২ বছরে এই কৃষিখাতের অবহেলার যেন শেষ নেই। বরং রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষগুলোর ভাগ্য নিয়েও ছিনিমিনি খেলা হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বাস করতেন_ গ্রামের উন্নয়নের মাঝেই নিহিত আছে দেশের উন্নয়ন। গ্রামীণ মানুষের কৃষি খাতের উন্নয়ন ঘটাতে পারলেই দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। তিনি মনে করতেন_ কৃষি মানে শুধু ফসল উৎপাদন নয়, কৃষিজাত ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ, কৃষকের নায্যমূল্য, কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্য ব্যবহার এসব সমন্বিত মাধ্যমে কৃষক এগিয়ে যাবেন সমৃদ্ধির পথে। তাহলেই ঘটবে প্রকৃত ও স্থায়ী উন্নয়ন। কারণ কৃষক না টিকতে পারলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যাবে না।

এই গ্রাম এবং এই গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষগুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। শুধু প্রকৃতি আর ঐতিহ্যগত কারণে নয়_ আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং খাদ্য চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে গ্রামবাংলার ভূমিকা অনন্য, অসাধারণ। আমরা শহুরে আয়েশী জীবনে টাকার বিনিময়ে সব কিছু কিনে-কেটে খেতে পারছি এই গ্রামের মানুষের অক্লান্ত, অমানুষিক পরিশ্রমের কারণে। আমরা কি কখনো তা ভেবে দেখি? গ্রাম থেকে শহরে এসে শহুরে চাকচিক্য, আভিজাত্য আর যান্ত্রিকতার গোলক ধাঁধায় আমাদের জীবন থেকে মুছে যায় গ্রামের মায়া জড়ানো স্মৃতি। অথচ এই শহর টিকে আছে গ্রামের জন্য। শহরের প্রতিটি পরিবারের মূল শেকড় সেই গ্রামের চিরচেনা মাটি। সেই কৃষক বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বজন-সহোদর আর কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোই আমাদের প্রকৃত আপনজন। আমাদের শহরের জীবন যেন মায়ার সব স্মৃতিকে ধুয়ে-মুছে নিয়ে যাচ্ছে বিবেক-বোধহীন যন্ত্র-মানবীয়তার দিকে।

আগেকার গ্রামের বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধির বাস্তবতা অথবা জৌলুশ এখন আর নেই। গ্রামে নেই গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ। জলকেলির নদী যেন নিষ্প্রাণ সরু খাল। গ্রামগুলোতে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, কবুতর, পালন হয় না আগের মতো। বিশেষ কিছু এলাকা ছাড়া সবজি চাষও হয় না আনাচে-কানাচে, বাড়ির আঙিনা-উঠানে। এ কারণে আকাশ সমান মূল্যে পেঁৗছেছে মাছ, মাংশ, সবজি ও ফলের দাম। এখন গ্রামে কাজের মানুষ পাওয়া না। পেলেও উচ্চ মজুরিতে। গ্রামে শ্রমিক না থাকায় মধ্যবিত্ত গৃহস্থরা অস্তিত্বের সঙ্কটে। শহর যেন সব মানুষের একমাত্র উপার্জনক্ষেত্র। এমন ধারণায় গ্রামীণ মানুষ শহরের দিকে ঝুঁকছে স্রোতের মতো। ফলে শহরগুলোতে মানুষের চাপ ক্রমে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। বাড়ছে কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের চাপ, জানজট, আবাসন সমস্যা, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সঙ্কট। বাড়ছে চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, পাচার, অবৈধ ব্যবসা এবং মাদকতা। কাজের ব্যবস্থার অভাবে অপরাধ জগতের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ছে অনেকে।

একথা অস্বীকার করার কোনোই উপায় নেই যে, দেশকে সুন্দর আর দেশের মানুষকে সুখীর করার জন্য প্রয়োজন গ্রামীণ উন্নয়ন। এজন্য গ্রামমুখী প্রকল্প স্থাপন আর গ্রামীণ সঞ্চয়ের সমাবেশ ঘটানো দরকার। আমরা জানি, সমৃদ্ধ রাষ্ট্র জাপান প্রায় ২০০ বছল আগে মেইজি শাসনামলে গ্রামীণ শিল্পের উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়। আজ আধুনিক সভ্যতার যুগেও জাপান মনে করে তাদের শিল্পের মূল শক্তি গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। বাংলাদেশ গ্রাম প্রধান, কৃষিনির্ভর দেশ। এদেশের মানুষ উদ্যমী ও পরিশ্রমী। এদেশের মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিও অসাধারণ। পৃষ্ঠপোষকতা ও দিকনির্দেশনা পেলে এ দেশের জনগণ গ্রামে গ্রামে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের কুটির শিল্প গড়ে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশে গ্রামের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। এই গ্রামগুলোই আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার অপার শক্তি। এই গ্রাম ও গ্রামের মানুষগুলোকে প্রযুক্তি, পরিকল্পনা, মনিটরিং, ঋণ সহায়তা, বীজ সহায়তা, প্রকল্প সহায়তা দিলে প্রতি গ্রামে একটি করে হলেও ৯০ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের প্রকল্প গড়ে উঠতে পারে। প্রতিটি প্রকল্পে ২০ জনের কাজের সংস্থান হলে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান হতে পারে। ফলে মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে। গ্রামে উৎপাদন বাড়বে। ৪-৫ লাখ টাকা খরচ করে এদেশের মানুষকে বিদেশে যেতে হবে না। সে টাকা দিয়েই সে আত্মনির্ভরশীল হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারবে।

এবার পাঠকদের কয়েকটি গ্রামের উন্নয়ন সফলতার খবর জানাব। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার পাতিলাপুর ও সংলগ্ন ৯টি গ্রামের প্রায় ৬ হাজার নারী টুপি শিল্পের কাজে নিয়োজিত। সেখানে বছরে প্রায় ৬০ হাজার পিস কারুকাজের টুপি তৈরি হয়। যার প্রতিটির গড়মূল্য প্রায় ১ হাজার টাকা। এই টুপি চলে যায় দেশের সীমানা পেরিয়ে ওমান, কুয়েত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। গড়ে প্রতি বছর গ্রামটিতে প্রায় ৬ কোটি টাকার টুপি তৈরি হয়। আরেক গ্রামের গল্প শুনুন_ শেরপুরের গ্রামটির নাম হাপুনিয়া। সে গ্রামের নারী পুরুষ তৈরি করছেন শনের ডালা ও ঝুড়ি। এই হাপুনিয়া গ্রামটি ডালা বা ঝুড়ি তৈরির গ্রাম হিসেবে সুখ্যাতি পেলেও এর আশপাশের প্রায় ২৫টি গ্রামের প্রায় ৫ হাজার নারী পুরুষ যুক্ত হয়েছে এক পেশায়। এই গ্রামগুলোতে তৈরি হয় প্রায় আড়াই শ’ ডিজাইনের ডালা। এই ডালা শুধু দেশের বাজারে নয়, ছড়িয়ে পড়েছে- জাপান, থাইল্যান্ড, জার্মান, অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। অর্জিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।

আরো শুনুন, বরিশালের বাউফল উপজেলার ১৪টি ইউনিয়েনের ৬ হাজার পরিবার গাভী পালন করে। সেখানে একটি গাভী বা মহিষ প্রতি প্রতিদিন গড়ে ২ লিটার দুধ দিলে ১২ হাজার লিটার দুধ পাওয়া যায়। যার মূল্য গড়ে ৪০ টাকা করে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা হিসেবে মাসিক আয় হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। এবার জানুন রাজশাহীর নাটোরের খোলাবাড়িয়া গ্রামের গল্প। এই গ্রামের নামই পাল্টে গেছে কাজের গুণে। গ্রামের এক বৃক্ষপ্রেমিক আফাজ পাগলা বাড়ির পাশে ঘৃতকুমারীর গাছ লাগিয়ে বদলে দিয়েছে গ্রামটির নাম। খোলাবাড়িয়া এখন ঔষধি গ্রাম নামেই অধিক পরিচিত। ত্রিশ বছর আগে সেই আফাজ পাগলার ঘৃতকুমারীর চারা গাছের বদৌলতে বদলে গেছে পুরো গ্রামবাসীর জীবনযাত্রা। গ্রামের ১৬শ’ পরিবার এখন ঔষধি গাছের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই গ্রামে মোট ২৫ হেক্টর জমিতে ঔষধি গাছের চাষাবাদ হয়। বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে ‘ভেষজ বহুমুখী সমবায় সমিতি’। ঔষধি চাষাবাদের জন্য এ গ্রামের নারীদের বলা হয় ‘বনজরানী’। এই গ্রামের মাটিরও নাম দেয়া হয়েছে ‘ভেষজ মাটি’। গ্রামটিতে ৫০০ কৃষক সব সময় ভেষজ চাষাবাদ করেন। এসব নার্সারিতে আছে- বাসক, সাদা তুলসী, উলট কম্বল, চিরতা, নিম, কৃষ্ণতুলসী, রামতুলসী, ক্যাকটাস, সর্পগন্ধা, মিশ্রিদানা, হরীতকী, লজ্জাবতীসহ হরেক রকমের ঔষধি গাছ।

জানা গেছে, দেশে প্রায় ১শ’ কোটি টাকার ঔষধি কাঁচামালের স্থানীয় বাজার রয়েছে। এই ঔষধি গ্রামই এ চাহিদার অধিকাংশের জোগান দেয়। ঔষধি গ্রামের এই ভেষজ চাষাবাদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশি গ্রামগুলোতেও। ঔষধি গ্রামের পর শুনুন একটি মুড়ি গ্রামের গল্প। মুড়ি ভাজাকে উপজীব্য করে জীবিকা নির্বাহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে মুড়ি ভাজা পেশাদার বিছিন্নভাবে পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ মানুষই এমন পেশার ওপর নির্ভরশীল এমন গ্রাম খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। একটি নয়; দুটি নয়, ঝালকাঠির দপদপিয়া ইউনিয়নের রাজাখালী, দপদপিয়া, তিমিরকাঠি, ভরতকাঠি ও জুরাকাঠি এই পাঁচটি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মুড়ি তৈরির ওপর জীবিকা নির্বাহ করে। এই গ্রামগুলোতে রাতদিন চলে মুড়ি তৈরির ব্যস্ততা। এই দপদপিয়ায় নাকি বছরে প্রায় দুই কোটি টাকার মুড়ি উৎপাদন হয়। গ্রামগুলোতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পালাক্রমে মুড়ি ভাজার কাজ করেন। মুড়ি তৈরিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে অনেক পরিবার দেখেছে সচ্ছলতার মুখ। তাই মুড়ি ভাজা এখন গ্রামে একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে।

গল্পগুচ্ছ থেকে বুঝাই যাচ্ছে যে, বাংলার গ্রামগুলোকে শিল্পের চাঞ্চল্যে মাতিয়ে তুলতে পারলে যে বিপ্লব ঘটবে তা জাতীয় অর্থনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এভাবে সম্ভাবনা ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পখাত চিহ্নিত করে গ্রামভিত্তিক বিশেষ শিল্প সহায়তা বা পৃষ্ঠপোষকতা করা যেতে পারে। যেমন-রাজশাহীর ঔষধি গ্রাম, শেরপুরের ডালা গ্রাম, ঝালকাঠির মুড়িগ্রাম এভাবে যেখানে যে শিল্পে সম্ভাবনা রয়েছে সেভাবে ঢেলে সাজাতে হবে গ্রামগুলোকে। গ্রামকে আর উপেক্ষা নয়। গ্রামের মানুষকে আর অবহেলা নয়। গত দুই তিন দশকে শহরগুলোর জীবনযাত্রার মান বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু গ্রামগুলো থেকে গেছে ঠিক আগের জায়গায়। তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। একারণে এখন কৃষকের সন্তান কৃষিজীবী হতে চায় না। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে গ্রামমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গ্রামীণ বিনিয়োগের কর্মকৌশল নিয়ে ভাবতে হবে। শহরকেন্দ্রিক শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়ে শিল্প স্থাপনে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। এজন্য সমবায় পদ্ধতিতে পুঁজি গঠন এবং বিনিয়োগ তৎপরতা একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয় করে তুলতে পারলে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার চেহারা পাল্টে যাবে।

এস এম মুকুল: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট