বার্তাবাংলা ডেস্ক »

Unnayan Onneshanবার্তবাংলা রিপোর্ট :: স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ’উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’র ফেব্রুয়ারী সংখ্যা মতে, অবনমিত বিনিয়োগ চাহিদা, উচ্চ উৎপাদন খরচ, বিনিয়োগযোগ্য মূলধণের স্বল্পতা ও অধিক খরচ এবং যথোপযুক্ত নীতিকাঠামোর অভাবে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার ক্রমহ্রাসমান।

২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে ছিল ৭৯৮.২৪ কোটি ডলার যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময় থেকে ৩.৩১ শতাংশ কম। একই সময়ে ঋণপত্রের বন্দোবস্তও কমেছে ৮.২৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্প ঋণ বিতরণ হয়েছে ৯৭২০.৩০ কোটি টাকা যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণ থেকে ৪৯৭.৯১ কোটি টাকা কম।

২০১২ সালের জানুয়ারীতে, শিল্পের যৌগ উৎপাদন সূচক ছিল ৬০৩.৬৯ এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত উপাত্ত মতে তা’ হ্রাস পেয়ে আগষ্ট, ২০১২  ৫৮১.২৭ ও সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে ৫৭১.৬৪ দাঁড়ায় যা শিল্পের ক্রমহ্রাসমানতা প্রকাশ করছে।

All Media Link

উন্নয়ন অন্বেষণের মতে, অপর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সরবরাহ ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে বিনিয়োগের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে সৃষ্ট ক্রমহ্রাসমান বিনিয়োগযোগ্য মূলধণ, সরকারী ঋণ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত খাতে সরকারী বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততা শিল্প উৎপাদনকে আরও সংকোচন করছে।

বর্তমান শিল্পনীতি একদিকে যেমন শিল্প খাতের বিদ্যমান বাঁধাগুলো অতিক্রম করতে পারছে না, অন্যদিকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা তাও অর্জন সহায়ক হচ্ছে না। উন্নয়ন অন্বেষণের মতে, নতুন ও কার্যকর শিল্পনীতি প্রণয়ন করতে হবে যা চাহিদা বাড়াবে, দ্রব্যের বৈচিত্র্য আনয়নের মাধ্যমে নতুন বাজার সৃষ্টি করবে এবং নতুন শ্রমশক্তির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে।

যেহেতু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভোগ নির্ভর তাই টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদন ও শিল্পায়ন নির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে ধাবিত হতে হবে। শক্তিশালী, ক্রিয়াশীল, গতিশীল এবং সৃজনশীল শিল্পনীতিই পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুযোপুযোগি পরিবর্তন আনতে। নীতি হতে হবে বাস্তব সম্মত এবং বর্তমানের নীতি থেকে পুরোপুরি ভিন্ন।

বিগত ৫ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনে বৃহৎ শিল্পের অবদান পূর্ববর্তী ৫ বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। ২০০১-০২ অর্থবছর হতে ২০০৬-০৭  অর্থবছর পর্যন্ত বৃহৎ শিল্প খাতের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.২৫ শতাংশ। পক্ষান্তরে, গত পাঁচ বছরে  (২০০৭-০৮-২০১১-১২) এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৪৮ শতাংশ যা মন্থর গতির প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করেছে।

উচ্চ সুদের হারের কারণে বিনিয়োগ কাঙ্খিতভাবে নাও বাড়তে পারে। বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের পার্থক্য বৃদ্ধি ২০১২-১৩ অর্থবছরে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে উচ্চ সুদের হারের কারণে, বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের পার্থক্য বৃদ্ধি পেয়ে ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যথাক্রমে ৫.১৪, ৫.৪৭ এবং ৫.৮১ শতাংশ হতে পারে। ফলে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার যে হারে কমছে, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হার তার চেয়ে কম হারে বাড়ছে। অন্যদিকে, সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় স্থির। ১৯৯৭-৯৮ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত শিল্প খাতের বাৎসরিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির হার ছিল ০.৩৭ শতাংশ অন্যদিকে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাসের হারছিল ০.৪০ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কর্তৃক আরোপিত শর্ত পালন করতে গিয়ে সরকার বাণিজ্য উদারীকরণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি বাস্তবায়ন করছে, অন্যদিকে আমদানি বিকল্পন শিল্পায়ন বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে। একইসাথে নীতি নির্ধারকরাও শিল্পনীতির দীর্ঘকালীন সমস্যা সমাধানে কার্যকর টেকসই নীতি গ্রহণে উদাসীনতা দেখাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কর্তৃক আরোপিত তিন বছর মেয়াদী ঋণ নীতির শর্ত অনুসরণ করতে গিয়ে সরকার বার বার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করছে যা রপ্তানিকৃত দ্রব্যের কাঁচামাল, শিল্প-কারখানার কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমাচ্ছে।

শিল্পখাতে বিদ্যুতের দাম ক্রমন্বয়ে বাড়ছে। ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম ফেব্রুয়ারী ২০১১ তে’ ছিল ৪.৫৬ টাকা যা সেপ্টেম্বর ২০১২ তে’ বেড়ে হয়েছে ৬.৯৫ টাকা। আবার বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রে বিদু্যুতের দাম ফেব্রুয়ারী ২০১১ তে’ ছিল ৪.১১ টাকা যা সেপ্টেম্বর, ২০১২ তে’ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৪৮ টাকায়। চলতি অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভুর্তুকির লক্ষ্যমাত্রা ৬৪০০ কোটি টাকা ধরলেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রক্ষেপন অনুযায়ী তা ৮৯৫১.৩১ কোটি টাকা। ২০১১-১২ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল যথাক্রমে ৬৩৫৭ এবং ৪০০০ কোটি টাকা।

সাম্প্রতিক অবস্থা
মোট দেশজ উৎপাদন ও শিল্প খাত
কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার যে হারে কমছে, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হার তার চেয়ে কম হারে বাড়ছে। অন্যদিকে, সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় স্থির। ১৯৯৭-৯৮ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত শিল্প খাতের বাৎসরিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির হার ছিল ০.৩৭ শতাংশ অন্যদিকে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাসের হারছিল ০.৪০ শতাংশ।

গত পাঁচ বছরে বৃহৎ শিল্পের গড় বৃদ্ধি এর পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। ২০০১-০২ অর্থবছর হতে ২০০৬-০৭  অর্থবছর পর্যন্ত বৃহৎ শিল্প খাতের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.২৫ শতাংশ। পক্ষান্তরে, গত ২০০৭-০৮ হতে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৪৮ শতাংশ যা মন্থর গতির প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করেছে। বৃহৎ শিল্প খাতের বৃদ্ধি ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় ২০১১-১২ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৯.৪৭ শতাংশ হয়েছিল। মোট দেশজ উৎপাদনে বৃহৎ শিল্প খাতের অবদান ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে ১১২৯৩৫০ মিলিয়ন টাকা, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১০৪৩৭২০ মিলিয়ন টাকা, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৯৮০১৫ মিলিয়ন টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের অবদান ছিল ৩১.২৬ শতাংশ যা ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় ০.৯৩ বেশি।

শিল্পের সূচক
উৎপাদনের কোয়ান্টাম বা প্রার্থিত সূচক হচ্ছে বাংলাদেশের শিল্পের উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ২০১২ সালের জানুয়ারীতে, উৎপাদনকারী শিল্পের প্রার্থিত উৎপাদন সূচক ছিল ৬০৩.৬৯ এবং তা হ্রাস পেয়ে আগষ্ট, ২০১২ তে’ ৫৮১.২৭ ও সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে ৫৭১.৬৪ হয়, যা ম্যানুফ্যাকচারিং উৎপাদনকারী শিল্পের ক্রমহ্রাসমানতা প্রকাশ করছে।

শিল্প ঋণ বন্টন
শিল্প ঋণের প্রবৃদ্ধি ক্ষেত্রে উভয়মূখী সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে শিল্প ঋণের দূর্বল প্রবাহ। অন্যদিকে, আদায়ের ধীর গতি কু-ঋণকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে শিল্প ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০১০-১১ অর্থবছর হতেই নিম্নমুখী ছিল। ২০১১-১২ অর্থবছরে শিল্প খাতে ঋণ প্রদান করা হয়েছে ৩৫২৭৮.১ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে শিল্প ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৯.৬৪ শতাংশ যেখানে ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৪.৩০ শতাংশ এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২৯.৫৬ শতাংশ প্রত্যক্ষ করা হয়েছিল।

২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রথম ৩ মাসে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৯৭২০.৩ কোটি টাকা, যা ২০১০-১১, ২০০৯-১০ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ৩২১৬৩.২, ২৫৮৭৫.৭ ও ১৯৯৭২.৭ কোটি টাকা । শিল্প ঋণের গড় প্রবৃদ্ধি ২০০০-০১ হতে ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৩৭.৫৫ এবং ২০০৬-০৭ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত ২৫.৬১ পরিলক্ষিত হয়েছিল।

আমদানি
২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট আমদানি কমেছে ৬.৪১ শতাংশ। জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০১১ এর তুলনায় মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এল.সি এবং সেটেলমেন্ট কমেছে যথাক্রমে ৩.৩১ এবং ৮.২৩ শতাংশ চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়কালে।

উন্নয়নমূলক এবং অনুন্নয়নমূলক ব্যয়
উন্নয়ন ও অনুন্নয়নমূলক ব্যয়ের বন্টন দ্রুত শিল্পোয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিককালের ২০১২-১৩ অর্থবছরের অনুন্নয়ন ব্যয় বিগত বছরের তুলনায় অনেক বেশি হলেও উন্নয়ন ব্যয়ে বরাদ্দ কম অন্যান্য মন্ত্রণালয় গুলোর তুলনায় কম।

শিল্প খাতের অনুন্নয়নমূলক ব্যয় ২০১১-১৩ অর্থবছরের তুলনায় ১.৭৪ শতাংশ বেশি। এই ব্যয়ের পরিমান ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০৭.০ কোটি ডলার যা গত বছরের তুলনায় ৭ কোটি ডলার বেশি। গত ছয় বছরে অনুন্নয়নমূলক ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৯.৫৭ শতাংশ।

সরকার এ খাতে ২০১১-১২, ২০১০-১১ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে ১০০, ৯৫ এবং ৭৮ কোটি ডলার বণ্টন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরের আগে, এ খাতে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৫৫ কোটি ডলার বন্টন করা হয়েছিল। পরর্বর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তা বৃদ্ধি করে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ১৬২ এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১৬৪ কোটি ডলার করা হয়েছিল।

শিল্প খাতে উন্নয়ন ব্যয়
শিল্প খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর বাস্তবায়ন খুবই নিম্নগতির। ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে তা মাত্র ১১ শতাংশ যেখানে এটি ছিল ৪৯ ও ৫৪ শতাংশ যথাক্রমে স্থানীয় সরকার ও বিদ্যুৎ অধিদপ্তরে। চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে সামগ্রিকভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নে অগ্রগতি ছিল ৩৮ শতাংশ, যা নির্দেশ করে চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর বরাদ্দ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের তুলনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ে কম। ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারী পর্যন্ত, শিল্প খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর বরাদ্দ ছিল ১৭২২.২৭০ যেখানে ৪৯৭৫.৬৫০  এবং ৭৮৪৯.৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যথাক্রমে স্থানীয় সরকার ও বিদ্যুৎ অধিদপ্তরের জন্য। ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১১-১২ অর্থবছরে শিল্প খাতে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২৫.৪৬, ২৯.২৯, এবং ১৯২.৭৫ শতাংশ।

শিল্প ঋণের গড় আদায়ের হার ২০০০-০১ হতে ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৮৭.০৮ শতাংশ যেখানে ২০০৬-০৭ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত তা ছিল মাত্র ৭৬.৫৪ শতাংশ। ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়কালে মোট ঋণ আদায়ের পরিমান ছিল ৮৩৬০.৯৮ কোটি টাকা যা এপ্রিল থেকে জুলাই ২০১২ সময়কালে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৮৮৮.৮৩ কোটি টাকায়।

বিনিয়োগের অবস্থা
চলতি আর্থিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু বড় সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট মোকাবেলা করতে হতে পারে। উচ্চ সুদের হারের কারণে বিনিয়োগ কাঙ্খিতভাবে নাও বাড়তে পারে। বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের পার্থক্য বৃদ্ধি ২০১২-১৩ অর্থবছরে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে উচ্চ সুদের হারের কারণে, বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের পার্থক্য বৃদ্ধি পেয়ে ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যথাক্রমে ৫.১৪, ৫.৪৭ এবং ৫.৮১ শতাংশ হতে পারে। ফলে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার কারণ
বর্তমান শিল্পায়ন নীতি/কৌশল বৈশ্বিক ও দেশীয় পর্যায়ে উৎপাদন কাঠামোতে যে সমস্ত বাধা তা নির্ণয় করতে সমর্থ হয়নি অথবা অদূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান কৌশলের প্রধান সমস্যা গুলো হচ্ছে পর্যাপ্ত দেশীয় চাহিদা সৃষ্টির এবং বর্ধিত শ্রম শক্তির জন্য যথাযথ কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। শিল্প ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধাগুলো হচ্ছে পুরাতন নীতির উপর ভর করে চলা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, বিনিয়োগের অভাব এবং পাশাপাশি কাঠামোগত দুর্বলতা।

নীতিগত সমস্যা
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এই রকম এক সময়ে নেওয়া হলো যখন অর্থনীতিতে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি হারের নি¤œমুখীতা, বিনিয়োগ মন্দা, টাকার মান কমে যাওয়া, নিয়মিত মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং অদূরদর্শী রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিরাজমান। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি উৎপাদন বৃদ্ধিকে বাঁধাগ্রস্থ করছে সাথে সাথে বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবাহ ও শিল্পের কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাচ্ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় যে, বেসরকারী খাতে ঋণের প্রবাহ গত চার বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ ছিল।

অবকাঠামো
বর্তমানে শিল্পসমূহ তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যা মোকাবেলা করছে। স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ও সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য প্রতিবছর বেড়েই যাচ্ছে। যা বিদ্যুৎ সরবরাহের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ভতুর্কি দেয়া সত্ত্বেও দাম বেড়েই চলছে। এ গুলোই উৎপাদন ব্যয় বাড়ানো এবং শিল্পায়নের পথে বাঁধা। ২০১১-১২ অর্থবছরে পিক চাহিদা ছিল ৭৫১৮ মেগাওয়াট। একই অবস্থা দেখতে পাই ২০১০-১১ অর্থবছরে। স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ও সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতার পার্থক্য বাড়ার কারন হচ্ছে বিদ্যুৎ প্লান্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্ম দক্ষতা, দ্বিতীয় শ্রেণীর যন্ত্রপাতি ব্যবহার।

নতুন শিল্পনীতির প্রয়োজনীয়তা
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে ত্বরান্বিত করতে হলে বাংলাদেশকে শক্তিশালী, ক্রিয়াশীল,গতিশীল ও সৃজনশীল শিল্প নীতি গ্রহণ করতে হবে যা মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনয়ন করবে। সংশোধনমূলক শিল্পনীতিসমূহ নি¤œরুপ:

প্রথমত, আমদানি বিকল্প শিল্পায়ন বরাবরই অবহেলিত হচ্ছে এ জন্য দায়ী ক্ষমতার পরিবর্তন এবং  আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। এবং বিশ্ব ব্যাংক মতানুযায়ী তৈরি হয়েছে। রপ্তানির জন্য বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে ফলে রপ্তানি শিল্প আমদানি নির্ভর হয়ে যাওয়াতে অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দ্বিতীয়ত, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমে গিয়েছে। আবার একই সময়ে সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে শিল্পে ঋণের পরিমান কমে গিয়েছে।

তৃতীয়ত, কুইক রেন্টাল প্লান্ট এ ভতুর্কির পরিমান বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকারের খরচ বেড়ে যাচ্ছে ফলে সরকারকে দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে যা বেসরকারী খাতের ঋণ প্রভাবকে কমিয়ে দিচেছ।

চতুথর্ত, রপ্তানি পণ্যের গন্তব্য দেশে মন্দার কারণে নতুন বাজার এখনও খুঁজে পাওয়া যায় নি। তার উপর দেশীয় চাহিদা বাড়েনি কারণ বেশির ভাগ মানুষ এখনও দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে।

পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এখনও তেমনভাবে বেড়ে উঠেনি।

বর্তমান শিল্পনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য কিছু পরামর্শ:

১)    শিল্পায়নের কৌশলকে এগিয়ে নেয়ার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা দরকার। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে যে ছদ্ম বেকারত্ব বিরাজ করছে তা রহিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
২)    ক্ষুদ্র ও শিশু শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষার জন্য এই শিল্পকে কর অবকাশ, বিদ্যুৎতের সুবিধা, অবকাঠামো সুবিধা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা দিতে হবে।
৩)    কম সুদে ঋণ পাওয়ার জন্য নতুন আর্থিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে।
৪)    আর্থিক খাত এবং শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হবে। পরিকল্পিত উপায়ে শিল্প স্থাপন করতে হবে যাতে করে দারিদ্র্য বিমোচন হয় এবং বেকারত্ব কমে।
৫)    নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ভোগের চাহিদা বাড়িয়ে দেশীয় চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে যাতে করে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা অর্থনীতিতে কোন প্রভাব না ফেলে।
৬)    দেশ এখনো প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ বিশেষ করে কয়লা, গ্যাস, চুনাপাথর ইত্যাদিতে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি এবং অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোম্পানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
৭)    দেশকে স্বল্প উন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে যেতে হলে নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে অংশীদারিত্ব তৈরির উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
৮)    টেকসই পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে শিল্পখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সক্রিয় শিল্পনীতি শিল্পজাত দ্রব্যে বৈচিত্র্য আনার মাধমে গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃর্সরণ কমাতে পারে।
৯)    অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিশ্বে নারীদের অংশগ্রহন, অবদান ও সাফল্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। তাই শিল্পায়নের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
১০)     নতুন বাজার ঁেখাজা ও নতুন দ্র্রব্যের জন্য দরকার উন্নত শিল্পজাত দ্রব্য এবং শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতাই দিতে পারে নতুন বাজার পাওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা।

উপসংহার
শিল্পখাত দুই ধরণের সমস্যা মোকাবেলা করছে যথা: নীতি প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা এবং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা। শিল্প খাতে বাঁধাগুলো দূর করা এবং মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পৌছার জন্য বর্তমান নীতি যথোপযুক্ত নয়। সুতরাং, সময় এসেছে নতুন করে শিল্পনীতি নিয়ে চিন্তা করার। বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধি, দ্রব্যের বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে নতুন বাজার সৃষ্টি, এবং শ্রম বাজারে নতুন প্রজ¤েœর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যেহেতু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভোগ নির্ভর তাই টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদন ও শিল্পায়ন নির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে ধাবিত হতে হবে। শক্তিশালী, ক্রিয়াশীল, গতিশীল এবং সৃজনশীল শিল্পনীতিই পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুযোপুযোগি পরিবর্তন আনতে। নীতি হতে হবে বাস্তব সম্মত এবং বর্তমানের নীতি থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। এই রকম নীতির জন্য দরকার নতুন পদক্ষেপ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন »

শেয়ার করুন »

লেখক সম্পর্কে »

মন্তব্য করুন »