বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Dating App

গত দুই বছর ধরে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছি, নিজের সঙ্গে, মনের সঙ্গে, বিবেকের সঙ্গে। এভাবে জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকা সত্যিই খুব কষ্টের। এমন জীবন কখনও চাইনি। অনেক সুখের ও শান্তির একটি পরিবার ছিল আমাদের। স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ছিল আমার জগত। এক ঝড়েই কী থেকে কী হয়ে গেল। আমার বুকভরা কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারি না। কষ্টগুলো চেপে রাখতে হয় সন্তানদের কাছে। মা হয়ে বাবা লে. কর্নেল আজাদের ভূমিকা পালন করা আমার জন্য সত্যিই কষ্টের।

র‌্যাবের সাবেক গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন স্ত্রী সুরাইয়া সুলতানা।

তিনি বলেন, ৩১ মার্চ ছিল লে. কর্নেল আজাদের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বার বার ফিরে যেতে মন চায় আগের দিনগুলোতে। এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

সুরাইয়া বলেন, ‘ওরা (সন্তানেরা) আমাকে কাঁদতে দেখলে আরও বেশি মন খারাপ করে। সন্তানদের কচি মুখগুলো দেখে বাবা ছাড়া ওদের জীবন ভাবতেই আমার বুকটা ব্যথায় ভরে যায়। আমি নিজেকে নিয়ে এক কদমও ভাবি না। ভাবি শুধু তিনটি ফুটফুটে বাচ্চার কথা। আমাকে যে শক্ত হয়ে ওদের দায়িত্ব পালন করতেই হবে। আমিই ওদের বাবা, আমিই ওদের মা। আমি জানি বাবা হওয়া খুব কঠিন। তারপরও আমি মনে করি একজন মা সন্তানদের জন্য সবকিছু করতে পারে।

ছবির সবাই আছেন, শুধু নেই লে. কর্নেল আজাদ

তিনি বলেন, কষ্টের হলেও সত্যি এটাই যে বাস্তবতা বুঝিয়ে দেয় কে আপন, আর কে পর। গত দুই বছরে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এই সময় অনেক কাছের মানুষও বহু দূরে চলে গেছেন। মনের অজান্তেই অনেক দূরের মানুষ কত আপন হয়ে গেছে তা টেরও পাইনি। সবাই বলে বিপদে পড়লে মানুষ চেনা যায়, সত্যিই তাই।

তিনি আরও বলেন, যাদের সঙ্গে আমার না আছে কোনো রক্তের সম্পর্ক, না আছে সামাজিক সম্পর্ক, তারাই আজ আমার সবচাইতে কাছের মানুষ। মাঝে মাঝে মনে হয় হয়তো জীবনে এমন ভাল কিছু কাজ করেছিলাম বলেই এই মানুষগুলো আজ আমার পাশে আছে। আমার স্বামীর কত প্রিয় বন্ধু-বান্ধব, কোর্সমেট, কলিগ, কিছু প্রিয় মানুষ ছিল। তারা আজ কেউই আমাদের পাশে নেই। এমন কী যোগাযোগও রাখেনি আমাদের সঙ্গে। এই লোকগুলো এক সময় আমার বাসায় এসেছে কাজের জন্য, সুবিধার জন্য, আমার স্বামীর পেছনে ঘুরেছে। আজ তারা কোথায়?

সুরাইয়া সুলতানা বলেন, স্বামীর পরিচয়ের পাশাপাশি নিজের পরিচয় ও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চাই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে যাব নিজের আত্মসম্মানের জন্য, সন্তানদের জন্য। আমার বিশ্বাস আমি পারবই। পারতে আমাকে হবেই হবে।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বামী দেশের জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান নারী মনে করি। কারণ দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রাণ বিসর্জন দিতে সবাই পারে না। সেই রকম সৎ, সাহসী, যোগ্য ও দেশ প্রেমিক সবাই হতে পারে না। আমার বিশ্বাস সন্তানরাও একদিন বাবার জন্য গর্ববোধ করবে। সেদিন তারা বুঝবে তাদের প্রিয় বাবা দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন। তাদের বাবা ছিলেন জাতীয় বীর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার বিনীত অনুরোধ একজন শাহাদাত বরণকারী হিসেবে যেন আমার স্বামী লে. কর্নেল আজাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা দেয়া হয় অর্থাৎ শহীদ ঘোষণা করা হয়। তাহলে আমার সন্তানেরা মানসিকভাবে একটু শান্তি পাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমিও আমার সন্তানরা এই দুঃসহ স্মৃতি বুকে আঁকড়ে বেঁচে আছি। এটা অনেক কষ্টের, যা কেউ কখনও বুঝবে না। আমি নিজের ও সন্তানদের দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছি মহান আল্লাহর উপর। তাকে আকঁড়ে ধরে বাঁচতে চাই। তিনি সব পরিস্থিতিতে আমাদেরকে রক্ষা ও সাহায্য করবেন। আপনারা আমার ও আমার সন্তানদের জন্য দোয়া করবেন। মহান রাব্বুল আলামিন যেন আমাকে খাঁটি মুসলমান হিসেবে কবুল করেন।’

উল্লেখ্য, বিগত ২০১৭ সালের ২৫ মার্চ সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শিববাড়ি এলাকার ‘আতিয়া মহল’ জঙ্গি আস্তানায় পরিচালিত অপারেশন টোয়াইলাইট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যান র‌্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ। ঘটনাস্থলের ৩০০ গজ দূরে জঙ্গিদের রেখে যাওয়া বোমা বিস্ফোরিত হলে স্প্রিন্টার তার বাম চোখ ভেদ করে মস্তিস্কে আঘাত হানে।

সন্তানকে এভাবে আর কোনোদিন আদর করা হবে না মায়ের

তাৎক্ষণিক তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে জরুরি ভিত্তিতে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা সিএমএইচে এ স্থানান্তর করা হয়। পরের দিন ২৬ মার্চ উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে করে সিংগাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা শেষে ২৯ মার্চ দেশে এনে পুনরায় ঢাকা সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ মার্চ রাত ১২টার দিকে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

লে. কর্নেল আজাদের জন্ম ১৯৭৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়ন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজিতে এমএ করেন। ১৯৯৬ সালে ৩৪তম ব্যাচ বিএমএ লং কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালে পুলিশের এলিট ফোর্স খ্যাত র‌্যাব-১২ এর কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান। ওই বছরই তাকে পদোন্নতি দিয়ে গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পরিচালক করা হয়। ২০১৩ সালে তিনি র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হন। মৃত্যুর মাসখানেক আগে তিনি পদোন্নতি পেয়ে লে. কর্নেল হন।

অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম (মরণোত্তর) পেয়েছেন তিনি।

Dating App
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »