সুলতান মনসুর আদর্শ বদল করেননি

প্রভাষ আমিন

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে মৌলভীবাজার- ২ আসন থেকে গণফোরামের মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়েছিলেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। সারা দেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাত্র ৮ জন প্রার্থী জিতেছিলেন, তাদের মধ্যে সুলতান মনসুর একজন। আর ২৬ বছরের ইতিহাসে গণফোরাম প্রথমবারের মত সংসদে দুজন প্রতিনিধি পায়, সুলতান মনসুর ছাড়াও সিলেট-২ আসন থেকে গণফোরামের উদীয়মান সূর্য প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন মোকাব্বির খান।

নির্বাচনের পর বিএনপি ফলাফল বর্জন করে এবং শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে মাত্র ৬টি আসন পাওয়ায় বিএনপিতে যখন শোকের পরিবেশ, তখন গণফোরামে ছিল উৎসবের আমেজ। নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত গণফোরামের প্রথম বর্ধিত সভায় সারাদেশ থেকে আসা প্রতিনিধিরা প্রথমবারের মত সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাওয়াকে সেলিব্রেট করেন। সে সভায় দলের দুই নির্বাচিত সদস্যের শপথ নেয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত আসে। তবে বিএনপির চাপে ঐক্যফ্রন্টের ঐক্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে গণফোরাম দলের দুই এমপির শপথ নেয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

সুলতান মনসুর আওয়ামী লীগ ছাড়েননি, বরং আওয়ামী লীগই তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান সুলতান মনসুর রাজনীতিটাই করতে চেয়েছেন বলে কামাল হোসেনের সাথে ভিড়েছিলেন। আওয়ামী লীগ তাকে তাড়িয়ে দিলেও তিনি কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছাড়েননি, হৃদয়ে ধারণ করেছেন।
সুলতান মনসুর বরাবরই শপথ নেয়ার পক্ষে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত গত ৭ মার্চ গণফোরামের দুই সদস্য শপথ নেয়ার জন্য স্পিকারকে চিঠি দেয়। যদিও শেষ পর্যন্ত মোকাব্বির খান আসেননি, সুলতান মনসুর একাই শপথ নেন। শপথ নেয়ার ৬ ঘণ্টার মধ্যেই গণফোরাম সুলতান মনসুরকে বহিষ্কার করে গণফোরাম। যদিও শপথ নেয়ার পর সুলতান মনসুর জানিয়েছিলেন, দলের শীর্ষ নেতাকে জানিয়েই তিনি শপথ নিতে এসেছেন।

আবার বহিষ্কারের ঘোষণার সময় গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু জানিয়েছেন, দলের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের সিদ্ধান্তেই সুলতান মনসুরকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কে সত্য বলছেন জানি না, তবে ৭ মার্চেই সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন তিনি এবং বক্তব্য রেখেছেন। গণফোরাম থেকে বহিষ্কারের পর সুলতান মনসুরের সদস্যপদের ভবিষ্যত কী?

এই প্রশ্নের উত্তরে পরে আসছি। তার আগে আরেকটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। গণফোরাম যে সুলতান মনসুরকে বহিষ্কার করলো, দলে তার পদ কী ছিল? তিনি কবে গণফোরামে যোগ দিয়েছিলেন? সুলতান মনসুর একজন জাত আওয়ামী লীগার। ৭৫এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন সুলতান মনসুর। দিনের পর দিন কাটিয়েছেন বনে-জঙ্গলে।

১৯৮৬ সালে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি হন। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের কাতারে। ১৯৮৯ সালে তিনি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সুলতান মনসুরই ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত একমাত্র ভিপি। ২০০২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগেই তিনি মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে এমপিও হয়েছেন। কিন্তু আরো অনেক রাজনীতিবিদের মত সুলতান মনসুরেরও পদস্খলন ঘটে ১/১১এর সরকারের সময়।

অন্য অনেকে ধৈর্য্য ধরে সে বিপর্যয় সামাল দিতে পারলেও সুলতান মনসুর আর দলে ফিরতে পারেননি। মন খারাপ করে তিনি ভিড়েন ড. কামাাল হোসেনের সাথে। তবে তার আনুষ্ঠানিকভাবে গণফোরামে যোগদানের কোনো রেকর্ড নেই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে তিনি যোগ দিতেন ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে। যেহেতু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নিবন্ধিত দলের মনোনয়ন লাগে। তাই সুলতান মনসুর গণফোরামের হয়ে লড়েছেন।

সুলতান মনসুর আওয়ামী লীগ ছাড়েননি, বরং আওয়ামী লীগই তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান সুলতান মনসুর রাজনীতিটাই করতে চেয়েছেন বলে কামাল হোসেনের সাথে ভিড়েছিলেন। আওয়ামী লীগ তাকে তাড়িয়ে দিলেও তিনি কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছাড়েননি, হৃদয়ে ধারণ করেছেন।

ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ-বৈঠকে তিনি ছিলেন বিএনপির জন্য অস্বস্তির। তিনি মুজিব কোট পড়েই সমাবেশে যেতেন। বিএনপি নেতাদের পাশে বসে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করতেন। বক্তৃতা শেষ করতেন ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে।

এমনকি ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও কুলাউড়া তো বটেই বৃহত্তর সিলেটের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করেছেন। মৌলভীবাজার- ২ আসনে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ভোট দিয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকে। তাই তো সুলতান মনসুর শপথ গ্রহণের যুক্তি হিসেবে বারবার এলাকার ভোটারদের কথাই বলছিলেন।

হৃদয়ে যতই বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করুন না কেন বাস্তবতা হলো তিনি গণফোরামের মনোনয়নে নির্বাচনে তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন মির্জা ফখরুলের স্বাক্ষরে। তাই তাকে অবশ্যই দলের সিদ্ধান্ত মানতে হবে। মানেনি বলে দল তাকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু এখন সংসদ সদস্য হিসেবে তার পরিচয় কী, ভবিষ্যত কী?

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে। এখন আমরা যদি সংবিধানের শাব্দিক অর্থ বিবোচনায় নেই তাহলে অনেক যুক্তি আছে তার পক্ষে। কারণ তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেননি, দল তাকে বহিষ্কার করেছে। পদত্যাগ আর বহিষ্কার দুটি আলাদা বিষয়। সংবিধানে পদত্যাগের কথা বলা হলেও বহিষ্কারের বিষয়ে কিছু বলা নেই। আর যেহেতু তার দল সংসদে যোগ দেয়নি, তাই সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তাই সংবিধানের শাব্দিক অর্থ বিবেচনায় তার সদস্যপদ শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই।

তবে সবসময় সংবিধানের শাব্দিক অর্থ বিবেচনাই শেষ কথা নয়, অর্থের ভেতরেও থাকে অন্তর্নিহিত অর্থ। সংসদ সদস্যদের ফ্লোর ক্রসিং বা দলবদল ঠেকাতে আরো সহজ করে বললে কেনাবেচা ঠেকাতেই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এখন যদি অর্থের ফাঁক গলে সুলতান মনসুর পার পেয়ে যান, তাহলে এটা বাজে দৃষ্টান্ত হবে।

সবচেয়ে ভালো হয় দলবদলের অপরাধে সুলতান মনসুরের সদস্যপদ শূন্য ঘোষণা করা। জনপ্রিয়তা থাকলে তিনি উপনির্বাচনে জিতে আবার নতুন পরিচয়ে সংসদে আসতে পারবেন। তবে তার সদস্য পদ যদি বহালও থাকে, পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি কাটবে না। গণফোরাম থেকে বহিষ্কারের পর তিনি নিশ্চয়ই আর দলীয় পরিচয় দেবেন না। তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। কমিশন প্রয়োজনে সংবিধানের ব্যাখ্যার জন্য সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারে।

সুলতান মনসুরের শপথের পরদিন ড. কামাল হোসেন বলেছেন, মানুষের মাথা কেনা যায় না, গরু-ছাগলের মাথা কেনা যায়। যারা গরু-ছাগলের মত বিক্রি হয়, তারা দালাল হিসেবে পরিচিত। ড. কামাল হোসেন ঠিক বলেছেন। কিন্তু

বাংলাদেশে এমন মাথা বেচা দালালের অভাব নেই। সুলতান মনসুর যখন আওয়ামী লীগ ছেড়ে তার সাথে এসেছিলেন, তখনও তো এ কথাটি প্রযোজ্য হতে পারতো। মাথা বেচা অন্য দালালদের সাথে সুলতান মনসুরের পার্থক্য হলো, তিনি দল বদলালেও আদর্শ বদলাননি।