আমীর হোসেন »

Dating App

মিরপুরের টাকার জাদুঘরের মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই নজরে পড়বে ‘টাকা গাছ’ নামের শিল্পকর্মটি। ভবনের গায়ে গাছের মতো রূপ দেওয়া হয়েছে স্টিলের কাঠামো, কাঠামোতে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন সময়ের মুদ্রার অনুলিপি। কাগুজে টাকাকেই যেহেতু আমরা ‘টাকা’ বলি, তাই সেই টাকাবিহীন মুদ্রাময় শিল্পকর্মকে মুদ্রাগাছও বলা যায়!

রাজধানীর মিরপুর ২ নম্বরে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির দ্বিতীয় তলায় জাদুঘরের দুটি গ্যালারি। আগেই জানা ছিল, বৃহস্পতিবার আর সরকারি ছুটির দিন বাদে প্রতিদিনই খোলা থাকে জাদুঘর। নেওয়া হয় না কোনো প্রবেশমূল্যও। অভ্যর্থনার আনুষ্ঠানিকতা শেষে সিঁড়ি ভেঙে উঠে পড়ি দোতলায়। হাতের বাঁ দিক থেকে সাজানো শোকেস ধরে ঘুরে দেখি গ্যালারি।

বিবর্তনের সাক্ষী

ভারতীয় উপমহাদেশে মুদ্রা ব্যবহারের বিবর্তনের ইতিহাসের সচিত্র উপস্থাপন যেন প্রথম গ্যালারির শোকেসগুলো। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে ব্যবহৃত ছাপাঙ্কিত রুপার মুদ্রা রয়েছে প্রথম শোকেসে। এভাবে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে দ্বিতীয় শতকে ব্যবহৃত কৃষাণ মুদ্রা, সপ্তম শতক থেকে নবম শতকে ব্যবহৃত হরিকেল রূপার মুদ্রা, দিল্লির সুলতানি আমলের মুদ্রা, বাংলার স্বাধীন সুলতানদের রাজত্বের সময় ব্যবহৃত মুদ্রাসহ ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল হয়ে বাংলাদেশি মুদ্রা রাখা কাচের ঘরে। প্রথম গ্যালারির প্রদর্শনী ঘুরে এভাবেই দেখা মিলল বাংলার প্রাচীন মুদ্রা ইতিহাস।

বিনিময়ের একাল-সেকাল

প্রথম গ্যালারিটা ঘুরে দেখতে দেখতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হলো। তিনটি ডিওরামায় যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাংলার হাজার বছরের বিনিময় প্রথা। রেপ্লিকা বা ক্ষুদ্র সংস্করণে দেখা যাচ্ছে, মানুষ ধানের বিনিময় হিসেবে নিচ্ছেন গরু, চালের বিনিময়ে মুরগি। পরেরটায় নদীর তীরে এক হাটে বেচাকেনা হচ্ছে পাট, তারও পরেরটায় উঠে এসেছে মানুষের সঞ্চয়ের চিত্র। বিশেষ এই প্রদর্শনীর নাম ‘বিনিময়ের একাল-সেকাল’। এই প্রদর্শনীর মতো জাদুঘরের প্রবেশপথেও ‘বিনিময়’ প্রথার বিবর্তনের চিত্র নজরে পড়েছিল পোড়া মাটির ফলকচিত্রে।

বিলুপ্ত দেশের মুদ্রা

 

দেশ হিসেবে যুগোস্লাভিয়া নামটি এখন অতীত। যে দেশ ভেঙে জন্ম হয়েছে সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, আলবেনিয়া ও মন্টেনেগ্রো এবং মেসিডোনিয়া, কসোভোর মতো দেশগুলো। তবে তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া টিকে আছে টাকা জাদুঘরে, দেশটির মুদ্রার মাধ্যমে। বিশ্বের এমনই বিলুপ্ত কিছু দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কাগুজে নোট ও ধাতব মুদ্রা রয়েছে জাদুঘরে।

দাতার নামে বিশেষ প্রদর্শনী

জাদুঘরের প্রদর্শিত মুদ্রা ও কাগুজে নোটের বড় অংশই শখের সংগ্রাহকদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া। সেই উপহারদাতাদের মধ্য আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তবে প্রথম গ্যালারিতেই নজরে এল বিশেষ একটি প্রদর্শনী। উপহারদাতা মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরীর নামেই এই প্রদর্শনী। তিনি ১ হাজার ১৮০টি মুদ্রা উপহার হিসেবে দিয়েছেন জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে। তাঁর উপহার দেওয়া মুদ্রার মধ্যে রয়েছে ৬টি স্বর্ণমুদ্রা, ২০৭টি রৌপ্যমুদ্রা, ৭৯২টি তামার ও অন্যান্য ধাতব মুদ্রাসহ ১৭৫টি কাগুজে মুদ্রা। যদিও উপহারের ছোট অংশই প্রদর্শিত হচ্ছে।

প্রথম গ্যালারি থেকে বেরিয়ে চলে আসি দ্বিতীয় গ্যালারিতে। টাকা জাদুঘরের দুই নম্বর গ্যালারির প্রদর্শনী সাজানো হয়েছে নানা দেশের মুদ্রায়। চীন, আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, হাইতি, বাহরাইন, নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাগুজে নোট ও মুদ্রা দেখে মনে হলো, কী বিচিত্র সব টাকা! বিচিত্র নকশায়, উপস্থাপনায়, ছাপায়। এমন হরেক দেশের টাকা দেখতেই নজরে এল কিয়স্ক বা চারকোনা ছোট ঘরটা। এগিয়ে গেলে জানা যায়, ৫০ টাকার বিনিময়ে দর্শনার্থীরা লাখ টাকার নোটে নিজের ছবি ছাপিয়ে নেওয়ার এই সুযোগ পান এখানে।

বিদায়বেলায় স্মারক সম্ভারে

জাদুঘরের স্যুভেনির শপে। স্মারক মুদ্রা ও নোট, জাদুঘরের প্রকাশনাসহ টাকা জাদুঘরের মনোগ্রাফ, বাংলাদেশ ব্যাংকের রজতজয়ন্তীতে প্রকাশিত স্মারক, বাংলাদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটের স্মারক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার ৯০ বছর পূর্তি স্মারক, বিজয় দিবসের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তৈরি স্মারক, জাপানিজ কয়েন সেটসহ নানা স্মারক রয়েছে এখানে। কোন স্মারকের মূল্য কত, তা দোকানের বাইরে একটি কাগজে সাঁটানো আছে।

Dating App
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »