ফারজানা তন্বী »

Dating App

কোভিড-১৯ এর সংক্রমণে আজ পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীর ২১৬টি দেশ ও টেরিটরিতে ৮৩,০৩,৭৩৬ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং ৪,৪৯,৩৩৮ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। মোট সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে যে দেশগুলো সামনের সারিতে আছে তার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, রাশিয়া আর যুক্তরাজ্য’র নাম অন্যতম।

যদিও চায়নার উহান প্রদেশে এই মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধিটি ধরা পড়ে এবং পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ দক্ষিণ করিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এর পর পরই ছড়িয়ে পরে। এই দেশগুলো খুবই দ্রুততার সাথে সরকার সকল জনগোষ্ঠীর সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে এপ্রিল মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রণে আনে।

ইতোমধ্যে এই দেশগুলো বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। অনেকেই জানার ও বোঝার চেষ্টা করছেন যে কি করে এই দেশগুলো কোভিড-১৯ এর মত মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধিটিকে এত অল্প সময়ের মধ্যেই পরাজিত করতে পারলো।

এখন বিশেষ করে ভিয়েতনামের সাফল্য অনেকের মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে। দেশটি এমন কি করলো যাতে করে প্রায় ১০০ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও এবং চায়নার সাথে ১৪০০ কিলোমিটারের বর্ডার থাকার পরেও দেশটির একজন মানুষকেও মৃত্যুবরণ করতে হলোনা। শুধুমাত্র ৩৩৫ জনের সংক্রমণে ভোগার মধ্য দিয়ে গত মে মাসেই দেশটিকে কোভিড-১৯ মুক্ত ঘোষণা করতে পারল। এই দেশটি একটি মধ্যম আয়ের দেশ।

চিকিৎসা ব্যাবস্থা যে আহামরি ভালো তাও নয়। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক উন্নয়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন সূচকে দেশটি দক্ষীণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে এগিয়ে আছে সেটাও সত্য নয়। তাহলে ভিয়েতনাম এমন কি করলো যে চায়নার সবচেয়ে প্রতিবেশী (১৪০০ কিঃমিঃ বর্ডার) হওয়া সত্ত্বেও ওরা এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি মানুষকেও মরতে না দিয়ে কোভিড-১৯ কে জয় করতে পারল।

ভিয়েতনামের রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানুয়ারী মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। সর্বপ্রথম জানুয়ারী ২৩ তারিখে কোভিড-১৯ রোগ শনাক্ত হয় আর সমন্বিত ‘রেস্পন্স পরিকল্পনা’ তৈরী করে জানুয়ারীর ২৭ তারিখে। জীবন ও জীবীকা’র মধ্যে ভিয়েতনামের রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানুষের জীবন বাঁচানোকেই অগ্রাধিকার হিসাবে বেছে নেয়। সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞাই ভিয়েতনামের স্বাস্থ্যসহ সকল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়গুলোকে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে একসাথে কাজ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে ও শক্তি যুগিয়েছে।

ভিয়েতনাম যে কয়টি পদক্ষেপ দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে সেগুলো আমাদের দেশবাসীকে জানানোর জন্য খুব সংক্ষেপে তুলে ধরলাম। প্রথমতঃ বিমানবন্দরসহ দেশটির সকল প্রবেশ মুখে নিশ্ছিদ্র স্ক্রীনিং এর ব্যবস্থা করা হয় এবং সকল সন্দেহজনক ব্যক্তিকে সরকারি খরচে নির্দিষ্ট স্থাপনায় কোয়ারেনন্টিনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পূর্ব এশিয়ার মধ্যে ভিয়েতনামই সর্বপ্রথম দেশ যেখানে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে সকল যাত্রীদের ফিরে আসাকে জানুয়ারী মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়।

আগত সকল যাত্রিদের অবশ্যই সরকার নিয়ন্ত্রিত কোয়ারেন্টিনে ফ্যাসিলিটিতে ১৪ দিন রাখা হয়। ধীরে ধীরে একই নিয়ম অন্যান্য দেশ যেমন দক্ষিণ কোরিয়া,যুক্তরাষ্ট্র,ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভুক্ত দেশ থেকে আগত যাত্রিদের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা হয়। দ্বিতিয়তঃ সমগ্র দেশে শত “মহামারী নিয়ন্ত্রণ টিম” তৈরী করা হয় এবং তাদেরকে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে কাংখিত পরিক্ষা এবং কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং এর ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

এই টিমগুলো সারা দেশ জরিপ করে যাদের গত দুই সপ্তাহের মধ্যে বিদেশ ভ্রমনের ইতিহাস আছে তাদের শনাক্ত করে এবং সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনে। এছাড়াও যারা শনাক্তকৃত কোভিড-১৯ রোগিদের কাছের মানুষ হিসাবে চিহ্নিত হয় তাদের সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়।

সমগ্র দেশে প্রতিষ্ঠিত ১১০ টি ল্যাবরেটরির মাধ্যমে আর.সি.আর যন্ত্রের সাহায্যে এপ্রিল মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে ২,৬১,০০৪টি কোভিড-১৯ পরিক্ষা করা সম্পন্ন হয়। তৃতীয়তঃ সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ এবং ইনোভেটিভ পদক্ষেপটি ছিল চারস্তর বিশিষ্ট কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং এবং আইসোলেশন। প্রথম স্তরে একজন কোভিড-১৯ রোগিকে শনাক্ত করার পর পরই তাকে স্বাস্থ্যকর্মী এবং নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যদের সহায়তায় স্থানীয় “মহামারি নিয়ন্ত্রণ টিম“এর সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদ করে যাতে করে শনাক্তকৃত রোগী গত ১৪দিনে কার কার সাথে নিবীড়ভাবে মেশার সুযোগ পেয়েছে তা বোঝা যায়। দ্বিতীয় স্তরে, যে সকল ব্যক্তি এই কোভিড-১৯ রোগীর ৬ ফুটের মধ্যে এসেছে অথবা ৩০ মিনিট বা তার বেশি সময় ধরে অবস্থান করেছে তার একটি তালিকা করে সবাইকে শনাক্ত করা হয় এবং সবাইকে জরুরী ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের আওতায় আনা হয়।

দ্বিতীয় স্তরের কাউকেই ঘরে থাকার অনুমতি দেয়া হয়নি। বরং সরকারি স্থাপনায় ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়েছে এবং এই সময়ে তাদের থাকা খাওয়ার খরচ সম্পুর্ণরুপে সরকার বহন করেছে। দ্বিতীয় স্তরে কোয়ারেন্টিনে থাকা সবাই প্রথম দিন এবং ১৪তম দিনে কোভিড-১৯ পরিক্ষার আওতায় এসেছে। তৃতীয় স্তরের আওতায় ছিলেন এমন সকল ‘ক্লোজ কন্টাক্টদেরকে শনাক্ত করে যার যার ঘরে সেফ আইসোলাশনে ১৪ দিন রাখা হয়। নিজ ঘরে সেফ আইসোলাশনে থাকা কেউ ই এক মুহুর্তের জন্যও বেরুনোর অনুমতি পায়নি। তৃতীয় “মহামারী নিয়ন্ত্রণ” টিম এই সকল পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় খাবার-দাবার সহ অন্যান্য সামগ্রী পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করে। চতুর্থতঃ প্রথম থেকেই সকল জনগোষ্ঠীকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা,হাত ধোয়া,সামাজিক দুরত্ব,ইত্যাদি সম্পর্কে বোঝানো হয়।

এই কাজে যেমন স্থানিয়ভাবে প্রচার-প্রচারনা চালানো হয় তেমনি জাতীয়ভাবে টেক্সট ম্যাসেজিং,রেডিও এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে লাগাতার প্রচারনা চালানো হয়। পাবলিক প্লেসে ফেস্ক মাস্ক পরিধান করাকে আবশ্যিকরন করা হয় এবং সকল প্রতিষ্ঠানে হ্যান্ড স্যানিটাইজার অথবা হাত ধোয়ার সামগ্রী রাখা আবশ্যিকরণ করা হয়। এছাড়াও, সবশেষে খুবই গুরুত্তপুর্ণ যে কাজটি করা হয় সেটি হল বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং তাদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পি.পি.ই সহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রী ইত্যাদি প্রস্তুতকরণ ও স্বল্পমূল্যে বাজারজাতকরণ করা ।

ভিয়েতনামে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের সাথে অংশিদারীত্ব ছিল অভুতপুর্ব এবং সুষ্পস্ট। প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রাপ্যতা বাড়ানো ছাড়াও বেসরকারী খাতের প্রতিষ্ঠিত ফিলান্থ্রফিস্টগন ‘চাউলের আটা’র মাধ্যমে দেশের গরীব জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীও খাবার সামগ্রীর যোগান দিয়েছে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আগাম, দ্রুত, নিষ্পত্তিমূলক ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিপদের ভয়াবহতাকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পারাটা ছিল ভিয়েতনামের জন্য একটি আশীর্বাদ। তা না হলে দেশটিকে হয়ত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মত আজও কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতা বয়ে বেড়াতে হতো । আশা করি, এখনো বাংলাদেশের সামনে সময় আছে যে, ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা হতে কিছুটা হলেও শিক্ষা নিয়ে তা কাজে লাগানো। তা না হলে, যে হারে মাশুল দিতে হবে তা কাটিয়ে উঠার ক্ষমতা আগামীতে আমাদের নাও থাকতে পারে।

Dating App
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »