রাজন মিত্র »

Dating App

কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশেই অবস্থিত রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল। ঢুকতেই লোহার মূল ফটকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ‘ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল, এখানে করোনা আক্রান্ত (কোভিড-১৯ পজিটিভ) রোগীদের এবং সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের ভর্তি করোনো হয়’ লেখাসংবলিত নোটিশ।

অথচ গত বৃহস্পতিবার থেকে এখানে বন্ধ রয়েছে করোনা রোগীদের চিকিৎসা। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য পদায়ন করা চিকিৎসকদেরও। হাসপাতালের মূল ফটক ছেড়ে গিয়ে নজরে পড়বে হরেক রকমের গাছগাছালি আর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য। ঝকঝকে তকতকে হাসপাতালের মূল ভবনে ঢুকতেই খটকা লাগতে পারে- এটি কি হাসপাতাল না সরকারি কোনো বাংলো বাড়ি!

১০০ বেডের এই হাসপাতালে রোগী শূন্যতায় খাঁ-খাঁ করছে। দপ্তরে দপ্তরে অলস কাটাচ্ছেন চিকিৎসকরা। খোশগল্পে ব্যস্ত নার্স-ব্রাদাররা। অধিকাংশ কক্ষই তালাবদ্ধ। যে কটি খোলা সেগুলোয় সারিবদ্ধ করে পেতে রাখা রয়েছে শয্যা। চিকিৎসাসেবা দিতে সব কিছুই ছিল প্রস্তুত; শূন্যতা ছিল কেবল রোগীর। গতকাল রবিবার দুপুরে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।

জানা গেছে, গতকাল বিকাল পর্যন্ত ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ওই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মাত্র ২ জন রোগী। এদের একজন রেলওয়ের সিপাহি নাছিরউদ্দিন। তিনি গতকাল সকালে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফরমে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছেন। অন্যজন রেলওয়ের কর্মকর্তা মো. নাজমুলের স্ত্রী।

সিপাহি নাছিরউদ্দিন বলেন, সরকারি অন্যান্য হাসপাতালের মতো এই হাসপাতালে রোগী নেই বললেই চলে। ৩ ঘণ্টায়ও আমি ছাড়া আর কেউ চিকিৎসা নিতে আসতে দেখিনি। তবে চিকিৎসাসেবায় আন্তরিক এখানকার ডাক্তার ও নার্স আপারা। নারী অন্য রোগী ভর্তি ছিলেন কেবিনে।

জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গত ১ মে থেকে ৩০ শয্যা নিয়ে ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করেন ২৫ জন চিকিৎসক। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এখানে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন ৬৩ জন করোনা রোগী (হাসপাতালের নার্স, কর্মচারী এবং রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগত)। এদের মধ্যে চিকিৎসাধীন ৪ জনকে বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অন্যরা সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন বাসায়।

রেলওয়ে কর্মীদের চিকিৎসাসেবা দিতে ১৯৮৬ সালে ৫ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় হাসপাতালটি। তখন এর নাম ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল। সাধারণ জনগণ যেন স্বাস্থ্যসেবা পান, সে লক্ষ্যে অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের মতো চিকিৎসাসেবা দিতে ২০১৫ সালে এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এটিকে জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হলেও বাস্তবে এখনো তার প্রতিফলন ঘটেনি।

গতকাল হাসপাতালটির বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেলওয়ে হাসপাতালটি ‘জেনারেল’ হওয়ার পরে কার্যত কোনো উন্নতি হয়নি। শুধু অবহেলার কারণেই হাসপাতালটির আজ বেহাল দশা। জেনারেল হাসপাতাল মনে করে রেলের লোকজন, এমনকি বহিরাগত অনেকেই এ হাসপাতালে আসেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে বেশিরভাগ মানুষই আবার ফিরে যান।

এখানে যেসব চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে তার অধিকাংশই পুরনো। অকেজো হয়ে পড়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি। নষ্ট বেশিরভাগ শয্যা। হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের সেটআপে নেই মাইক্রোস্কোপ ও রিএজেন্ট। নেই নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ); কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ বা ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা। অ্যাম্বুলেন্স চালু রয়েছে মাত্র একটি। আশ্চার্যজনক হলেও সত্য, এই হাসপাতালে এখন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কোনো পদ সৃষ্টিই করা হয়নি। ফলে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালকে পরিপূর্ণ হাসপাতাল করার জন্য যা যা দরকার তার সব কিছু চেয়ে অনেকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে আবেদন-নিবেদন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ; কিন্তু সায় মেলেনি। সর্বশেষ সপ্তাহ দুই আগে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশু, কার্ডিওলজি, অর্থপেডিক, প্যাথলজি, রেডিওলজি, ডেন্টাল বিভাগে একজন করে সিনিয়র ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট এবং মেডিক্যাল অফিসার, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, স্টাফ চেয়ে চিঠি দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত কুম্ভকর্ণের টনক নড়েনি।

রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের ঢাকা বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা (ডিএমও) ডা. আইএস আব্দুল আহাদ আমাদের সময়কে বলেন, রোগীদের সেবায় মেডিক্যাল অফিসার, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ যা যা দরকার, তার সব কিছু চেয়ে দুই সপ্তাহ আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এই হাসপাতালে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে চাহিদা পূরণ হলে সেগুলো আর থাকবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ এক চিকিৎসক জানান, হাসপাতালটিতে আগে শুধু রেলওয়ে কর্মীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। জেনারেল করার পর বহিরাগতরা আসতে শুরু করেন। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অপ্রতুল চিকিৎসা সরঞ্জামের দৈন্য এবং জটিল রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে না পারায় কমতে শুরু করে রোগীর সংখ্যা।

এখন হাসপাতালটিতে সচরাচর এক-দুই জন রোগী ভর্তি থাকেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকায় রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাইরে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর জন্য দায়ী চিকিৎসক ও জনবল সংকট। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে রেলের কর্মীরা ছাড়াও মতিঝিল, শাহজাহানপুর ও মালিবাগসহ আশপাশের এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসা সুবিধা পাবেন বলেও জানান তারা।

হাসপাতালটিতে কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে রেলওয়ের এক কর্মচারী নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, হয় হাসপাতালটি ভালো করে চালানো হোক, নয়তো বন্ধ করে দিক। তা হলে সরকারের টাকা অপচয় হতো না। কর্তৃপক্ষ যদি স্বাস্থ্যসেবা দিতে চায়, তবে ভালোভাবে যেন দেয়Ñ দাবি রাখেন তিনি।

রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি-এমঅ্যান্ডসিপি) একেএম আব্দুল্লাহ আল বাকী গতকাল আমাদের সময়কে জানান, রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালে গত বৃহস্পতিবার থেকে করোনা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা স্থগিত রাখা হয়েছে। এখানে ভর্তি থাকা ৪ জন রোগীকে ঢামেকে স্থান্তান্তর করা হয়েছে। রোগীর চাপ বাড়লে ফের করোনা চিকিৎসা শুরু হবে। এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালের কোনো রোগী মারা যাননি। ৯০ শতাংশের কাছাকাছি রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

হাসপাতালে রোগী কম আসার প্রসঙ্গে তিনি জানান, রেলওয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়েছেন। এদের অনেকেই বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে কিছু কারণে অন্য হাসপাতালের তুলনায় এখানে রোগীর সংখ্যা কমই বটে। হাসপাতালটিতে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে নতুন করে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি আধুনিকায়ন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদ সৃষ্টি, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম যুক্ত করা ছাড়াও রেলওয়ে হাসপাতালের অবকাঠামো ঢেলে সাজানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে রেলওয়ে হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে; সরকারের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার যে মূল লক্ষ্য তা বাস্তবায়িত হবে।

Dating App
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »