চাকরির প্রলোভনে ব্ল্যাংক চেকে ফাঁসলেন প্রতিবন্ধী যুবক

হোসাইন আহমদ

মানুষ মানুষের জন্য। একে-অপরের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয় দেয় মানুষই। চাকরি করে নিজে প্রতিষ্ঠা পাবেন, সেই সঙ্গে পরিবারের জন্য ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে পারবেন- এমন প্রত্যাশা সবারই। চাকরি নামের সেই সোনার হরিণের হাতছানি পেতে নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্ল্যাংক (ফাঁকা) চেক দিলেন চাকরিদাতাকে। সেই চেক দিয়েই ফাঁসলেন প্রতিবন্ধী এক যুবক।

চাকরির আশায় সরল বিশ্বাসে ব্ল্যাংক চেক দেন হোসাইন আহমদ নামে সিলেটের প্রতিবন্ধী ওই যুবক। স্বপ্নের চাকরি-তো জোটেনি, এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দৌঁড়াতে হচ্ছে আদালতে আদালতে। কাঁধে ৬০ লাখ টাকার চেক প্রত্যাখ্যানের মামলা! জন্মের পর থেকে ডান হাতটি অকেজো তার। হাতের কবজি ও পাঁচ আঙ্গুল নেই। প্রতিবন্ধী হোসাইন আহমদ এখন ন্যায় বিচার পেতে জামালপুরের বিচারিক আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চে আর্জি নিয়ে ছুটছেন। চারদিকে এখন তার অন্ধকার। চোখে-মুখেও হতাশার ছাপ। কী করবেন ভেবে কূল পাচ্ছেন না তিনি।

প্রতারণার শিকার প্রতিবন্ধী হোসাইন আহমদ মামলার খরচ জোগাতে সিলেটের মোগলাবাজারের পৈত্রিক মুদি দোকানটিও খুইয়েছেন। সমাজসেবা অধিদফতর থেকে প্রাপ্ত প্রতিবন্ধী ভাতা (নিবন্ধিত আউডি নম্বর-১৯৮৭৯১১৩১৬০৩৮৭২১২-০২) দিয়ে চলতে হয় তাকে।

তার বিরুদ্ধে করা চেক প্রত্যাখ্যানের মামলা বিচারাধীন জামালপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। গ্রামের বাড়ি সিলেট থেকে জামালপুর আদালতে যেতে হচ্ছে নিয়মিত। ন্যায় বিচারের আশায় চলতি মাসের শুরুতে হোসাইন আহমদ আসেন হাইকোর্টে। এরপর আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের জন্য গত সপ্তাহেও আসতে হয় উচ্চ আদালতে। ফলে আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।

ভুক্তভোগী এ প্রতিবন্ধী জানান, জামালপুর সদর থানার তেঁতুলিয়া গ্রামের মমিনুর রহমানের সঙ্গে সিলেটে পরিচয় হয় তার। তিনি সিলেটের বিভিন্ন এলাকার পোল্ট্রি খামারে মুরগির বাচ্চা সরবরাহ করতেন। মমিনুর তাকে জানায় সিলেটে তার পোল্ট্রির আড়ত রয়েছে। একপর্যায়ে হোসাইন আহমদকে আড়তে চাকরির প্রস্তাব দেন মমিনুর। চাকরির শর্ত একটাই, ব্যাংকের চেক বইয়ের খালি পাতা দিতে হবে। চাকরির আশায় হোসাইন তুলে দেন তার ইসলামী ব্যাংকের চেক বইয়ের একটি খালি পাতা। এরপর চাকরি দেব, দিচ্ছি বলে গড়িমসি শুরু করেন মমিনুর। চেকের পাতা ফেরত পেতে বারবার অনুরোধ করেও বিফল হন হোসাইন। চেকের পাতা ফেরত না পাওয়ায় ২০১৩ সালের ২৭ জুলাই মোগলাবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি।

২০১৬ সালের ৯ মার্চ মমিনুর রহমান ওই খালি চেকের পাতায় ৬০ লাখ টাকা লিখে জামালপুর পৌরসভার ডাচ বাংলা ব্যাংকে জমা দেন। কিন্তু পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল চেকটি প্রত্যাখ্যান হয়। চেক প্রত্যাখ্যান হওয়ায় একই বছরের ২ মে মমিনুর লিগ্যাল নোটিস পাঠান। তিনদিন পর হোসাইন লিগ্যাল নোটিসটি পান। লিগ্যাল নোটিসের জবাব না পাওয়ায় ২০১৬ সালের ৮ জুন জামালপুর জেলা বিচারিক হাকিম আদালতে হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারায় মামলা করেন মমিনুর। মামলার তথ্য জানার পর জামালপুরের আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন হোসাইন আহমদ।

২০১৭ সালের ৪ জুলাই জামিন পান তিনি। এর মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম চলতে থাকে। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি হোসাইনের পক্ষে তার আইনজীবী একজন হস্তলেখা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে চেকটি যাচাই করার আবেদন করেন জামালপুরের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে।

আবেদনে বলা হয়, চেকের হাতের লেখা তার (হোসাইন) নয়। হস্তলেখা বিশেষজ্ঞ দিয়ে যাচাই করা হলে রহস্য উন্মোচিত হবে। কিন্তু আদালত আবেদনটি আমলে না নিয়ে আগামী ৮ মে আদেশের জন্য পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।

বিচারিক আদালতে ন্যায় বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা থেকে হোসাইন আহমদ উচ্চ আদালতে ছুটে আসেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ ধারায় বিচারাধীন মামলাটি বাতিলের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করলেও শুনানি হয়নি। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে ১৫ দিনের অবকাশ ছুটি শুরু হয়েছে। ফলে আগামী ১ এপ্রিলের আগে আবেদনটির ওপর শুনানি হচ্ছে না।

হাইকোর্টে হোসাইন আহমদের আইনজীবী খালেদ আহমদ বলেন, ‘আমরা আবেদন করেছি, কোর্টের অবকাশের পর শুনানি হতে পারে।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি খালেদ আহমেদ আরও বলেন, ‘চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে খালি চেকের পাতা নিয়েছিলেন মমিনুর রহমান। পরে নিজ হাতে টাকার অংক বসিয়ে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। বিষয়টি নিষ্পত্তি করা একদম সহজ। একজন হস্তলেখা বিশেষজ্ঞকে দিয়ে হাতের লেখা যাচাই করা গেলে ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসবে। যদি প্রমাণ হয় চেকটি হোসাইন লিখিছেন তাহলে তার সাজা হবে। না হলে অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবেন। আমি চাই, অসহায় হোসাইন হয়রানি থেকে মুক্ত হোক।’

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সহযোগিতা পেতে সুপ্রিম কোর্টের ল রিপোর্টার্স ফোরামের কক্ষে আসেন ভুক্তভোগী হোসাইন। তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি তার করুণ পরিণতির কথা এ সময় তুলে ধরেন। হোসাইন বলেন, ‘চেক জালিয়াতির এ আজগুবি মামলা থেকে আমি নিষ্কৃতি পেতে চাই। চাকরি তো দূরে থাক, নিজের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির মামলা শেষ করতে উল্টো টাকা খরচ করতে হচ্ছে।’ ভিক্ষা রেখে কুকুর সামলানোর মতো অবস্থা তার।

হোসাইন আহমদ বলেন, ‘মা-বাবা দুজনই বয়স্ক। তারা কোনো কাজ করতে পারেন না। সংসারে চার ভাই-বোন। তিন বোনের মধ্যে দুজনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট বোনটি এইচএসসি পড়তো। কিন্তু মামলার কারণে তার লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। খরচ দিতে পারি না, তাই সে আর কলেজে যায় না।’

জানা গেছে, অভিযুক্ত মমিনুর রহমান সিলেট ছেড়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। তার পাঁচটি মুঠোফোনের নম্বর পাওয়া গেলেও সবকটিই বন্ধ রয়েছে। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।