বার্তাবাংলা ডেস্ক »

সদরঘাটে নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার এড়াতে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর যাত্রীবাহী ও মালবাহী ক্যাবল কার (রোপওয়ে) চালুর প্রস্তাব দিয়েছে ভারতের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। ক্যাবল কার করতে সম্ভাব্যতা যাচাই বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

গত ১৯ মার্চ ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কনভেয়র অ্যান্ড রোপওয়ে সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের প্রতিনিধি দল সদরঘাট পরিদর্শন করেন। পরদিন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। ওই বৈঠকে তারা ক্যাবল কার নির্মাণের বিষয়ে একটি প্রেজেন্টেশন দেন। ওই বৈঠকে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও সচিব মো. আবদুস সামাদ উপস্থিত ছিলেন।

৩০ মার্চ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখর চক্রবর্তী নৌ-পরিবহন সচিবের কাছে তাদের প্রস্তাব সংবলিত চিঠিটি দেন। তবে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রস্তাব অনানুষ্ঠানিক, বিদেশি কোনো কোম্পানির প্রকল্প প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে আসতে হবে।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুস সামাদ বলেন, ‘ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের ক্যাবল কার নির্মাণের একটা প্রস্তাব পেয়েছি। আমরা এটা পরীক্ষা করে দেখব। কারণ বুড়িগঙ্গার ওপর ক্যাবল কার নির্মাণের বিষয়ে আমাদেরও আগ্রহ রয়েছে। তবে সম্ভাব্যতা যাচাই করে যদি আমরা দেখি এটা করা যুক্তিযুক্ত এবং টেকনিক্যাল পার্সনরা যদি মত দেন, তখনই এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

সরাসরি প্রস্তাব দেয়ার বিষয়ে সচিব বলেন, ‘তারা আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে, সেজন্য সরাসরি একটা প্রস্তাব আমাকে দিয়েছে। তবে এটি ইআরডির মাধ্যমেই প্রসেস হবে।’

সদরঘাটে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে- জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাবে বলেছে, সদরঘাট দিয়ে বিপুল সংখ্যক যাত্রী বিশৃঙ্খলভাবে নদী পার হন। শুধু যাত্রীরাই নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লঞ্চে করে যাত্রীরা সদরঘাটে আসেন।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ‘আমরা মনে করি, যারা নদী পার হন কিংবা সদরঘাট দিয়ে দূর-দূরান্তে যান; সার্বিক এ ব্যবস্থা পৃথক হওয়া উচিত। এছাড়া দেখা গেছে, নদী পার হতে গিয়ে ডিঙি নৌকা উল্টে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। বুড়িগঙ্গার দুই তীর ক্যাবল কারের মাধ্যমে সংযুক্ত করলে তা প্রতিদিনের যাত্রী পারাপার সহজ করবে এবং নদী ও নদীর তীর পরিষ্কার রাখতে সহায়ক হবে। টার্মিনালগুলো দূরপাল্লার লঞ্চ ভেড়া ও ছেড়ে যাওয়ার জন্য নিরাপদ রাখা যাবে।
টুইন রোপওয়ে সিস্টেমের মাধ্যমে সদরঘাটকে সিমসন ঘাট ও লালকুঠি ঘাটের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, ক্যাবল কারে যাত্রী উঠানো ও নামানোর জন্য দু’প্রান্তে বহুতল বিশিষ্ট কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ডের সঙ্গেও বৈঠক করে প্রতিনিধি দলটি। ওই সভায় প্রস্তাব দেয়া হয়, ক্যাবল কারের সেবা কোনো ধরনের বিপত্তি ছাড়াই তারা সদরঘাট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবেন।

জরিপ কার্যক্রমের পর অনুমতি-সাপেক্ষে তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রজেক্ট রিপোর্টের সঙ্গে প্রাক্কলিত প্রকল্প ব্যয়ের হিসাবও দাখিল করার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে। কোম্পানিটি একটা সার্ভেরও প্রস্তাব দিয়েছে চিঠিতে।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) ভোলা নাথ দে বলেন, ‘বিদেশিদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়ার পদ্ধতি হলো- অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে আসতে হয়। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও আসতে পারে। প্রস্তাব আসলে প্রথম যে কাজটা হয় সেটা হলো, এটার একটা ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করা হয়। আমরা যদি রোপওয়ে করি…নৌপথ আমাদের, তবে রোপওয়ে করলে সেটা কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হবে, এটা কি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে হবে, নাকি আমরা করব…। এ বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয় থাকবে।’

‘আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব আসলে সরকার এর সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখবে। এরপর মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যদি সিদ্ধান্ত নেয় আমরা এটা করব, তখন হবে। এটা এখনও ভেরি মাচ ইনিশিয়াল স্টেজে রয়েছে’ বলেন অতিরিক্ত সচিব।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সদরঘাটে নৌকায় যাত্রী পারাপারে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। নৌকা উল্টে যায়, বড় বড় লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লেগে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ সমস্যাগুলো দূর করার জন্যই মূলত ক্যাবল কারের কথা বলা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘তবে ক্যাবল কারের নিরাপত্তার বিষয় আছে। এটা ইংল্যান্ড কিংবা ইউরোপ নয় যে কয়েকজন পর্যটক এটাতে চড়বে। সদরঘাটে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার গার্মেন্টেসের কর্মী এপার থেকে ওপার যায়। এছাড়া এ নদী দিয়ে বড় বড় জাহাজ আস-যাওয়া করে। বাল্কহেড (বালুবাহী কার্গো) চলে। নৌকা বন্ধ করে রোপওয়ে করলে কতগুলো রোপওয়ে লাগবে। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের যুগে ফলদায়ক হবে না, এমন কিছু তো করা যাবে না। আমি তো ইকোপার্কের জন্য রোপওয়ে করছি না।’

‘মানুষ এখন নৌকায় ১০ টাকায় পার হচ্ছে, রোপওয়েতে কত নেয়া হবে? কস্টিং বেশি হলে তো মানুষ উঠবে না। পাহাড় থাকা দুর্গম এলাকায় সাধারণত ক্যাবল কার দেখা যায়। সেখানে সদরঘাটের মতো এত ঘণবসতিপূর্ণ এলাকায় রোপওয়ের স্থাপনা কীভাবে হবে, সেটাও একটা চ্যালেঞ্জ’- জানান ওই কর্মকর্তা।

 

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »