ল্যাপটপ আর মোবাইল নিয়েই যার ঘরবসতি

সুমন সিকদার, নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরগুনার সৃজনশীল কিশোর রফিকুজ্জামান জিদনী। সবে পা রেখেছে টিন এইজের কোটায়। সারাদিন মোবাইল আর ল্যাপটপ নিয়েই তার ঘরবসতি। আর কোন চাওয়া নয়, বাবা মায়ের কাছে তার একটাই বায়না- নতুন নতুন ব্র্যান্ডের লেটেস্ট সব মোবাইল তার চাই। ততদিনে সচেতন বাবা-মাও বুঝে ফেলেছেন এই মোবাইল পাগল ছেলেটি হয়ত একদিন সবাইকে অবাক করে বানিয়ে ফেলবে নতুন কিছু। হ্যা, দেশ বিদেশের বড় বড় বিজ্ঞানীদের চোখে পড়ার মত তেমন কিছুই এখনও দেখাতে পারেনি ছোট্ট এই কিশোর। তবে আধুনিক প্রযুক্তির মোবাইল এবং ল্যাপটপের এমন কোন সফটওয়ার নেই যা জিদনীর নখদর্পনে নেই। মোবাইল, ল্যাপটপ এবং সোশাল নেটওয়ার্কের প্রতি জিদনীর ঝোঁক দেখলে যে কেউ বলতে বাধ্য হবেন নতুন কিছু আবিস্কারের পোকা তার মাথায় কিলবিল করছে। যখন তখন কোন একটি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে সে।
সম্প্রতী ওয়াইফাই হটস্পটের মাধ্যমে কোন রাউটার ছাড়াই একটি মাত্র মডেম দিয়ে একাধিক ল্যাবটব ও মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে বন্ধুদের মাঝে বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়েছে ছোট্ট এই কিশোর জিদনী। আধুনিক ল্যাবটব এবং মোবাইলগুলোতে এই অপশন থাকলেও সুস্পষ্ট কোন ধারণা না থাকায় স্থানীয়ভাবে বরগুনায় এই সুবিধাটি এর আগে সেভাবে কেউ কাজে লাগাতে পারেনি। জিদনীর প্রদর্শিত সফটওয়ারের মাধ্যমে এখন একটি আনলিমিটেড বাংলা লায়ন সংযোগ থেকে ওর চার-পাঁচজন বন্ধু একই সঙ্গে নেট সংযোগ নিয়ে ফেইসবুক, আর ডাউনলোড চালিয়ে যাচ্ছে যত খুশী তত।
জিদনীর প্রদর্শিত এই সফটওয়ারটি সবচেয়ে বেশী কাজ দেবে মফস্বলের বিভিন্ন অফিসগুলোতে। যেখানে এক সঙ্গে অনেকগুলো পিসি বা ল্যাপটপে কাজ চলে। জিদনীর প্রদর্শিত সফটওয়ারটি ব্যবহার করলে একটি মাত্র আনলিমিটেড সংযোগ নিয়ে একটি মাত্র মডেমের সাহয্যে সবগুলো পিসি বা ল্যাবটবে একই সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যাবে। এতে করে আলাদা সংযোগ ফি কিংবা পৃথক পৃথক মডেম কেনার বাড়তি খরচ সাশ্রয় হবে পুরোপুরি।
জিদনীর এই আবিস্কার এখন নতুন কোন গ্রহ আবিস্কারের চেয়েও বেশী বলে মনে করছে জিদনীর বন্ধুরা। সামান্য কয়েকটি টাকার অভাবে এতদিন যারা পিছেয়ে পড়েছিল সোশাল নেটওয়ার্কিং এর দৌড়ে তারাই আজ চুটিয়ে ফেইসবুক চালাচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা। ডাউনলোড করছে যত খুশী তত। জিদনীর একজন সহপাঠী মারজান জানায়, বিজ্ঞানের কল্যাণে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গ্রহ আবিস্কার করে চলেছে। ওইসব বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন কোন গ্রহ আবিস্কার যেমন অনেক বড় বিষয়। তেমনি জিদনীর এই ছোট্ট আবিস্কার আমাদের কাছে অনেক বড় বিষয়। জিদনীর অপর আরেক সহপাঠী কিবরিয়া জানায়, জিদনীর এ আবিস্কারের ফলে আমরা এখন দুর্দান্ত সময় কাটাচ্ছি। যখন যা মন চাইছে তাই ডাউনলোড করে ফেলছি। বিশ্বের নামীদামী সব সিনেমাগুলো এখন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। জিদনীর প্রদর্শিত এই সফটওয়ারটি স্থানীয়ভাবে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে ধনী গরীব নির্বিশেষে কিশোর ও তরুনরা তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বলে মনে করে কিবরিয়া।
বরগুনা প্রেসক্লাবের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের বরগুনা জেলা প্রতিনিধি আবু জাফর মোঃ সালেহ জানান, এই বিষয়টি নিয়ে আমরা কখনও তেমন ঘাটাঘাটি করিনি। তবে ছোট্ট কিশোর জিদনী হটস্পটের মাধ্যমে একাধিক ল্যাবটবে একইসঙ্গে সংযোগ চালানোর যে সফটওয়াটি খুঁজে বের করেছে তা দারুন কর্য্যকর। বিশেষ করে মফস্বলে যারা টেলিভিশন সাংবাদিকতা করেন তাদের ভিডিও ফুটেজ পাঠাতে জিদনীর প্রদর্শিত এই সফটওয়ারটি বেশ কাজ দেবে বলে তিনি মনে করেন।
বরগুনা শহরের একটি কম্পিউটার সার্ভিসিং সেন্টার ‘কম্পিউটার জোন’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আইটি এক্সপার্ট কৃষ্ণ কান্ত কর্মকার জানান, কিশোর জিদনীর প্রদর্শিত সফটওয়ারটি আইটি সেক্টরে নতুন কোন আবিস্কার না হলেও মফস্বল শহর বরগুনার প্রেক্ষাপটে অনেকের কাছেই তা নতুন কিছু। তার প্রদর্শিত সফটওয়ারটি ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে অনেকেই বাড়তি সুবিধা নিতে পারবে। কৃষ্ণকান্ত কর্মকার আরও বলেন, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিতে কিশোর জিদনীর এই আগ্রহ ভবিষ্যতে তাকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে তার বাবা-মাসহ কাছের স্বজনদের উচিৎ হবে তার এ আগ্রহকে উৎসাহিত করা।
বরগুনার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোঃ ফারুক মৃধা কিশোর জিদনীর পিতা। তার মায়ের নাম জেসমিন সুলতানা লিলি। একভাই এক বোনের মধ্যে জিদনী বড়। বরগুনা জিলা স্কুল থেকে এবারে সে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোটবোন জিনিয়া এবারে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বরগুনার এই ক্ষুদে আইটি বিশেষজ্ঞ জিদনীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, আইটিতে তার এ আগ্রহ তৈরীর পেছনে সবচেয়ে বেশী উৎসাহ যুগিয়েছেন তার বাবা। এছাড়া জিদনীর খুব কাছের বন্ধু তানহার প্রেরণাও তাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। পিছিয়ে থাকা উপকূলীয় জেলা বরগুনার তরুণসমাজ একসময়ে সোশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা দেশের আইটি সেক্টরের নেতৃত্ব নেবে এমন প্রত্যাশা ক্ষুদে আইটি বিশেষজ্ঞ জিদনীর।