সম্প্রীতি মাহমুদ »

সন্তানকে চুমু খাওয়ার সময়ে আমেরিকার এক মা লক্ষ্য করেছিলেন, ছেলের গায়ের গন্ধ আর আগের মতো নেই! শুধু সন্তানের গায়ের গন্ধ নয়। পরবর্তীতে দেখা যায়, সেই মা কেবল সন্তানের শরীরের গন্ধই নয়, কোনো খাবারের গন্ধও তিনি পাচ্ছেন না। পরে দেখা গেল, জিন মিশেল মাইলার্ড নামের সেই মহিলা করোনা আক্রান্ত। করোনার লক্ষণ হিসেবে এই উপসর্গ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে এই একই ধরনের উপসর্গ আরেক রোগের ক্ষেত্রেও দেখা দিতে পারে, তার নাম অ্যানোসমিয়া। এই রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এমন কাণ্ড আপনার সঙ্গেও ঘটলে ডাক্তারদের পরামর্শ, শিগগিরই করোনার পরীক্ষা করান।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি আর ইতালিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের অনেকেই ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে এ থেকে নিস্তারের উপায়ও রয়েছে। চলুন এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক-

যে কারণে এমনটি হয়

আমরা নাকে ঘ্রাণ বা গন্ধ পাই অলফেক্টরি নামক একটি নার্ভের মাধ্যমে। এটি আমাদের নাকের উপরি অংশে ছড়ানো রয়েছে। যা সরাসরি মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত। কোনো কারণে এই নার্ভটি অকার্যকর হয়ে গেলে আমরা ঘ্রাণ বা গন্ধ পাই না। আর ঘ্রাণ না পেলে আমাদের জিহ্বার টেস্ট বাড যা স্বাদ পেতে সাহায্য করে, তাও অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে একই সাথে নাকে ঘ্রাণ না পেলে মুখে স্বাদও পাই না।

এই স্বাদহীনতা যে আসলে ঘ্রাণশক্তি হারানোর অঙ্গবিশেষ! আর এই দুটোই করোনার লক্ষণ। তবে স্বাদহীনতাও অ্যানোসমিয়ার মতোই আর একটি রোগ। এর আরেক নাম অ্যাগিউসিয়া। এই ধরনের রোগাক্রান্ত হলে স্বাদকোরকের কোনো সেন্স থাকে না।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির শ্বাসযন্ত্রকে সম্পূর্ণ ভাবে বিকল করে দেয় এই ভাইরাস। ফলে তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি চলে যায়। আর গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা চলে যায় বলেই খাবার আমাদের কাছে যেমন গন্ধহীন হিসেবে ধরা দেয়, তেমনই আবার স্বাদহীনও হয়।

কোন কোন ক্ষেত্রে এই দুই রোগের সম্ভাবনা বেশি?

ঠান্ডা লাগা, অ্যালার্জি, নাকের ভিতরে বা সাইনাসে পলিপাস হয়ে নাকের ছিদ্র বন্ধ থাকলে। কিছু ওষুধ খেলে, যেমন- এজিথ্রোমাইসিন, এমপিসিলিন, জিটিএন, ক্যাপট্রোপিল ইত্যাদি কারণে। এছাড়াও জীবাণুনাশক ওষুষের সংস্পর্শে এলে, মাথায় আঘাত পেলে। নেশা জাতীয় দ্রব্য নাক দিয়ে গ্রহণ করলেও দেখা দিতে পারে এই দুই রোগ। করোনাভাইরাস ছাড়াও আলঝেইমার, পারকিনসন ডিসিজ ইত্যাদি রোগের কারণেও অ্যাগিউসিয়া এবং অ্যানোসমিয়া আক্রান্ত হতে পারেন যে কেউ।

এসবের যদি কোনওটাই না দেখা যায়-

এসবের কোনোটিই যদি না দেখা যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে আপনি করোনা আক্রান্ত। এমনকী সাধারণ ঠান্ডা লাগা বা অ্যালার্জির সমস্যা হওয়ার পর যদি কারও ঘ্রাণশক্তি নষ্ট হয়ে যায় বা কয়েকদিন আগে জ্বর হয়ে ভালো হয়েছে, কিন্তু এখনও খাবারের গন্ধ পাচ্ছেন না বা বেস্বাদ লাগছে খাবার, তবে সেক্ষেত্রে আপনার অবশ্যই করোনার টেস্ট করা উচিত। তার আগে নিজেকে এবং পরিবারের বাকিদের আইসোলেশনে রাখুন।

​টেস্ট যদি একান্তই না করতে পারেন, তাহলে যা যা করণীয়-

উপরের সব লক্ষণগুলির পরও যদি শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা, বুকে চাপ অনুভূত হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। আর সে রকম গুরুতর কিছু না হলে, ঘরে আলাদা নিজেকে বন্দি করে রাখতে হবে, ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে, ঈষৎ-উষ্ণ জল পান করতে হবে, যত বার সম্ভব নাক পরিষ্কার করতে হবে, দিনে কমপক্ষে পাঁচ বার গরম জলে সেঁক করতে হবে, গরম জলের ভাপও নিতে হবে অন্ততপক্ষে পাঁচ বার। এছাড়াও বিভিন্ন সুগন্ধির স্টিমুলেশনও নেওয়া যেতে পারে। যদিও এ ক্ষেত্রে ভয়ের কোনো কারণ নেই। এই নিয়মগুলি মেনে চললেই সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই ঠিক হয়ে যাবে।

​ঘ্রাণশক্তি এবং স্বাদ ফিরে পাওয়ার সহজ উপায়-

ঘ্রাণ শক্তি ফিরে পেতে সাহায্য করে ‌এমন চারটি উপাদান রয়েছে। গোলাপ, ইউক্যালিপটাস, লবঙ্গ ও লেবুর ফুলের গন্ধ। এগুলোর গন্ধ শুকলে দ্রুত খাবারের গন্ধ বুঝতে পারবেন। এই ফুলগুলো না পাওয়া গেলে এগুলোর নির্যাস অ্যাসেন্সিয়াল অয়েলের গন্ধ শুকে দেখতে পারেন। আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে লেবু ও গোলাপ ফুলের গন্ধযুক্ত সাবানও কাজে আসতে পারে। আর এই ঘ্রাণশক্তি এক সপ্তাহ থেকে দুই মাসের মধ্যেই ফিরে আসে। এর জন্য আলাদা করে কোনো ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »