শুক্রাণুদের দৌড় প্রতিযোগিতা এবং একটি ডিম্ব

নাসরীন মুস্তাফা

এতকাল শুনে এসেছি, পুরুষের লাখ লাখ শুক্রাণু জীবনের স্বাদ নেওয়ার জন্য ছুটতে থাকে নারীর ডিম্বের দিকে। দৌড় প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয় একটিমাত্র শুক্রাণু, যে পায় ডিম্বের নাগাল। ডিম্বকে নিষিক্ত করতে পারে বিজয়ী শুক্রাণু।

এতকাল শুনে আসা এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হতে যাচ্ছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। জীবনের কলকাঠি নাকি নড়ে ডিম্বের ইচ্ছায়। কোন্ শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হবে, তার সিদ্ধান্ত নেয় ডিম্বটি নিজেই। ডিম্বই বেছে নেয় পছন্দমতো শুক্রাণু। দ্রুতগতির শুক্রাণু তত্ত্ব তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে জীবন সৃষ্টিতে ডিম্বের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়।

সম্ভবতঃ নারীর প্রজনন অঙ্গে কোষের উপাদানের মাঝে গোপন কোন রহস্য আছে, যার ফলে শুক্রাণুর আগমনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং পছন্দনীয় জিনগত উপাদানওয়ালা শুক্রাণুকে ইয়েস কার্ড দেওয়া সম্ভব হয়।
বিস্তারিত বলার আগে কলেজে জীববিজ্ঞান ক্লাসে পড়া পানেট স্কোয়ারের কথা আরেকবার বলে নেই। খুব সোজা এক ডায়াগ্রাম। বোঝার জন্য ঝানু পণ্ডিত হওয়ার কোন দরকার নেই। গ্রেগর মেন্ডেলের বংশগতিবিদ্যার নিয়ম বোঝানোর তিনটি সূত্র আছে। প্রথমটি বলছে, কোনও জীবের এক জোড়া বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য একটি জিন থেকে আরেকটি জিনে সঞ্চারিত হওয়ার সময় একত্রিত হলেও এই বৈশিষ্ট্য দু’টি কখনো মিশ্রিত হয় না, বরং ডিম্ব আর শুক্রাণুর মিলনে যে আদি কোষ তৈরি হয়, সেই তৈরির সময় বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য দু’টি একটি আরেকটি থেকে আলাদা হয়ে যায়। এর ফলে প্রতিটি কোষ আসলে এক বৈশিষ্ট্যের জিনকে সাথে রাখতে পারে।

মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্রে স্বাধীন বণ্টনের কথা বলা হয়েছে। কোনও জীবের দুই বা তার চেয়ে বেশি জোড়া বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যওয়ালা জিন থেকে স্বাধীনভাবে আলাদা হয়ে যায় ডিম বা শুক্রান্ত গঠনের সময়েই।

তৃতীয় সূত্রে বলা হচ্ছে, কোন ব্যক্তির জিনগত বৈশিষ্ট্য তৈরি হয় দৈবচয়নের মধ্য দিয়ে একটি ডিম আর একটি শুক্রাণুর জোড়া বাঁধার পর প্রাপ্ত দৈবচয়নের মাধ্যমে পাওয়া জিনের বৈশিষ্ট্যসমূহ মিলে তৈরি করা অনেক অনেক বৈশিষ্ট্য দিয়ে। জিনগত বৈশিষ্ট্যের দৃশ্যমান প্রকাশ নির্ধারিত হয় পরিবেশ আর যে বৈশিষ্ট্যটির দাপট বেশি, তার মাধ্যমে।

মনে আছে, মেয়েদের কলেজে পড়তাম। ভবিষ্যতে নীল চোখের বিদেশি ছেলে বিয়ে করবে বলে আমাদের এক বান্ধবী ঘোষণা দিতেই আমরা পানেট স্কোয়ারের উদাহরণ দিয়ে বলতাম, চল্ খুঁজে দেখি, তোর ছেলেপুলের চোখ নীল হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি? খেলাটা মজার। বড় হাতের বি আর ছোট হাতের বি-এর খেলা।

প্রথম ছকের প্রথম কলামে বড় হাতের বি আর দ্বিতীয় কলামে ছোট হাতের বি বসিয়ে এই ছকের প্রথম সারিতে বড় হাতের বি আর দ্বিতীয় সারিতে ছোট হাতের বি বসিয়ে দেখতাম, কখন ছোট হাতের দু’টো বি এক হয়। ছোট হাতের ‘বিবি’ মানে, ছেলেপুলের চোখ নীল হবে। আর বড় হাতের ‘বিবি’ মানে, ছেলেপুলের চোখ আমার বান্ধবীর রং পাবে। নীল চোখের ছেলে বিয়ে করেও নীল চোখের সন্তান পাওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা নেই।

আমি এখনো দেখতে পাই, আমার সেই বান্ধবীটা মুখ ভার করে ফেলেছিল। আমরা সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলতাম, দৈবচয়ন হচ্ছে মেন্ডেলের সূত্রের মূল কথা। র‌্যান্ডমনেস যেখানে, সেখানে খেলাটা অনিশ্চিত হতেই পারে। অন্য বিজ্ঞানীরাও তা-ই বলছেন। কোন্ শুক্রাণু ডিম্বকে নিষিক্ত করতে পারবে, সেটা ঐ শুক্রাণুর ‘ভাগ্য’। নির্দিষ্ট করে বলার উপায় নেই।

কোন মিশ্রণ সন্তানের বৈশিষ্ট্য ঠিক করে দেবে, এটা বলারও কোন উপায় নেই। এরকম আরেকটি তথ্য জানা ছিল, কোন্ শুক্রাণুটি দৌড়ে প্রথম হবে তা আগে থেকে জানা না থাকলেও দৌড়ে প্রথম হতে পারা শুক্রাণুই ডিম্বকে জিতে নেয়। ডিম্বের কোন ভূমিকা থাকে না। নিষিক্ত হওয়ার জন্য চুপচাপ অপেক্ষায় থাকে অবলা ডিম্ব।

পুরো বর্ণনাটাই এবার বদলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। চ্যালেঞ্জে পড়ে গেছে মেন্ডেলের সূত্র। প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী ড. জোসেফ এইচ নাদিয়্যু প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন যে, সব সময় ডিম্ব আর শুক্রাণু দৈব চয়নের মাধ্যমে জোড়া বাঁধে না। কখনো কখনো ডিম্ব বেছে নেয়, কোন্ শুক্রাণু দ্বারা সে নিষিক্ত হবে।

জেনেটিক্স নামের আন্তর্জাতিক জার্নালে ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর তারিখে প্রকাশিত হয়েছে ড. জোসেফের লেখা নিবন্ধ Do Gametes Woo? Evidence for Their Nonrandom Union at Fertilization.’ আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন অবশ্যই। ড. জোসেফ মেন্ডেলের সূত্রকে অনুসলন করে গবেষণাগারে দু’টি পরীক্ষা চালিয়েছেন, যার ফলাফল হিসেবে ধারণামত অনুপাতে জিন-এর মিশ্রণ ঘটার কথা থাকলেও তা হয়নি।

জিনের যে জোড়া পাওয়া গেল, তার সাথে মিলে যায় মায়ের বহনকারী নির্দিষ্ট জিন। ড. জোসেফ দৃঢ়ভাবে বলছেন, ডিম্ব নিষিক্তকরণ অবশ্যই দৈব ঘটনা নয়, কোন না কোন মেকানিজম আছে, যার সাহায্যে ডিম্ব এমন শুক্রাণুকে বেছে নেয়, যার আছে স্বাভাবিক জিন, পরিবর্তিত বা মিউটেটেড জিন নয়। ড. জোসেফ একে জেনেটিক্যালি বায়াসড ফার্টিলাইজেশন বলে আখ্যা দিচ্ছেন। সম্ভবতঃ নারীর প্রজনন অঙ্গে কোষের উপাদানের মাঝে গোপন কোন রহস্য আছে, যার ফলে শুক্রাণুর আগমনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং পছন্দনীয় জিনগত উপাদানওয়ালা শুক্রাণুকে ইয়েস কার্ড দেওয়া সম্ভব হয়।

বলা বাহুল্য, এই গবেষণার পর নারী এবং নারী প্রজনন অঙ্গ সম্বন্ধে চলমান গবেষণার উপর নতুন করে আলোকপাত হ’ল। সন্তানের জিনগত কম্পোজিশনকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নারীর হাতে, এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হলে বংশগতি বিজ্ঞান নতুনভাবে পথ চলা শুরু করবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।