নাফ নদীর কোলে মুখ থুবড়ে পড়া মানবতা » Leading News Portal : BartaBangla.com

জাহিদ আল আমীন ও জিনাত আরেফীন রাহমান »

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নাফ নদীর তীরে এঁটেল মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় হলুদরঙা শার্ট পরিহিত একটি শিশুকে। এ যেন নয়মাস বয়সী শিশুটির রক্তাক্ত নিথর দেহ নয়, বরং মুখ থুবড়ে পড়ে আছে পুরো বিশ্বমানবতা!

শিশুটির নাম তোহাইত। নদীতীরে সে এমনভাবে পড়েছিল যার সঙ্গে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বরে ভূমধ্যসাগর তীরে সিরিয়ার শরণার্থী শিশু আলান কুর্দির মরদেহের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। তাই অনেকেই শিশুটির নাম দিয়েছে তোহাইত রোহিঙ্গা তথা ‘আলান রোহিঙ্গা’। শিশু আলানের মৃত্যুর পরে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয়কে শক্তভাবে নাড়া দিয়েছিলো। ইউরোপ তার সীমান্তের দরজা খুলে দিয়েছিলো যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষদের জন্য। অালান নিজের জীবনের বিনিময়ে স্বজাতির ভাগ্য কিছুটা হলেও প্রসন্ন করতে পেরেছিলেন। সেদিক থেকে তোহাইত রোহিঙ্গা সত্যিকার অর্থেই দুর্ভাগা। তার মৃত্যুও টলাতে পারে নি পাষাণ হৃদয় রাষ্ট্রনায়কদের। কেউ খুলে দেয় নি তাদের সীমান্ত।  অবাধে দেয় নি খুলে সীমান্ত। দেয় নি মাথাগোঁজার ঠাঁই কিংবা অন্ন, বস্ত্র। ফলে বাঁচার জন্য উত্তাল বঙ্গোপসাগর ছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য বস্তুত আর কোনো নিরাপদ বিকল্প পথ খোলা রইলো না।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও গণধর্ষণ থেকে রেহাই পেতে জীবন বাঁচতে রোহিঙ্গা মায়ের কোলে চড়ে তোহাইত বাংলাদেশের দিকে আসার চেষ্টা করছিল। পলায়নরত রোহিঙ্গাবাহী নৌকায় গুলি চালিয়েছে দেশটির সীমান্তরক্ষী পুলিশ (বিজিপি)। গুলিতে তিনটি নৌকাডুবির ঘটনায় চার শিশুসহ অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৩১ জন। চলতি বছরের ৪ ডিসেম্বর রাতে মিয়ানমারের রাখাইনের মংডুর উত্তরাঞ্চলে নাফ নদীতে এই ঘটনা ঘটে। ৫ ডিসেম্বর (সোমবার) মিয়ানমার সময় সকাল ৭টার দিকে নাফ নদীর তীরে দুটি শিশু এবং একজন নারীর মরদেহ পড়েছিল।

All Media Link

শিশু হত্যার এই বিভৎস চিত্র দেখে অনেকেই মিয়ানমারের হাত থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের উদ্ধারে দেশটিতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপেরও দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে এই শিশুটির সঙ্গে একই নৌকায় যাত্রী হয়েছিলেন টেকনাফে সোমবার সকালে বাংলাদেশে উদ্ধার হওয়া রেহেনা বেগম। ছবি দেখানোর পর তিনি জানিয়েছেন, নিহত শিশুটির নাম তোহাইত। তার বয়স ১০ মাস। তোহাইত মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুর বড় গওজবিল এলাকার জাফর আলম ও ছেনুয়ারার সন্তান। সে সম্পর্কে রেহেনার খালাত ভাই। গত সোমবার রাতে টেকনাফে এক বাড়িতে আশ্রয় নেয়া অবস্থায় সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান প্রাণে বেঁচে যাওয়া রেহেনা।

মালয়েশিয়াভিত্তিক রোহিঙ্গাদের অনলাইন টেলিভিশন চ্যানেল – আরভিশন টিভি জানিয়েছে, ডুবে যাওয়া নৌকাগুলোর আরোহীদের বেশিরভাগই উত্তর মংডুর রাইমাবিল গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। এ সকল গ্রামগুলোতে মায়ানমারের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় সরকার সমর্থক লোকজন গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং লুটপাট করে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এ অভিযানে এখন পর্যন্ত  তিন শতাধিক রোহিঙ্গা নিহত, পাঁচ সহস্রাধিক গ্রেফতার এবং বহু নারী ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে অন্তত ২০ হাজার বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

জাতিসংঘ রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে উল্লেখ করেছে। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদেরকে অভিহিত করেছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি হিসেবে।

কী ঘটছে মায়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আরাকান প্রদেশে

চলতি বছরের অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যা ঘটছে তাকে মিয়ানমার-বিষয়ক অধিকাংশ বিশ্লেষকেরাই ‘গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করছেন। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আলজাজিরা টেলিভিশন এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও এ ধরনের প্রমাণ হাজির করেছে, যাতে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক বাহিনীর অভিযানকে গণহত্যা বলে চিহ্নিত করা যায়।

যুক্তরাজ্যের দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে লন্ডনের কুইন মেরি কলেজের গবেষকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের প্রভাবশালী নেত্রী অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের ওপরে সামরিক বাহিনীর নির্যাতন বিষয়ে নীরব থাকার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যাকে বৈধতা দিচ্ছেন এবং সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপরে অত্যাচারকে স্থায়ী রূপ দিচ্ছেন।

এদিকে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মী চন্দ্র মুজাফফরের নেতৃত্বাধীন সংগঠন ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট ফর এ জাস্ট ওয়ার্ল্ড’ (জাস্ট)-সহ ১৮টি সংগঠন ২৮ নভেম্বর রোমে অবস্থিত পারমান্যান্ট পিপলস ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেছে যেন তাঁরা রাষ্ট্রীয় অপরাধ ও গণহত্যার আলোকে মিয়ানমারের পরিস্থিতি বিবেচনা করেন।

গত ২৪ নভেম্বর বিবিসি বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআর অফিসের প্রধান কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুঠতরাজ চালাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিয়ানমারের জাতিগত নিধনের ব্যাপারে এতদিন ধরে যে অভিযোগ করে আসছিল, এবার জাতিসংঘও সেই অভিযোগ করছে। মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণণা করলেও বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক সমাজ, এমনকি জাতিসংঘও এই বিষয়ে এক ধরণের নিরবতাই পালন করছে।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা যেভাবে শুরু হয়…

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর এই অভিযানের সূত্রপাত এ বছরের ৯ অক্টোবর সীমান্তে সেনাবাহিনীর চৌকিতে কথিত হামলার জবাব হিসেবে। যাতে ৯জন সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছে বলে মিয়ানমার কর্তপক্ষ দাবি করেছে। এর ফলে সেনাবাহিনী নির্বিচারে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের বাড়িতে আগুন দেওয়ার খবর নাকচ করে দিলে ওয়াশিংটনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এইচআরডব্লিউ স্যাটেলাইটে প্রাপ্ত চিত্র বিশ্লেষণ এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে জানায়, এ পর্যন্ত সেদেশের সরকার ৩০ সহস্রাধিক বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দু’মাসের পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা নাগরিক মারা গেছেন। ধর্ষিতা হয়েছেন সহস্রাধিক নারী। লক্ষাধিক মানুষ আভ্যন্তরীনভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বিশ সহস্রাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু।

রোহিঙ্গাদের দেখতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে কফি আনান

রোহিঙ্গা মুসলমানদের অবস্থা দেখতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নেমেই বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। বিমানবন্দরের বাইরে কফি আনানের প্রতি বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কট্টরপন্থীরা। গত শুক্রবার রাখাইন রাজ্যে পৌঁছান কফি আনান।

কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক কমিশন রাখাইনের রোহিঙ্গাদের অবস্থা সম্পর্কে তদন্ত করছে। আর এরই অংশ হিসেবে দলটি মিয়ানমার যায়। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই সর্বশেষ দফা সহিংসতা শুরুর আগে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি নয় সদস্যের এই আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করেন।

কমিশনে মিয়ানমারের ছয়জন এবং কফি আনান ছাড়া আরও দুজন বিদেশি প্রতিনিধি আছেন। তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের নেত্রী আং সান সু চি এই কমিশন গঠনে বাধ্য হয়েছিলেন।

সিটুয়ে বিমানবন্দরের বাইরে বিক্ষোভকারীদের হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘কফি আনান কমিশন নিষিদ্ধ কর’। বিক্ষোভকারীরা ‘আমরা কফি আনান কমিশন চাই না’ বলে স্লোগান দেয়। বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে যা ঘটছে সেটা আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এখানে আমরা বিদেশিদের হস্তক্ষেপ চাই না।’

ভাগ্যাহত রোহিঙ্গাদের নির্যাতন-বঞ্চনা সুদীর্ঘ ইতিহাস

ছয়শত বছর ধরে বসবাসরত একটি গোটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে সুপরিকল্পিতভাবে নিশ্চিহ্ন করে যাচ্ছে মিয়ানমারের বৌদ্ধ সম্প্রদায়। তাদেরকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করে যাচ্ছে মিয়ানমার তথা বার্মার সেনাবাহিনী। যাদের নির্মূল করা হচ্ছে তারা হলেন রোহিঙ্গা। বলা হয় যে, রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১৩ লাখ। আসলে সংখ্যাটি ১৩ লাখ নয়, সংখ্যাটি হলো ২৫ লাখ। এই মুহূর্তে বার্মার রাখাইন বা আরাকান প্রদেশে আছে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা। এদের ওপরই এখন চলছে বর্মী সেনাবাহিনী এবং রাখাইন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বীভৎস নিপীড়ন। অবশিষ্ট ১২ লাখ আছে ৪টি দেশে। বাংলাদেশে ৫ লাখ, সৌদিআরবে ৪ লাখ, পাকিস্তানে ২ লাখ এবং থাইল্যান্ডে ১ লাখ। ১৯৭৮ সাল থেকে জেনারেল নে উইনের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে গণহত্যা চালায় সেই গণহত্যার ধারাবাহিকতায় ২০১২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে এসব দেশে আশ্রয় নিয়েছেন এসব হতভাগ্য বিড়ম্বিত মুসলিম রোহিঙ্গা।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘ। দেশটিতে আরও অনেক সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার এবং তারা দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের বিভিন্ন সময়ের সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করে আসছে। প্রধানত মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যেমন ১৯৪৬ সালে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সূচনা করে, তেমনি প্রধানত খ্রিষ্টান ধর্মানুসারী কারেন জনগোষ্ঠী ১৯৪৯ সাল থেকে সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে। তাই, রোহিঙ্গাদের গত দুই দশকের বিদ্রোহকে বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়নের চেষ্টা করলে এবং তাকে অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন থেকে একেবারেই আলাদা করে বিবেচনা করলে সামগ্রিক চিত্রটি বোঝা যাবে না। গত ৫০ বছরে মিয়ানমারের এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে উত্থান-পতন ঘটেছে, নেতৃত্ব এবং আদর্শিক অবস্থানে পরিবর্তন ঘটেছে; অনেক সংগঠনের মৃত্যু ঘটেছে, তৈরি হয়েছে নতুন সংগঠন। কিন্তু দেশটিতে কমপক্ষে পাঁচটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বা অঞ্চল স্বায়ত্তশাসন থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক-জাতিগত পরিচয় রক্ষার জন্য সশস্ত্র লড়াই করছে। এরা হচ্ছে কাচিন জনগোষ্ঠী (যাদের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারের ১৭ বছরের যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটে ২০১১ সালে) কায়েহ রাজ্য, শান রাজ্য, কারেন রাজ্য এবং আরাকানের রোহিঙ্গারা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে একাধিক বিদ্রোহী সশস্ত্র বাহিনী।

এই পটভূমিকায়ই ৯ অক্টোবরের ঘটনা ঘটে। অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্রোহীদের হামলার পরে সেনা অভিযানের ক্ষেত্রে যতটা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার চেয়েও বেশি মাত্রায় কঠোরভাবে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপরে তাদের অভিযান শুরু করে। চলমান সামরিক অভিযানের আশু কারণ যা-ই হোক, তার আকার ও প্রকৃতি থেকে এটা স্পষ্ট যে একে আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া বলা যাবে না। বরং এটা রোহিঙ্গাদের নির্মূল করার রাষ্ট্রীয়নীতির অংশ। ১৯৭৭-৭৮ এবং ১৯৯১-৯২ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযান চালানো হয়েছিল এবং ২০১২ সালে যেভাবে তাদের ওপরে হামলা হয়েছে এখনকার ঘটনাবলি এক অর্থে তা থেকে ভিন্ন নয়। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ১৯৮২ সালে যে নাগরিকত্ব আইন হয়েছে তার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় যে নীতি তারই প্রতিফলন হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দফায় দফায় জাতিগত নিধন অভিযান। এবারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযানের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে তা সংঘটিত হচ্ছে বেসামরিক নির্বাচিত সরকারের সময় এবং তার বৈধতা তৈরি করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রতিবেশী বাংলাদেশের ভূমিকা

কয়েক সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অত্যাচারের মুখে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের সন্ধানে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। প্রথমে তাদের সংখ্যা কম ছিল, কিন্তু ক্রমেই তা বেড়েছে। বাংলাদেশ সরকার তাদের গ্রহণ করতে অনাগ্রহী এবং আমাদের সীমান্তরক্ষীরা তাদের ঠেলে দিচ্ছেন নাফ নদীতে। ২০১২ সালেও বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সমাজের অনুরোধ উপেক্ষা করে শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে অসম্মতি জানায়। বাংলাদেশ যেহেতু শরণার্থী-বিষয়ক ১৯৫১ সালের কনভেনশন বা ১৯৬৭ সালের প্রটোকলে স্বাক্ষর করে নি এবং জাতীয়ভাবে শরণার্থী-বিষয়ক কোনো আইন তৈরি করে নি, সেহেতু শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই যুক্তিতেই বাংলাদেশ তার অবস্থান তৈরি করেছে। ২০১২ সালের মতো এখনও এটা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বলা হচ্ছে যে আন্তর্জাতিক সমাজের অনুরোধে কর্ণপাত করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আক্ষরিকভাবে বিবেচনা করলে এটা ঠিক।

কিন্তু স্মরণ করা দরকার যে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী। মানবাধিকার সনদে এটা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভিন্ন দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করার এবং সে দেশের আশ্রয়ে থাকার অধিকার প্রত্যেকেরই আছে।

তবে বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কার্যত তিনটি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘটিত সেনা অভিযান সেখানকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত, ফলে আন্তর্জাতিক সমাজের উচিত মিয়ানমারকে চাপ দেওয়া, যাতে করে এই ধরনের পরিস্থিতির সূচনা না হয়। দ্বিতীয়ত, অতীতে বাংলাদেশ যে শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে তার একটি অংশ এখনও বাংলাদেশেই আছে। তৃতীয় যুক্তিটি জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপে যুক্ত হয়েছে এ কথা ঠিক। কিন্তু যেসব অসহায় রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে শরণার্থীশিবিরে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে, তাদের সবাইকে কি এই অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায়?

বাংলাদেশ সরকারের এসব যুক্তি যদি সব দেশই ব্যবহার করে, তবে সারা পৃথিবীর যে ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে, তাদের কোথায় আশ্রয় হবে? যে এক কোটি মানুষের কোনো দেশই নেই, তাদের সামনে কী পথ খোলা থাকবে?

শরণার্থী ও অভিবাসীদের সবাইকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বলে বর্ণনা করার প্রবণতা আমরা ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের সরকার-সমর্থকেরা তাদের সমালোচনা করতে পিছপা হন না, কিন্তু একই ভাষায় কথা বলা এবং আচরণ করার ক্ষেত্রে তাঁরা যে পিছিয়ে নেই সেটা কি তাঁরা বুঝতে পারেন?

শান্তির দূত অং সাং সু চি যেন স্বীয় আত্নার সাথে প্রতারণা

দীর্ঘ ২৫ বছর ২০১৫ সালে মিয়ানমারে যখন সেনাশাসনের অবসান ঘটে এবং ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ও তার নেত্রী অং সান সু চি ক্ষমতায় আসেন, তখন অনেকেই আশা করেছিলেন যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অবসান ঘটবে। কিন্তু সু চি ও তাঁর সরকার রোহিঙ্গা শব্দটি পর্যন্ত ব্যবহারের আগ্রহ দেখায়নি। তদুপরি তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান অব্যাহত থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিশু তোহাইত রোহিঙ্গার মৃত্যুর মাত্র তিনদিন আগে মায়ানমারের তথাকথিত গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চি শুক্রবার সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চ্যানেল নিউজ এশিয়াকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে, দাবী করেছেন ‘রাখাইন প্রদেশের অবস্থা নিয়ে মিডিয়া অতিরঞ্জিত করছে; আসলে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি এবং শান্ত করেছি।’ অথচ বাস্তব চিত্র তার সম্পুর্ণ বিপরীত। উপরন্তু, রাখাইনে সেনা নির্যাতন বিষয়ে বরাবর নিশ্চুপ থাকা সু চি বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই দায়ী করেন।

এর ফলে সামাজিক মাধ্যমসহ সচেতন মহলে এমন দাবীও উঠেছে, এমন ব্যক্তির কাছ থেকে শান্তির নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারে একধরনের অসহিষ্ণু বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রসার ঘটেছে। উগ্রপন্থীরাই আধিপত্য তৈরি করেছে, যারা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে একধরনের উসকানি দিয়ে আসছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ সব সময়ই শত্রু তৈরি করে, এ ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটছে। কিন্তু তার বিপরীতে অংশগ্রহণমূলক কোনো আদর্শিক অবস্থান না থাকায় এনএলডি ও সু চি তাদের হাতেই আটকা পড়েছেন। এ অবস্থার অবসান কীভাবে হবে বা আদৌ হবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর আপাতত অজানিই থেকে যাচ্ছে।

পুনশ্চ

প্রিয় পাঠক, আপনার কি তোহাইত এর সম বয়সী  কোন সন্তান আছে? অথবা ভাই-বোন, কাছের কেউ? ভাবুনতো একইভাবে মৃত পড়ে আছে আপনার সন্তান, কেমন লাগছে আপনার? অনুভূতি কি প্রবল হয়ে উঠছে? আপনার বুকের ভেতরের প্রতিবাদের আগুন কি একটু করে জ্বলে উঠছে? আর কত নির্বাক থাকা থাকবেন! এভাবে কাদায় মুখ থুবড়ে থেকে শিশুগুলো আমাদের মানবিকবোধকে ভীষণভাবে উপহাস করছে। ভীষণভাবে! যে উপহাসের কোন জবাব নেই বিবেকের কাছে। তথাকথিত মানুষের কাছে।

জাতিসংঘ ভুলে যাক, সবগুলো পরাশক্তি ভুলে যাক মানবাধিকারের কথা। ইউনিসেফ, সেভ দ্যা চিলড্রেন ভুলে যাক শিশু অধিকারের কথা, ভুলে যাক রেড ক্রস, মানবাধিকারের সকল প্রতিষ্ঠান। কোনো ক্ষতি নেই। বিশ্ব-মিডিয়া চোখ-মুখ বন্ধ করে বসে থাকুক। সবাই হিপোক্রেট হয়ে যাক। কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নেই।

তবে, শুধু আপনার বিবেকটি যেন মরে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

একথাটি শুধু মনে রাখলেই হবে, ফুলের মতো স্বর্গীয় এসব শিশুর কোনো ধর্ম নেই, বর্ণ নেই, দেশ, জাত নেই। আর কিছু না হোক, আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য একটি মানবিক, নিরাপদ সমাজ নির্মাণের জন্যই আমাদের সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি। আমরা সকলে সোচ্চার হলে, আলান কুর্দি কিংবা তোহাইতের মতো শিশুদেরকে এমন নির্মম, করুণ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবো।

* লেখকদ্বয় যথাক্রমে ইন্টারন্যাশন্যাল ইন্সটিটিউট অব মিডিয়া অ্যান্ড ই-জার্নালিজম (ইমেজ)-এর সিইও এবং রিসার্চ স্পেশালিস্ট।

 

রোহিঙ্গা সম্পর্কিত সকল সংবাদ ও আর্টিকেল পড়ুন এখানে 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন »

শেয়ার করুন »

লেখক সম্পর্কে »

বার্তাবাংলা ডেস্কে আপনাকে স্বাগতম। বার্তাবাংলা (BartaBangla.com) প্রথম সারির একটি অনলাইন গণমাধ্যম; যেটি পরিচালিত হচ্ছে ইউরোপ এবং বাংলাদেশ থেকে। বার্তাবাংলা ডেস্কে রয়েছে নিবেদিতপ্রাণ তরুণ একঝাঁক সংবাদকর্মী। ২০১১ সালে যাত্রা ‍শুরু করা এই অনলাইন পত্রিকাটি এরই মধ্যে পেয়েছে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো পাঠকই আমাদের পথচলার পাথেয়।

মন্তব্য করুন »