ফারজানা তন্বী »

Dating App

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দীর্ঘ সড়কের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। এসব চেকপোস্টের বেশিরভাগের অবস্থানই জনমানবশূন্য স্থানে। যেখানে সড়কের আশপাশে অনেক দূর পর্যন্ত কোনো বসতি চোখে পড়ে না।

সেদিক থেকে শামলাপুর চেকপোস্টটি বেশ ব্যতিক্রম। চেকপোস্টের পাশেই জনাকীর্ণ বাজার, মসজিদ। প্রতিদিনের মতো ঘটনার রাতে এশার নামাজ পড়ে নিজের দোকানে ফেরেন নুরুল আমিন। টুকটাক কাজ করে বাসায় ফেরার মুহূর্তেই পাশের চেকপোস্টে শুনতে পান গুলির শব্দ। অন্য অনেকের সঙ্গে তিনিও সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যান ঘটনাস্থলে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে নুরুল আমিন যা দেখেছিলেন, সে ঘটনার বর্ণনা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে। তবে একটি বিষয় নুরুল আমিনের কানে বাজে। নুরুল আমিন ঘটনার বর্ণনার একপর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরেন এভাবে, ‘হাত তুলে বের হওয়ার পরও তাকে গুলি করা হয়েছে, স্যার। আমি আপনার নলেজে দিলাম স্যার’Ñ এই একই কথা পোশাক পরা পুলিশ সদস্য মোবাইল ফোনে জানাচ্ছিলেন। ওই রাতে চেকপোস্টে পোশাক পরা এবং সাদা পোশাকে দুই ধরনের পুলিশ সদস্যদের দেখা যায়।

নুরুল আমিনের কথার সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শামলাপুরের যে চেকপোস্টে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হন, সেটি আসলে বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের নয়। শামলাপুর চেকপোস্টটি ১৬ এপিবিএনের আওতাধীন। এই ব্যাটালিয়নের সদস্যরা চেকপোস্টটি পরিচালনা করেন।

প্রতিদিনের মতো ঘটনার দিনও এপিবিএন সদস্যরা দায়িত্বরত ছিলেন। এপিবিএনের ওই চেকপোস্টে হঠাৎ করেই হাজির হয় বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ পুলিশের একটি দল। এরই মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের গাড়ি এসে থামে চোকপোস্টে। ওই চেকপোস্টেই ৩১ জুলাই রাতে পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন সিনহা মো. রাশেদ খান।

কক্সবাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ওই রাতে চোকপোস্টে সিনহার গাড়ি এসে থামার পর প্রথমে এপিবিএন সদস্যদের কাছে নিজের পরিচয় দেন সিনহা। দায়িত্বরত এপিবিএন সদস্যরা পরিচয় পেয়ে গাড়িটি চলে যাওয়ার সংকেত দিলেও বাদ সাধেন পরিদর্শক লিয়াকত। তিনি আটকে দেন গাড়িটি। অবশ্য ঘটনার পর থেকে কক্সবাজার জেলা পুলিশ বলে আসছে, বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের চেকপোস্টে ঘটনাটি ঘটেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১৬ এপিবিএন অধিনায়ক পুলিশ সুপার (এসপি) হেমায়েতুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘চেকপোস্টটি এপিবিএন পরিচালনা করে এটা ঠিক; কিন্তু এর বেশি কিছু আমি বলতে পারব না এই মুহূর্তে।’

বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের পুলিশ সদস্যরা ছিলেন সাদা পোশাকে এপিবিএন সদস্যরা পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করলেও সেখানে ঝড়ের বেগে ছুটে আসে বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্র পুলিশের একটি দল। পরিদর্শক লিয়াকত পৌঁছেন মোটরসাইকেলে। এ ছাড়া টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাসও কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির হন।

শামলাপুর চেকপোস্টসংলগ্ন বাজারের একাধিক দোকানি এবং ওই রাতের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওসি প্রদীপ কুমার দাস ও পরিদর্শক লিয়াকতসহ অপর কয়েক পুলিশ সদস্য ছিলেন সাদা পোশাকে। প্রদীপ কুমার ও লিয়াকত ছাড়া অন্যদের স্থানীয়রা চিনতে পারেননি। তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানটি পরিচালনা করেন বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের সদস্যরা।

গতকাল সরেজমিন বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা কেউ বাইরে বের হন না। তদন্তকেন্দ্রের সামনের একাধিক দোকান থেকে নিয়মিত বাজার করতেন তদন্তকেন্দ্রের সদস্যরা। এমন এক দোকানি জানান, পরিদর্শক লিয়াকত সপ্তাহ অথবা দেড় সপ্তাহ পর একবার বের হতেন। তাকে খুব একটা বাইরে আসতে দেখা যেত না।

উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের টেকনাফ থানার শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। এ ঘটনায় সিনহার বড় বোন ৯ পুলিশ সদস্যকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় গত বৃহস্পতিবার ওসি প্রদীপসহ ৭ পুলিশ সদস্যের ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন কক্সবাজারের আদালত। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।

Dating App
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »