ব্যক্তির সৌন্দর্য তার ব্যক্তিত্বে, দামি পোশাকে নয়

কিছু দিন আগে একটা গল্প পড়ছিলাম। একজন গৃহিণীকে তার স্বামী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন। সেই বাজেট দিয়ে তাঁকে পুরো পরিবারের ঈদ শপিং করতে হবে। মার্কেটে ঘুরে ঘুরে তিনি চার-পাঁচ হাজার টাকার জামা পছন্দ করছেন। তারপর মন খারাপ করে সেই দোকান থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন, কেননা এতো দামি জামা নিজে কিনলে বাড়ির অন্যদের বাজেটে টান পরবে। গল্পটাতে স্বল্প বাজেটে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণী কিভাবে ঈদের শপিং সামলান তা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।। তবে আমার মনে হচ্ছিল এই গল্পে এবং ঈদ বিষয়ক এ ধরনের অন্য আরও অনেক লেখায় আমাদের একটি জাতীয় বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে, তা হলো, যে-কোন উৎসবে আমাদের চোখ বারবার দামি জিনিসের দিকে চলে যায়। আমরা অনেকেই মনে করি, কম দামি জামা, জুতো বা গহনা নিত্যদিনের ব্যবহার্য সামগ্রী। এগুলো উৎসব-অনুষ্ঠানে গায়ে জড়ানো যায় না, তা যতই সুন্দর হোক না কেন।

আমি শিক্ষক পরিবারের সন্তান। আমার বাবা-মা সীমিত আয় করতেন আর বেশ কিছু প্রিন্সিপাল মেনে চলতেন। তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনাকাটায় আমাদের আসক্তি তৈরি হতে দেন নি। আমাদের পরিবারে আমরা রোজার ঈদে জামা, জুতো সব নতুন কিনতাম। দু-একটা জিনিস উপহারও পেতাম। সেখান থেকে কোরবানির ঈদের জন্য হয় একটা জামা রেখে দিতাম অথবা কোরবানির ঈদে পুরনো জামাই পরতাম। কখনো সাধ্যের বাহিরে গিয়ে অতিরিক্ত দামি জিনিস আমার মা আমাদের জন্য কিনতেন না। আমরা ছোটকাল থেকেই শিখেছি জামা-জুতো-গহনার সৌন্দর্য দামে নয়, রুচিতে। কম দামি জামাতেও স্মার্টভাবে চলা যায়।

এই মূল্যবোধ আজকাল মানুষের মধ্য থেকে কমে যাচ্ছে। এখন হলো ঝলমলে পণ্যের যুগ। বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী-পুরুষ দাম দিয়ে চকমকে ইন্ডিয়ান/পাকিস্তানি পোশাক কিনতে পছন্দ করেন। আমাদের বিয়ের শাড়ির দাম পাঁচ অংকের সংখ্যা ছাড়িয়ে ছয় অংক ছুঁতে চায়। আজকাল কনের বিয়ের ভারতীয় শাড়ি বা পাকিস্তানি লেহেঙ্গা এত ভারি হয় যে বিয়ের দিন ছাড়া আর কখনও মেয়েটি তা আর পরতে পারে না। ছেলেদের বিয়ের শেরওয়ানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এর ফলে একদিকে আমাদের দেশীয় পণ্য মার খেয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে অনুষ্ঠান মানেই দামি জিনিস — এই মনোভাব মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের উপর আর্থিক এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।

শুধু নিজেদের জন্যই নয়, উপহার কেনার সময়ও আমরা বেশিরভাগ মানুষই মনে করি দামি জিনিস কিনতে হবে। বিয়ে বাড়িতে সবসময় দামি উপহার নিয়ে যেতেই হবে এটা প্রকৃতপক্ষে খুবই ভুল ধারণা। একটি নবদম্পতি নরম সুতির কাপড়ের বিছানার চাদর বা বিয়ের ছবি রাখার জন্য একটা অ্যালবাম পেলেও খুবই খুশি হয়। এগুলো তুলনামূলকভাবে কম দামি কিন্তু খুবই প্রয়োজনীয় পণ্য। ঈদে ছোট্ট ভাগ্নির জন্য জামা কিনবেন? একটু খোঁজ নিলেই দেখবেন ঈদ উপহার হিসেবে চাচা-ফুপু-খালার দেওয়া অনেকগুলো জামায় তার ড্রয়ার এরই মধ্যে ভরে আছে। ভাগ্নিকে বরং কম দামি স্টাইলিশ ক্লিপ, পুতির গহনা বা ডিজনী ক্যারেকটারদের ছবিসহ ছোট্ট একটা হ্যান্ডব্যাগ কিনে দিন, দেখবেন সে বেশি খুশি হবে। নিউমার্কেট বা ডিসিসি টাইপ মার্কেটে এ ধরনের প্রচুর জিনিস পাওয়া যায়।

ঈদে বা কোনো অনুষ্ঠানে আমার স্বামী যে পাঞ্জাবী বা ফতুয়া গায়ে দেবে তা দামি এবং অনেক কারুকাজওয়ালা হতে হবে, সেটা আসলে আমাদের নিজেদের তৈরি করা একটা ধারণা মাত্র। সুতি বা তাঁতের কাপড়ের তৈরি একরঙা পাঞ্জাবীতেও ছেলেদের খুবই স্মার্ট দেখায়। মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার ব্যক্তিত্বে। আর ব্যক্তি যত সিম্পল থাকবেন তত তার ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠবে। অন্যদিকে আপনি আপনার বসের টিনএজার ছেলেকে অনেক দামি একটা শার্ট উপহার দিলেন। অথচ সে হয়তো কমদামি একটা বডি স্প্রে পেলেই খুশি হতো। কেননা বডি স্প্রে সে প্রতিদিন ব্যবহার করে, ফলে তা বারবার কিনতে হয়। অন্যদিকে, নতুন আরেকটা শার্ট তার অসংখ্য শার্টের ভিড়ে আপনিই হারিয়ে যাবে।

উপরের কথাগুলোর মানে এটাও নয় যে আমি আপনাকে সবসময় নিউমার্কেট বা গাউসিয়া থেকে কম দামি জিনিস কিনতে বলছি। আমরা বেশিরভাগ মানুষই মনে করি দেশীয় ব্র্যান্ডর দোকানগুলোতে শুধু দামি জিনিসই পাওয়া যায়। কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আজকাল দেশীয় ব্র্যান্ডের দোকানে বিভিন্ন দামের মধ্য গহনা, ব্যাগ, টপস, পাঞ্জাবী, বিছানার চাদর, কুশন কভার হরেক রকম পণ্য পাওয়া যায়। সেখান থেকে সহজেই আপনি নিজের জন্য বা উপহার দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় এবং রুচিশীল পণ্য কিনতে পারেন। এছাড়াও ঘরের নিত্যব্যবহার্য পণ্য এবং ইলেকট্রনিকস পণ্যও ভালো উপহার হতে পারে।

তার মানে আমি যে দামি পোশাকের বিপক্ষে বিষয়টা সে রকমও না। আমি নিজের জন্য সাধ্যের মধ্যে এবং বাছাই করা কয়েকজনের বদলে কম দাম দিয়ে আত্মীয়-পরিজন সবার জন্য উপহার কেনার পক্ষে। আমার খুব ইচ্ছা আমার কন্যা তার বিয়ের দিন গোলাপী বা সাদা রঙের একটা এক্সক্লুসিভ জামদানি শাড়ি পরবে। ডিজাইনারের বানানো সেই শাড়িটার আর কোন দ্বিতীয় কপি থাকবে না। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে সে রুপা এবং মুক্তা মিলানো গহনা পরবে। এটা একটা স্বপ্ন। হয়তো সত্যি হবে বা হবে না। কিন্তু আমার এই স্বপ্ন যদি তার ভালো লাগে তাহলে সেটির বাস্তবায়ন করার জন্য যে রুচি এবং সামর্থ্যের প্রয়োজন তা অর্জনের দায়িত্ব তার নিজের। আমার বা হবু স্বামীর পয়সা উড়িয়ে সে তার বিয়ের এক্সক্লুসিভ শাড়ি কিনবে তা হবে না।

তাই আপনার যদি সাধ্য না থাকে তাহলে সেভাবেই নিজের মানসিকতাকে তৈরি করুন এবং কমদামের মধ্যে রুচিশীল পণ্য নিজে ব্যবহার করার এবং অন্যকে উপহার দেওয়ার অভ্যাস করুন। এতে লজ্জার কিছু নেই। আপনার যদি অনেক টাকা থাকে তারপরও দাম দিয়ে কোন পণ্য বা অন্যের রুচিকে বিচার না করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন ‘সিম্পল ইজ বিউটিফুল’। আর কারও জন্য উপহার কেনার সময় তার প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিন। চিন্তা করে বের করুন সে কী পেলে বেশি খুশি হবে যা আপনার সাধ্যের মধ্য কেনা সম্ভব। দেখবেন উপহার দেওয়া এবং পাওয়া — দুটোর আনন্দই হাজারগুণ বেড়ে যাবে।

উপমা মাহবুব : উন্নয়ন পেশাজীবী এবং কলামিস্ট