বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Dating App

স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগছে কুড়িগ্রাম জেলার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ। ওষুধ থাকলেও চিকিৎসক নেই, আবার কোথাও কোথাও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছে না গ্রহিতারা। এক প্রকার জোড়াতালি দিয়ে চলছে জেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলো। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ লোকবল সংকটকে দায়ী করে বলছে শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা না গেলেও মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানো হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নাগেশ্বরী উপজেলার মাদারগঞ্জ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে তালা ঝুলছে। সেবা গ্রহণের জন্য আসা মিলন আহমেদ, মর্জিনা বেগম, লিটন সরকার, হাজেরা বেগম জানান, শুনেছি প্রতিদিন এটা খোলার কথা। কিন্তু এসে দেখি বন্ধ। প্রায় সময়ই এটা বন্ধ থাকে। এসে শুনলাম রবি আর বুধবার নাকি খোলে।

স্থানীয় জোবেদ, মুকুল ও মজিবর বলেন, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন ডাক্তার ছিল। কয়েক বছর থেকে তাকে দেখি না। তিনি কোথায় আছেন আমরা জানি না। মাঝে মধ্যে একজন ভিজিটর আর সহকারী ডাক্তার এসে দুয়েকদিন ওষুধ দেয়। তারা আরও বলেন, শুনেছি অনেক প্রকার ওষুধ দেয় সরকার বিনামূল্যে। কিন্তু এখানে কোনো চার্ট না থাকায় আমরা বুঝতে পারি না কত প্রকার ওষুধ দেয়া হয়। শুধু প্যারাসিটামল, মেট্রো, কৃমিনাশকসহ কয়েক প্রকার ওষুধ দেয়।

স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বে থাকা হরিজন সম্প্রদায়ের কার্তিক দাস বলেন, আমার মা মীনা দাস ৭/৮ বছর ধরে নাম মাত্র টাকায় এখানে ঝাড়ু দেবার কাজ করে। মায়ের বয়স হবার কারণে মাঝে মধ্যে আমি ও আমার স্ত্রী ঝুমা রাণী এ কাজ করি। মাঝে মধ্যে আমরাও রোগীদের ওষুধ দেই।

স্থানীয় মেম্বার জালাল উদ্দিন বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি টুকিটাকি চলছে। এতে করে সাধারণ মানুষের খুব একটা উপকারে আসছে না। এখানে নিয়মিত একজন ডাক্তার দিলে অবহেলিত এ এলাকার গরিব সাধারণ মানুষের উপকার হতো।

এ বিষয়ে উপ-সহকারী কমিউনিটি অফিসার হাফিজুর রহমান জানান, নিয়মিতভাবেই খোলা হয়। এখানে গড়ে প্রতিদিন ৭০/৮০ জন রোগী দেখা হয় এবং তাদেরকে ১৮/২০ প্রকার ওষুধ প্রদান করা হয়ে থাকে। আমি সপ্তাহে দু’দিন এবং একজন ভিজিটর শাপলা বেগম তিনি দুদিন দেখেন।

নিয়মিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে না যাওয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার বাড়ি ফুলবাড়ি উপজেলার বড়ভিটা গ্রামে। এখান থেকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দূরত্ব নদী পার হয়ে গেলে প্রায় ৪০ কিলোমিটার আর সড়ক পথে যেতে হলে ৬০/৭০ কি.মি. ঘুরে যেতে হয়। এছাড়াও আমাকে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডিউটি করতে হয়।

পার্শ্ববর্তী কেদার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে দেখা যায়, সেখানে শিশু ও প্রসূতি মায়েদের জন্য তিনটি বেড রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার হয় না। এখানে কোনো ডেলিভারিও হয় না। এই প্রতিষ্ঠানের উপ-সহকারী কমিউনিটি অফিসার আজাহারুল জানান, আমিসহ একজন কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ প্রোভাইডার নাহিদ হাসান এ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছি। ফার্মাসিস্ট, অফিস সহায়ক এবং এমএলএসএস নেই। সপ্তাহে তিন দিনের জন্য বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের সালমা বেগম এসে ভিজিটরের কাজ করেন। আর এ প্রতিষ্ঠানে ডাক্তার আবু বক্কর সিদ্দিক ২০১৪ সালে যোগদান করলেও তিনি বদলি হয়েছেন নাকি ডেপুটিশনে অন্য কোথাও আছেন বিষয়টি আমার জানা নেই।

নারায়ণপুর ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি কখন খোলে আর কখন বন্ধ হয় কেউ তা জানে না। এ কেন্দ্র থেকে কেউ স্বাস্থ্য সেবাও পায় না বলে অভিযোগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধির। এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি খোলেও না, এখানে ওষুধ তো দূরের কথা কোনো সেবা পাওয়া যায় না। বিষয়টি কয়েক বার নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানোর পরেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। আমার এলাকায় স্বাস্থ্য সেবা পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

রামখানা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র (মানোন্নীত)। এখানে ২৪ ঘণ্টায় ডেলিভারি সেবা দেয়া হয়। দীর্ঘদিন থেকে একজন ভিজিটর রওশানারা বেগম প্রতিষ্ঠান চালালেও গত মাসে উপ-সহ কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার খায়রুল ইসলাম যোগদান করেন। আয়া নাসরিন বেগম ও অফিস সহায়ক সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ডেপুটিশনে কুড়িগ্রামেই থাকেন। এ দু’জন প্রভাবশালী হওয়ায় একাধিকবার চেষ্টা করেও তাদেরকে আনা সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা নরমাল ডেলিভারি হবার সুযোগ সুবিধা রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানে। ডেলিভারি রোগীদের কিছু সামগ্রী বিনামূলে দেয়া হয় আর কিছু বাইরে থেকে কিনতে হয় রোগীদের। এছাড়া ২২ প্রকারের ওষুধ সপ্তাহে চারদিন বিতরণ করা হয়ে থাকে।

ভিজিটর রওশনারা বেগম জানান, সমস্যায় জর্জরিত কোয়ার্টারে থাকতে হয়। বাউন্ডারি দেয়াল না থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় সব সময়। তিনি আরও বলেন, একাধিকবার মিটিংয়ে বাউন্ডারি দেয়ালের কথা বলা হয়েছে। শুধু আশ্বাসই পেয়েছি। কিন্তু আজ অবধি বাস্তবায়ন হয়নি।

সদ্য যোগদান দেয়া উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার খায়রুল ইসলাম বলেন, যা ওষুধ পাই তা মাসের ১৫ দিনে শেষ হয়ে যায়। বাকি দিন রোগীদের ফিরিয়ে দিতে হয়। আর ওষুধ নাই একথা বললেই শুনতে হয় ওষুধ বিক্রি করার অভিযোগ। এছাড়াও আয়া ও অফিস সহায়ক না থাকায় কার্যক্রম চালাতে নানান সমস্যা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বলেন, আয়া এবং পিয়ন ছাড়া একটা অফিস কীভাবে চলতে পারে? তাহলে আমরা কি সমস্যায় আছি?

স্থানীয় আব্দুল খালেক বলেন, মাঝে মাঝেতো ডাক্তারই পাইনা। এখন আসছে ভালোই চিকিৎসা হয়। আয়া থাকলে আরও পরিষ্কার থাকতো।

রামখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম সরকার বলেন, আমি স্বাস্থ্য কেন্দ্র কমিটির সভাপতি। তেমন যাওয়ার সুযোগ হয় না। তবে কোনো অভিযোগও দেয়নি কেউ।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটিতেও ২৪ ঘণ্টা নরমাল ডেলিভারি করার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। মেডিকেল অফিসার পদটি শূন্য। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাসহ আয়া ও মাঠকর্মীদের পাওয়া গেলেও উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার রশিদুল ইসলাম সরকার মন্টুকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া ২২ প্রকারের ওষুধ সপ্তাহে চারদিন বিতরণ করা হয়ে থাকে বলে জানা যায়।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৯টি উপজেলায় ৩টি পৌরসভা এবং ৭৩টি ইউনিয়নে লোক সংখ্যা ২৫ লাখ ২৭ হাজার ৫৪৫ জন। এরমধ্যে ১২ লাখ ৮৮ হাজার ১৪৬ জন পুরুষ, মহিলা ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৭ জন। সক্ষম দম্পতি ৫ লাখ ৩০ হাজার ৫৭১ জন। এরমধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের কনডম, ইনজেকশন, খাবার বড়ি,পিলসহ বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করছেন ৪ লাখ ১৯৯জন। সিএর গ্রহণকারীর হার ৭৬.৩৭ ভাগ।

রাজারহাট, নাগেশ্বরী, রৌমারী এবং রাজিবপুর উপজেলায় মেডিকেল অফিসার পদ শূন্য। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসারের পদ শূন্য রয়েছে রৌমারী এবং রাজিবপুর উপজেলায়। উলিপুর ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা মেডিকেল অফিসার ডেপুটিশনে আছে। স্টোর কাম অফিস ভূরুঙ্গামারী, রাজারহাট এবং ফুলবাড়ি উপজেলায় নেই।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (সিসি) ও ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক ডা. নজরুল ইসলাম জানান, জনবল সংকট থাকলেও ওষুধ সংকট নেই।

তিনি বলেন, জেলায় পরিবার পরিকল্পনার আওতাধীন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলো ভালোভাবেই চলছে। তবে চরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোর সমস্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের নিজস্ব ভবন না থাকায় দেড় যুগ ধরে ভাড়া বাসাতে অফিস পরিচালনা করায় কার্যক্রমে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

Dating App
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »