বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Unnayan Onneshanবার্তাবাংলা রিপোর্ট :: স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ’উন্নয়ন অন্বেষণে’র মতে, ক্রমহ্রাসমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুণরুদ্ধারে জুরুরি ভিত্তিতে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে পরিবর্তনসহ যথোপযুক্ত সৃজনশীল নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির অর্থনীতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত বাৎসরিক প্রাক-বাজেট প্রকাশনা (Exigency or Expediency? State of Bangladesh Economy and Development, 2012-13) মতে, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে সংহতি এনে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরূদ্ধার সম্ভব । আর এ কাজে আবর্তনশীল সীমাবদ্ধতার চেয়ে কাঠামোগত সংকট মোকাবেলার নীতিকাঠামো দরকার ।

উন্নয়ন অন্বেষণ চিহ্নিত করেছে, পরপর দুই বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কম অর্জিত হবে। বর্তমান অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার গতবছরের তুলনায় হ্রাস পাবে। বিগত অর্থবছরের সাময়িক প্রাক্কলনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৩২  শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছিল ছিল, যা পূর্ববর্তী বছরের (২০১০-১১) তুলনায় ০.৩৯ শতাংশ কম ছিল। ২০১২-১৩ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৭.২ শতাংশ হারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির প্রক্ষেপণ অনুয়ায়ী  প্রবৃদ্ধির হার ৫.৭৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক প্রাক্কলনে প্রবৃদ্ধির হার ৬.০৩ শতাংশ ধরা হয়েছে।  প্রবৃদ্ধির এই হার এই দশকের গড় হার ৬.১৬ শতাংশের চেয়েও কম। ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের শতকরা হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ ০.৪ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে এবং জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩.৬৩ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

পাশাপাশি সরকার কর্তৃক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল প্রস্তাবিত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিসহ অন্যান্য সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের ফলে দেশের নীতি নির্ধারণের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ হয়েছে এবং উক্ত সময়কালে দেশের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে।

বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গে ’উন্নয়ন অন্বেষণ’ মন্তব্য করেছে যে, রাজস্ব নীতিতে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ভোগমূলক খাতগুলোয় (যেমন ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র) ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর বদলে যোগান সংক্রান্ত খাতগুলোর সীমাবদ্ধতা দূরীকরণে তথা ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ব্যয় করতে হবে।

সরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগ রাজস্ব গুণক ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াবে, যা বর্তমানের ভোগভিত্তিক রাজস্ব ঘাটতি থেকে সম্পুর্ণ ভিন্ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে  হ্রাস না করে বরং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করবে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটে নিট কর, কর জাল, করভার, করফাঁকি এবং কৌশলে কর পরিহারের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব করেছে। বর্তমান অর্থবছরের জুলাই-মার্চে কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৪,৭৮৩ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। এই সময়ে ৭,৮০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭৩,২১৭ কোটি টাকা কর সংগ্রহীত হয়েছে।

’উন্নয়ন অন্বেষণ’ মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চারটি গুরূত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। চ্যালেঞ্জগুলো হলঃ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি,  আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান, ঋণ প্রবাহের মন্থর গতি এবং আর্থিক অন্তভূক্তির মন্থর হার। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন সত্ত্বেও ২০১৩ সালের মার্চ মাসে দেশের মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই-মার্চে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ঘটে ৭.০৩ শতাংশ হারে, যে হার ২০১১-১২ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১২.৮৮ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতে অনাদায়ী ঋণ ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে যাওয়া, নিয়ম-নীতি প্রতিপালনের ক্ষেত্রে দায়সাড়াভাব এবং পুঁজিবাজারে আস্থার অভাবে ধ্বস অব্যাহত থাকার ফলে এই খাতে জটিলতা আরও বেয়েছে।

বহি:খাতে প্রসঙ্গে ’উন্নয়ন অন্বেষণ’ বলছে, নি¤œগামী বাণিজ্য শর্ত, মূলধনী যন্ত্রপাতির ঋণাত্বক আমদানি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা এবং স্বল্পমেয়াদী উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণের পরিমান বৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক কারখানা ভবন ধ্বসের ঘটনা দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত তথা তৈরি পোশাক শিল্পকে নতুন চাপের সম্মুখীন করেছে।

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বাণিজ্য শর্ত হ্রাস পেয়ে ৮১.৯ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় ১৩.৯ শতাংশ হার কম। ২০১১-১২ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে ৪.৭৯ শতাংশ ঋণাত্বক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। অন্যদিকে, ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি আয় ৩৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কম হয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি মাসে বৈদেশিক ঋণের পরিমান পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।

উন্নয়ন অন্বেষণ চিহ্নিত করেছে যে, প্রকৃত খাত যথা কৃষি খাতের অবদান হ্রাস এবং শিল্প খাতের তুলনামূলক শ্লথগতির ফলে অর্থনীতিতে অভিঘাত পড়বে। শিল্প খাতের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ১৯৯৭-৯৮ ও ২০১১-১২ অর্থবছরের মধ্যে বার্ষিক ৩৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৪০ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে।

উন্নয়ন অন্বেষণ আরো চিহ্নিত করেছে যে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত বাজেট বরাদ্দ যথেষ্ট নয় এবং শিক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯.৯৮ শতাংশ হতে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৬.৭৬ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ২০১২-১৩ অর্থবছরে ক্রমহ্রাসমান হারে বেড়েছে।

শ্রম বাজারে আনুষ্ঠানিক খাত দীর্ঘদিন ধরেই সংকুচিত হচেছ। মোট শ্রম শক্তি ২০০২-০৩ ও ২০১০ সালের মধ্যে ২৩.৩২ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক খাতের আকার ২৬.০৯ শতাংশ কমেছে। অধিকন্তু, ছদ্ম বেকারত্বের সমস্যা আগের মতই প্রকটরূপে বিদ্যমান আছে বলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি মন্তব্য করেছে।
’উন্নয়ন অন্বেষণ’ যথোপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতির প্রকৃত খাতগুলোর উন্নয়নের জন্য দেশের তুলনামূলক সুযোগ-সুবিধাসমূহ বিবেচনায় নিয়ে কাঠামো সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »