আনিসুল থেকে আতিকুল

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা বাকি ছিল, ফলাফল জানাই ছিল। আতিকুল ইসলাম ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ভোটে। ভোটার উপস্থিতি কম ছিল এমন একটা কথা চলতেই থাকবে। আবার কেন কম হলো, সেই বিশ্লেষণ অনেকে করছেন, করে চলেছেন এবং করবেনও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আতিকুল ইসলাম আগামী এক বছরের জন্য ঢাকা উত্তরের মেয়র।

‘আতিকুল ইসলাম প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মশা মারতে উদ্যমী হবেন তিনি। এটাই প্রত্যাশিত। দক্ষিণ সিটির তুলনায়, উত্তরে মশার দাপট বেশি। অল্প বিস্তর বৃষ্টি শুরু না হতেই ডেঙ্গু ও চিকন গুনিয়ার ভয় ঢুকেছে নগরবাসীর মনে। তাই এখনই নজর দেয়ার সময়। ’
প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক মাত্র আড়াই বছরেই ডিএনসিসি’তে আনেন অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন। এসব কারণে আজও তিনি নগরবাসীর কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তার মৃত্যুতে অনেক পরিকল্পনা থমকে গেছে।

আনিসুল হক তার খুব স্বল্প সময়ে যেভাবে হৃদয় জয় করেছেন, অভিনব সব কাজ করে গেছেন, আরও যেসব করতে চেয়েছিলেন, সেসবের কারণে আতিকুল ইসলামের উপর প্রত্যাশার চাপ অনেক বড়। আশা করছি প্রত্যাশার চাপে তিনি ভেঙে পড়বেন না, তবে সবারই মনে রাখা দরকার যে, তার হাতে সময় মাত্র এক বছর।

এই এক বছরে অনেক কিছু করবেন বলে যদি তিনি প্রতিশ্রুতি দেন সেটা যেমন অবাস্তব হবে, তেমনি অনেক কিছু করে ফেলবেন তাও প্রত্যাশা করা অমূলক হবে। এই বাস্তবতায় যা বাস্তবায়নযোগ্য তেমন একটা প্রচেষ্টা নেয়াই হবে তার জন্য যুক্তিযুক্ত।

২০১৫ সালের এপ্রিলে মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর নাগরিকবান্ধব কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন আনিসুল হক। এর মধ্যে, সবুজ ঢাকা কর্মসূচি, তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা থেকে ফার্মগেট রেলগেট পর্যন্ত সড়কের অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ, আমিন বাজার টু শ্যামলী সড়ক পার্কিং-ফ্রি ঘোষণা, মহাখালীতে ডিএনসিসির উইমেনস হলিডে মার্কেট, হয়রানি রোধে ঠিকাদারদের বিল অফিসে পৌঁছে দেওয়া, সড়কে আধুনিক সাড়ে চার হাজার বাস সার্ভিস চালু, কারওয়ান বাজার ডিএনসিসি মার্কেট থেকে ব্যবসায়ীদের মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতে স্থানান্তর, সড়কে এলইডি বাতি লাগানো এবং হাতিরঝিলের আদলে রামপুরা খালের পরিবর্তন ছিল অন্যতম। কিন্তু তার মৃত্যুতে এসবের মধ্যে তেজগাঁও সাতরাস্তা সংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ ও আমিন বাজার টু শ্যামলী সড়ক পার্কিং-ফ্রি ঘোষণা ছাড়া বাকি উদ্যোগগুলো থমকে যায়।

আতিকুলের সামনে অসমাপ্ত এই পরিকল্পনাগুলো এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু সবই হয়তো এই স্বল্প সময়ে সম্ভব হবে না। আতিকুল ইসলাম যখন বিজয়ের আয়োজন করছিলেন, তখনই ভাষাণটেকে একটি বস্তি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। মানুষগুলো এখন আশ্রয়হীন। দায়িত্ব নেয়ার আগেই তিনি এদের পাশে দাঁড়াবেন বলে আশা করছি।

রাজধানীর বস্তিবাসী অকল্পনীয় দারিদ্র্যে বসবাস করে। এই বাঁচার মধ্যে কোনও আনন্দ নেই। শুধুই বেঁচে থাকা। এর মধ্যে যদি সহায় সম্বল সব পুড়ে যায়, তাহলে বোঝাই যায়, কতটা বিপদে তারা আছেন।

আতিকুল ইসলাম প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মশা মারতে উদ্যমী হবেন তিনি। এটাই প্রত্যাশিত। দক্ষিণ সিটির তুলনায়, উত্তরে মশার দাপট বেশি। অল্প বিস্তর বৃষ্টি শুরু না হতেই ডেঙ্গু ও চিকন গুনিয়ার ভয় ঢুকেছে নগরবাসীর মনে। তাই এখনই নজর দেয়ার সময়।

মেয়র পদটি নেহাতই গৌরবার্থে নয়। এটি মর্যাদা দেয় একজন ব্যক্তিকে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি দায়িত্ব দেয়। এখনো যারা নগর ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিরাশ হননি, তারা কিছু কাজ প্রত্যাশা করেন। নগরবাসীদের দাবিগুলোও আকাশকুসুম নয়। নাগরিক পরিষেবার সেই প্রাথমিক চাহিদাসমূহ পূরণ করা সিটি কর্পোরেশনের জন্য অসম্ভবও নয়। মেয়র যদি পারেন কাজগুলোর দায়িত্ব কয়েক জন সক্ষম কাউন্সিলরের মাঝে বণ্টন করে নিজে নজরদারির দায়িত্ব নেন, তাহলে বহু দূর কাজ হয়।

আসলে মেয়রের একমাত্র কাজ নজরদারিই। সিটি কর্পোরেশনের কোন শাখা কেমন কাজ করছে, বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় আছে কি না, তিনি খেয়াল রাখবেন। সমস্যা হলে দ্রুত ব্যবস্থা করবেন। তিনি একাই সব শাখার প্রধান হয়ে বসে থাকলে কাজ হবে না। আতিকুল ইসলাম কর্পোরেট জগতের সফল মানুষ। তিনি জানেন কাজ কিভাবে বন্টন করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হয়।

আনিসুল হক কাউন্সিলরদের মোকাবেলা করেছেন শক্ত, দক্ষ হাতে। দলীয় প্রভাব ও যোগাযোগ থাকায়, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে ঠিকাদারী ও সরবরাহ ব্যবসার সাথে এদের অনেকেরই সম্পর্ক থাকায়, নগর ব্যবস্থাপনায় ভাল কিছু করা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। এদের দাপটের কাছে মেয়রকে অসহায় হতে হয়। আশা করছি আতিকুল ইসলাম আনিসুল হকের মতই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠবেন।