বার্তাবাংলা ডেস্ক »

41686_rafবার্তাবাংলা ডেস্ক ::জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিষয়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বিশিষ্ট আইনজীবীরা। তারা বলেন, কাদের মোল্লাকে যে অপরাধের বিষয়ে খালাস দেয়া হয়েছে, সরকার ইচ্ছা করলে তার বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। আলোচনায় অংশ নেন প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এবং ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তবে টকশোতে টেলিফোনে অংশ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের প্রধান সমন্বয়কারী এম কে রহমান বলেছেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সরকার খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিরুদ্ধেও সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিলের সুযোগ রয়েছে। টেলিফোনে অংশ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের ডিফেন্স টিমের প্রধান সমন্বয়কারী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ট্রাইব্যুনালে সরকারপক্ষের একজন সাক্ষীও বলেননি যে আবদুল কাদের মোল্লাকে তিনি অপরাধ করতে দেখেছেন। সবাই শোনা কথার ওপর ভিত্তি করেই জবানবন্দি দিয়েছেন। আমরা এ রায়কে যৌক্তিক মনে করি না বিধায় এর বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গতকাল সন্ধ্যায় দিগন্ত টেলিভিশনে টকশোতে অংশ নিয়ে তারা এ মতামত দেন।
রফিক-উল হক : আবদুল কাদের মোল্লাকে দেয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় প্রত্যাখ্যান করে তার ফাঁসির দাবিতে সরকারি দলের আন্দোলন ও বিক্ষোভের বিষয়ে প্রথিতযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, আইন ও আদালতকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। আন্দোলন, বিক্ষোভ ও সংগ্রাম করে আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা মোটেও কাম্য নয়। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন। সরকারি দল এখন তার ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করছে। ওই বিক্ষোভে কেন্দ্রীয় নেতারা এমনকি মন্ত্রীরাও গিয়ে ফাঁসির দাবিতে বক্তব্য দিচ্ছেন। সামনে আরও মামলার রায় অপেক্ষমাণ। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের কাছে একটি মেসেজ যাচ্ছে। সামনে যদি কাউকে ফাঁসি দেয়া হয়, তাহলে এটা মনে করা খুবই স্বাভাবিক হবে যে, বিচারকরা সরকারি দলের নেতা ও মন্ত্রীদের ভয়ে এই রায় দিয়েছেন। মন্ত্রী ও সরকারি দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যেভাবে রাস্তায় নেমেছেন, তাতে বিচারকদের ঘাড়ে কয়টি মাথা যে তারা ফাঁসি ছাড়া অন্য রায় দেবেন? কাজেই আমি বলব, ফাঁসির দাবিতে যারা আন্দোলন করছেন এমনকি ট্রাইব্যুনাল বাতিলের দাবিতেও যারা আন্দোলন করছেন, তারা ঠিক কাজটি করছেন না। এতে করে দেশ ভয়ানক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা কারও জন্যই কাম্য হতে পারে না। আইনকে তার নিজস্ব গতিতেই চলতে দেয়া উচিত।
তিনি বলেন, সরকার যে উদ্দেশ্যেই আদালত গঠন করুক না কেন, বিচারকরা ‘নিউট্রাল’ বিচার করবেন— এটাই জাতি প্রত্যাশা করে। আদালত রায় দিয়েছেন। সংসদে সরকারি দলের এমপিরাও এ নিয়ে কথা বলছেন। এটা বড়ই দুঃখজনক। একজন দর্শকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদালত বা রায় নিয়ে হরতাল ও অবরোধ করা উচিত হচ্ছে না। হরতাল বা অবরোধ করে ফাঁসি দেয়া যাবে না। এতে দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বিচারকরা সব সময় ভয়ে থাকবেন। এসব করে যদি আদালতের কাছ থেকে ফাঁসি আদায় করা হয়, সেটা হবে দুঃখজনক। ব্যারিস্টার হক বলেন, রায়ের পর পুলিশ প্রটেকশনে বিক্ষোভ হচ্ছে। মন্ত্রীরা সেখানে গিয়ে বলেছেন—এ রায় মানি না। তাহলে বিচারকরা কী করে তাদের রায় দেবেন? যেভাবে ফাঁসির দাবি উঠেছে, বিচারকদের তো ফাঁসি না দিয়ে কোনো উপায় নেই। ভবিষ্যতে যে রায় দেবেন তা-ও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ফাঁসির আদেশ না দিলে, যে বিচারক ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি তার কী অবস্থা হবে! তার ফ্যামিলির কী অবস্থা! কে তাদের প্রটেকশন দেবে?
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশকে একটা আইডিয়াল সিচুয়েশনে আসতে হবে। অ্যাবনরমাল সিচুয়েশনে থাকবে তা কিন্তু কেউ চায় না। অ্যাবনরমাল অবস্থা আছে, এটা অবশ্যই নরমাল হবে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন : রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিলের বিষয়ে তিনি বলেন, সাজার বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আপিল করতে পারবে। সরকারপক্ষের আপিলের কোনো সুযোগ নেই। এটাই হচ্ছে আইনের স্পষ্ট বিধান। তবে কোনো অপরাধের জন্য কাউকে খালাস দেয়া হলে বাদীপক্ষ বা সরকার তার বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। এখানে একটি অপরাধের অভিযোগ থেকে যেহেতু কাদের মোল্লাকে খালাস দেয়া হয়েছে, সেক্ষেত্রে সরকার আপিল করতে পারবে। খন্দকার মাহবুব হোসেনের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হকও।
একজন দর্শকের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। যদি তা-ই না হতো, তাহলে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নাম দিয়ে দলীয় আইনজীবী, দলীয় তদন্ত কর্মকর্তা ও দেশীয় বিচারকদের নিয়ে এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হতো না। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমকে নিয়ে শুরুতেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে সক্রিয়ভাবে আন্দোলন করেছেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তিনিই একবার এর বিচার করেছেন। এ ধরনের বিতর্কিত লোক দিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকারই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এখানে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটি ছাড়া আর কিছুই আন্তর্জাতিক মানের নেই। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাধা প্রদানকারীরাও সমান অপরাধী’— এই বক্তব্যকে সমর্থন করে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বর্তমানে যে আইনে জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বিচার হচ্ছে, এই আইনটি ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য করা হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত পাকিস্তান আর্মির ৪৫ হাজার সেনাসদস্যের ভেতর থেকে গুরুতর অপরাধী হিসেবে ওই ১৯৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুই তাদের ছেড়ে দিয়েছেন। মূল যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার অপরাধে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম শেখ মুজিবেরও মরণোত্তর বিচার দাবি করতে পারে।
অপর একজন দর্শকের প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমি ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ছিলাম। ওই সময় দালাল আইনে বিচারের জন্য পাকিস্তান আর্মির এদেশীয় ২৮ হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বর্তমানে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যাদের আটক করা হয়েছে, ওই ২৮ হাজার বন্দির মধ্যে এরা কেউ ছিলেন না। এরা যদি এতই ভয়ঙ্কর অপরাধী হতেন, তাহলে এদের একজনকেও ওই সময় গ্রেফতার তো দূরের কথা, এদের কারও বিরুদ্ধে দেশের কোনো একটি থানায় একটি জিডিও করা হলো না কেন? তিনি বলেন, যে কাদের মোল্লাকে এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে, তিনিই স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন আবার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতরে উদয়ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি যদি ‘কসাই কাদের কিংবা জল্লাদ কাদের’ হন, তাহলে আজ যারা তার ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন করছেন তারা কেন তাকে ওই সময় আটক করে পুলিশে দিলেন না? এ ধরনের অনেক প্রশ্ন আজ সাধারণ জনগণের মাঝে। ফজলুল কাদের চৌধুরীকে দালাল আইনে আটক করা হয়েছে। এখন তার ছেলে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যুদ্ধাপরাধের মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই সময় তার বাবার সঙ্গে তাকেও কেন গ্রেফতার করা হলো না কিংবা তার নামে একটি মামলা বা জিডি করা হলো না? মূলত সরকারের কিছু লোক তাদের রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে এ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। দেশের সাধারণ মানুষ সরকারের এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে নেই। মানুষ চায় এখন তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হোক।
অপর একজন দর্শকের প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সরকার সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করেছে। বিরোধী দল বলছে যে নামেই হোক নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। এখন সরকার বলছে বিরোধী দল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে এ দাবি করছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির দাবি মেনে বিরোধী দলের মুখ বন্ধ করছে না? আমি মনে করি, সরকার নিজেই ইচ্ছাকৃতভাবে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি করতে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল ও স্বাধীনতার ৫১ বছর পরে এসে যুদ্ধাপরাধের বিচারের আয়োজন করেছে।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক : আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ের বিষয়ে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, এই রায় ন্যায়ভ্রষ্ট। এর বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। তার বিরুদ্ধে সরকারের উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল না। যারাই সাক্ষী দিয়েছেন, তারা সবাই অপরের কাছ থেকে ঘটনা শুনেছেন বলে আদালতকে জানান। সরকারপক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হচ্ছেন কবি রোজি। তিনি যুদ্ধের নয় মাসই ভারতে ছিলেন। ভারত থেকে দেশে এসে তিনি শুনেছেন যে আবদুল কাদের মোল্লা কবি মেহেরুন নেছাকে হত্যা করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কবি রোজি ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ২০১১ সালে একটি বই লিখেছেন। যা এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ওই বইয়ে আবদুল কাদের মোল্লার নামটিও উল্লেখ নেই। সেখানে অনেক হত্যাকারীর নামই উল্লেখ রয়েছে। জেরার সময় তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি ভয়ে বইটিতে আবদুল কাদের মোল্লার নাম উল্লেখ করিনি। পরের প্রশ্নে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কাদের মোল্লা তো ২০১০ সাল থেকেই কারাগারে। আপনি কার ভয়ে তার নামটি উল্লেখ করেননি। তিনি এ প্রশ্নের জবাব দেননি। খন্দকার আবুল হাসান নামে আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী রয়েছেন। তিনিও আদালতে বলেছেন, তিনি তার গাড়িচালকের কাছ থেকে শুনেছেন যে, আবদুল কাদের মোল্লা তার বাবাকে হত্যা করেছেন। এসব সাক্ষীর জবানবন্দির ভিত্তিতে আইনের দৃষ্টিতে এ বিচার চলতে পারে না। জনগণের আদালতে হতে পারে। এ কারণেই আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন »

শেয়ার করুন »

লেখক সম্পর্কে »

মন্তব্য করুন »